কথার পিঠে কথা হিসেবে এ যুক্তি মেনে নেয়া যায়। কিন্তু প্রকৃত পরিস্থিতি তা ছিল না। তাই মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান এই দুই নেতাকে পাকিস্তান শব্দটির প্রশ্নে বারবার ইতস্তত করতে দেখা গেছে। ৭১-এর মার্চের আলোচনার শেষ মুহূর্তে পাকিস্তান সরকার বারবার অভিযোগ করেছে-শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান ভেঙে ফেলতে চাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা ওয়ালী খান ও এয়ার মার্শাল আজগর খান বারবার তার প্রতিবাদ করেছেন। তারা বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান ভাঙছেন না। তাঁদের বর্ণনায় শেখ সাহেবের কথা ছিল–আমি মুসলিম লীগের কর্মী ছিলাম। আমি পাকিস্তান আন্দোলন করেছি। আমি পাকিস্তান ভাঙতে পারি না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানী একই ধরনের কথা বলেছেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাবার পর লন্ডনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ সাহেব বলেছেন–আমি নই, ইয়াহিয়া খানই পাকিস্তান ভাঙার জন্যে দায়ী। ঢাকায় মওলানা ভাসানী বলেছেন–পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তান ভাঙেনি। পাকিস্তান ভেঙেছে পশ্চিম পাকিস্তানের জমিদার, জোতদার ও শোষক গোষ্ঠী। তাঁদের এ দু’জনের বক্তব্য ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়–পাকিস্তান শাসকেরা সঠিক আচরণ করলে পাকিস্তান ভাঙত না এবং সেক্ষেত্রে আমার ধারণায় বাংলাদেশের জন্ম ঐতিহাসিকভাবে সত্য বলে ধরে নেয়া যেত না। তবে আমি বলব–বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় লাহোর প্রস্তাবের দুই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র নিয়ে পাকিস্তান গঠনের কথা কাজে লেগেছে। লাহোর প্রস্তাবের কাঠামোয় এ কথাগুলো বলা হলে কারো দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করা যায়নি। ১৯৪৭ সালের ভুল শোধরাবার নাম করে অত্যন্ত সন্তর্পণে স্বাধীনতার কথা বলে গেছে। এদিক থেকে লাহোর প্রস্তাব কাজে এসেছে নিঃসন্দেহে। তবে স্বাধীন বাংলাদেশ লাহোর প্রস্তাবের অনিবার্য পরিণতি, এ তত্ত্ব মানতে হলে বাংলাদেশ থাকে না। আর পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে শেখ সাহেব ও মওলানা সাহেব একটি ভিন্নতর মানসিকতার শিকার হয়েছিলেন, তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। এ মানসিকতা থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমরা শুনেছি পাকিস্তান হচ্ছে একটি মসজিদ। ইমাম খারাপ বলে মসজিদ তো ভাঙা যায় না। অর্থাৎ শাসনকর্তাদের তাড়াও। কিন্তু পাকিস্তান ভেঙো না।
কিন্তু পাকিস্তান শব্দটি প্রবীণদের মনে যত দাগ কাটুক না কেন নতুন প্রজন্মকে তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি। যার ফলে ষাটের দশকে সামরিক ও বেসামরিক আমলার পাশাপাশি ছাত্রদের মনেও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দানা বাঁধতে থাকে। এর সাথে জড়িত হন বিদেশ প্রত্যাগত একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী। তাঁরা বিদেশে গিয়ে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র গঠনের অযৌক্তিকতা ও অবাস্তবতা। তবে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের জন্যে এ আন্দোলন দানা বাঁধতে সময় লাগে। আগরতলা ষড়যন্ত্র নামক বিদ্রোহের প্রস্তুতি তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তোলে। আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে বিদ্রোহই ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি করে। এ গণঅভ্যুত্থানের নায়ক হিসেবে ছাত্রদের চিহ্নিত করা হলেও বা এ অভ্যুত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুললেও অস্বীকার করা যাবে না, আগরতলা ষড়যন্ত্র নামক বিদ্রোহ না হলে বা এর সাথে শেখ সাহেবকে জড়ানো না হলে পরিস্থিতি এত শিগগিরই বিস্ফোরণোন্মুখ হতো না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে এ পর্যন্ত আমার লেখা ছিল সামরিক বেসামরিক আমলা ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগকে কেন্দ্র করে। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, এ আন্দোলনে কি বামপন্থীদের কোনো ভূমিকা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে বামপন্থীদের প্রকাশ্যে কাজ করার কোনো সুবিধা ছিল না। তবুও ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ব্যাপারে বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের কোনো অবদান ছিল, এ ধরনের ইতিহাস খুঁজে বের করা কঠিন। কিন্তু কেন এমন হলো?
বাংলাদেশের বামপন্থী বলতে তখন শুধুমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিকেই বোঝাত। আমরা যারা আরএসপি অর্থাৎ বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলের সদস্য হিসেবে কাজ করতাম তারা ছিলাম ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। জেলে যেতে যেতেই অনেকের জীবন ফুরিয়ে গেছে। নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত ষাটের দশকে একেবারেই আমাদের রাজনীতি শিল্প এলাকাকেন্দ্রিক হয়ে যায়। আমরা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন বেছে নিই। সত্যি কথা বলতে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কথা তখনো আমাদের মনে আসেনি। এমনিতেই হিন্দু, নাস্তিক এবং ভারতীয় এজেন্ট বলে আমরা নানা আখ্যায় ভূষিত। চাল-চলন কথাবার্তা সব ব্যাপারেই আমাদের সতর্ক থাকতে হয়। আত্মগোপন করলে আরবিতে নাম নিতে হয়। রাজনৈতিক কোনো পরিবর্তন হলে আমরা নিশ্চিতভাবে জানতাম–জেলে যেতে হবে। তবে এ সময় শুনেছিলাম মস্কোতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্টদের আশি জাতি সম্মেলনে নাকি বাংলাদেশের দলিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রস্তাব উধাপিত হয়েছিল। তবে সে প্রস্তারে ভিত্তিতে কোনো কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে বলে শুনিনি।
