তখনো কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়নি। তখনো বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি মাত্র কেন্দ্র এবং সে কেন্দ্রটি হচ্ছে মস্কো। তাত্ত্বিক জগতে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান শত্রু ছিলাম আমরা। কারণ আমরা বলতাম-লেনিনের পর স্ট্যালিন ভুল নীতি অনুসরণ করেছেন। আমরা বলতাম, কোনো একটি দেশে সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয় হতে পারে না। অথচ ত্রিশের দশকে স্ট্যালিন বলেছিলেন-সোভিয়েত ইউনিয়ন সাম্যবাদের পথে এগুচ্ছে। আমরা বলতামরুজভেল্ট ও চার্চিলের চাপের ফলে ১৯৪৩ সালে স্ট্যালিন তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে দেন। আমাদের মতে স্ট্যালিনের আমলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সূত্রপাত হয়। আমাদের কমিউনিস্ট বন্ধুরা বলতেন আমরা ট্রটস্কি অনুসারী। আমাদের রাজনীতি ও ট্রটস্কির বক্তব্য সম্পর্কে আমার বন্ধুদের সম্যক ধারণা থাকলে এ বক্তব্য তারা দিতেন না। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক এ পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরা তাত্ত্বিক দিক থেকে আমাদের চরম বিরোধিতা করতেন। তকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের জন্মের সময় থেকে এ প্রতিষ্ঠানটির সাথে আমরা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগে আমাদের টিকে থাকতে কষ্ট হয়েছে। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ছেড়ে আমি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার যোগদানের প্রশ্নেই ছাত্র ইউনিয়নের কাউন্সিলে ভোটাভুটি হয়। তবে ওই বিরাট কাউন্সিলে আমার বিপক্ষে ভোট পড়ে ২টি। এরপরেও আমার ছাত্র ইউনিয়নে থাকা হয়নি। ১৯৫৯ সালের সামরিক শাসনামলে আমি জেলে চলে যাই। ১৯৬২ সালে আমি মুক্তি লাভ করি। একদিন শুনলাম রাজধানী ঢাকার স্বামীবাগে ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন হচ্ছে ফরহাদ সাহেবের নেতৃত্বে। সেই সম্মেলনে আমাকে ডাকা হয়নি। সম্মেলনে প্রশ্ন উঠেছিল আমাকে না ডাকা সম্পর্কে। সম্মেলন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন নামে তাঁরা নাকি একটি নতুন প্রতিষ্ঠান করেছেন। এ প্রতিষ্ঠান পুরনো ছাত্র ইউনিয়নের উত্তরাধিকারী নয়।
তবে আমাদের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধ চরমে উঠল ১৯৬৪ সালে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের চটকল শ্রমিকদের নেতৃত্ব আমাদের হাতে। আমাদের সংগঠনের নাম পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন। তখন দেশে সামরিক শাসন চলছে। ওই সামরিক শাসনের মধ্যেই ১৯৬৪ সালের ২ জুলাই আমরা চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘট আহ্বান করি। তখন কমিউনিস্ট পার্টির শ্রমিক সংগঠন ছিল পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক পরিষদ। সভাপতি ছিলেন তোয়াহা। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সিরাজুল হোসেন খান। আমাদের সহযোগিতার নামে তাঁরা আমাদের প্রচণ্ড অসহযোগিতা করলেন। তবুও ২১ দিন ধর্মঘটের পর আমরা জয়লাভ করি।
চটকল মালিকদের সাথে আমাদের চুক্তি হয়। মালিকরা চুক্তি লঙ্ঘন করলে ১৯৬৫ সালে আমরা পুনরায় ধর্মঘট আহ্বান করি। এবার আমার কমিউনিস্ট বন্ধুরা স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। তাদের তখন রাজনৈতিক তত্ত্ব হচ্ছে–জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব। জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব স্তরে জাতীয় বুর্জোয়াদের সহযোগিতা করা যায়। তাদের ব্যাখ্যায় জাতীয় বুর্জোয়া হচ্ছে চটকল মালিক ইস্পাহানি এবং ইয়াহিয়া বাওয়ানী। অথচ তাদের বিরুদ্ধে আমরা ধর্মঘট করছি। কমিউনিস্ট পার্টির চটকল নেতা হচ্ছেন–মোহাম্মদ তোয়াহা এবং আবুল বাশার। চট্টগ্রামও চটকল ধর্মঘটের অন্তর্ভুক্ত। তখন চট্টগ্রামের ডিসি ছিলেন রাশেদ খান মেননের মেজ ভাই আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তোয়াহা এবং আবুল বাশার আবু জাফর ওবায়দুর বাসায় মালিকদের সাথে বৈঠক করে এক চুক্তি সম্পন্ন করেন এবং চটকল ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। কিন্তু সে প্রত্যাহার কোনো কাজে আসেনি। এ চুক্তির হাস্যকর দিক হচ্ছে, ধর্মঘট ডেকেছিলাম আমরা আর সে ধর্মঘট প্রত্যাহার করলেন তোয়াহা এবং আবুল বাশার। আমরা সে চুক্তি মানলাম না। কোনো চুক্তি না করেই আমরা কাজে যোগ দিলাম। এ হচ্ছে সে কালের বাম ঐক্যের একটি চিত্র। তবে চটকল শ্রমিকদের মধ্যে আমাদের প্রভাবের জন্যেই পরবর্তীকালে যশোরের কমিউনিস্ট নেতা ড, মারুফ হোসেনের সহযোগিতায় আমাদের সাথে এক সময় বাংলাদেশ স্বাধীন করা সম্পর্কে আলোচনা করতে আসেন। এ ধরনের আলোচনায় মূল কমিউনিস্ট পার্টির কাউকে আমি অংশগ্রহণ করতে দেখিনি। প্রসঙ্গত বলা যায়, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একটি অংশ এবং বামপন্থীদের এ অংশটি ছাড়া আমরা কাউকে বাংলাদেশ স্বাধীন করা নিয়ে আলোচনা করতে শুনিনি।
এই পরিবেশে কমিউনিস্ট শিবিরের সবচেয়ে বড় খবর হচ্ছে মস্কো পিকিং দ্বন্দ্ব। ১৯৪৯ সালে চীনে বিপ্লব হয়। ১৯৫৩ সালে স্ট্যালিনের মৃত্যু হয়। ক্ষমতায় আসেন ক্রুশ্চেভ। ক্রুশ্চেভ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২০ কংগ্রেসে স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উত্থাপন করেন। ক্রুশ্চেভ বলেন, স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত কারণে লাখ লাখ কমিউনিস্ট কর্মী নিহত হয়েছে। স্ট্যালিনের আমলে কারো স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার ছিল না। ক্রুশ্চেভের অভিযোগে সমগ্র বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে যায়। বাম মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। ক্রুশ্চেভ তার বর্ণনায় স্ট্যালিনকে ভয়ঙ্কর দানব হিসেবে চিত্রিত করেন। আর তারই সাথে তিনি এক নির্ভেজাল তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এ নির্ভেজাল তত্ত্ব হচ্ছে পুঁজিবাদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুঁজিবাদী বিশ্বকে পরাজিত করা।
