স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলার ব্যাপারে আমার একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে, জানি এ ব্যাখ্যায় অনেকে আমার সঙ্গে একমত হবেন না। আমার এ ব্যাখ্যা একান্তভাবেই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রসূত। আমি ভিন্ন প্রসঙ্গ থেকে আমার এ ব্যাখ্যায় আসব।
ষাটের দশকের কথা। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী ছিল। এ বার্ষিকী পালন নিয়ে অনেক অঘটন ঘটে। তখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন চলছে। সরকার কিছুতেই শতবার্ষিকী পালিত হতে দেবে না। কিন্তু যুবকরা এ ব্যাপারে একাট্টা। শতবার্ষিকী পালন নিয়ে অনেকে গ্রেফতার হলো। অনেককে আত্মগোপন করতে হলো। শতবার্ষিকী পালন তাই একটা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হলো। তবুও শতবার্ষিকী পালিত হলো। পরিস্থিতি চরমে উঠল ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর। তখন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন। তিনি এক নির্দেশ দিয়ে বেতার টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করলেন। চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। বুদ্ধিজীবীরা বিভক্ত হয়ে গেলেন। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী বিবৃতি দিয়ে দাবি করলেন–রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ। আমরা তাঁর উত্তরাধিকার বহন করছি। অপরদিকে চল্লিশজন বুদ্ধিজীবী ভিন্ন সুরে বিবৃতি দিলেন। তাঁরা বললেন-রবীন্দ্রনাথ আদৌ আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ নয়। এ চল্লিশজন বুদ্ধিজীবীর মধ্যে একজনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি সাংবাদিক হিসেবেও খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তার বাসায়ও আমার যাতায়াত ছিল। তার নাম মোহাম্মদ মোদাব্বের। মোদাব্বের সাহেব আমাকে একদিন ডেকে বললেন–তুমি আমার সংসারে ভাঙন ধরিয়েছ। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমার সাথে আমার পরিবারের কেউ-ই একমত নয়। এ জন্যে তুমিই দায়ী। এরপর তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, বললেন তোমার সাথে হয়তো আমি ভিন্নমত হব না। তুবও ধৈর্য ধরে তোমাকে আমার কথা শুনতে হবে। আমি মুসলিম লীগ করলেও রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে রায়পন্থী অর্থাৎ মানবেন্দ্র রায়ের অনুসারী। মানবেন্দ্র রায় ছিলেন কমিউনিস্ট জগতের প্রথম শ্রেণির চিন্তানায়ক। তাঁর লেখায় তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন। তাই রায় পন্থী হয়েও আমরা মুসলিম লীগ করেছি এবং পাকিস্তান চেয়েছি। তবে ব্যক্তিগত জীবনে আমি বিশ্বাস করি রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির তঙ্গ। আমরা তাঁর উত্তরাধিকারী। কিন্তু এ বৃদ্ধ বয়সে আর পেছনে তাকাতে ইচ্ছা করছে না। সত্য জেনেও অতীতের ভুল স্বীকার করার মতো মানসিকতা আজ নেই। খুব অন্তর দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলাম। কিন্তু আজ দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছি।
অথচ ১৯৭১ সালে আমি এই মোদাবের সাহেবের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব দেখিনি। ১৯৭১ সালের জুন মাসে আমি ভারত থেকে ঢাকায় ফিরে আসি মুক্তিযোদ্ধা ও অর্থ সংগ্রহের জন্যে। আমি একরাতে মোদাব্বের সাহেবের বাসায় ছিলাম। মোদাব্বের সাহেব তখন জুনিয়র রেডক্রসের কর্মকর্তা। আমি লক্ষ করলাম–তাঁর বাসা থেকে জুনিয়র রেডক্রসের সমস্ত কিছু মুক্তিযুদ্ধের এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। এমনকি মানিকগঞ্জে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী যে স্পিডবোটটি ব্যবহার করতেন সে স্পিডবোটটিও জুনিয়র রেডক্রসের। মোদাব্বের সাহেব ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীকে এ স্পিডবোটটি দিয়েছেন। আমি ১৯৭১ সালের জুন-জুলাই মাসে মোদাব্বের সাহেবের মনে কোনো দ্বন্দ্ব দেখিনি। যে দ্বন্দে তিনি বিব্রত ছিলেন মাত্র বছর দু’তিন আগে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। আমার মনে হয় এরকম দ্বন্দ্ব শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানীর জীবনেও ছিল। এক সময় পাকিস্তান তাঁদের অস্তিত্ব ছিল। পাকিস্তান অর্জনে তারা শরিক ছিলেন। পাকিস্তান তাদের স্বপ্ন ছিল। সেই পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলা বা এ এলাকা থেকে সেই পাকিস্তানের নামটি একেবারে মুছে ফেলা তাঁদের পক্ষে সহজ বা সরল ছিল না। যে কথাটি সেকালের তরুণরা স্পষ্ট করে বলতে পেরেছে, সে কথাটি তাদের পক্ষে বলা আদৌ সহজ ছিল কি? এ প্রশ্ন তুলে আমি তাদের বাংলাদেশ স্বাধীন করার প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ আর কথা বলছি না। আমি বলছি যে, ঐতিহাসিক কারণে তাদের কিছুটা সীমাবদ্ধতা ছিল। কিছুটা পিছুটান ছিল।
মওলানা ভাসানী কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের কথা কোনদিনই বলেননি। বলেছেন, স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কথা। আর সে সময় শেখ সাহেব ছিলেন এই আসোলামু আলাইকুম বলার বিরুদ্ধে এবং এ প্রশ্নে সেই সময় ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগ মারামারি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়। ইত্তেফাকের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে মওলানা ভাসানী ভারতের এজেন্ট। সুতরাং স্বাধীন বাংলাদেশ দাবি করার মানসিক প্রস্তুতিই তখন ছিল না। চিন্তা ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে সবকিছু সমাধান করে মিলেমিশে থাকা। কিন্তু ষাটের দশকে এসে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। ১৯৪৭ সালে যে তরুণ পাকিস্তানের জন্যে শ্লোগান দিয়েছে, ১৯৫২ সালে সে দেখেছে ভাষার দাবিতে বাঙালি ছেলেকে গুলি খেতে। ১৯৫৪ সালে অভিজ্ঞতা হয়েছে, নির্বাচনে জিতলেও ক্ষমতা পাওয়া যাবে না। এ উঠতি বয়সের তরুণদের তেমন পাকিস্তান প্রীতি ছিল না। জিন্নাহ-লিয়াকত অনেক আগেই রাজনীতির মঞ্চ থেকে চলে গিয়েছেন। বাঙালি যুবকের কাছে তারা কোনো উচ্চ ধারণা রেখে যেতে পারেননি। এছাড়া তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে বাঙালি সামরিক এবং বেসামরিক আমলাদের মধ্যে। তারা তিক্ত অভিজ্ঞতায় বুঝেছে–বাঙালি বলেই তারা বঞ্চিত এবং শোষিত। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি বেঁচে থাকলে তাদের পদোন্নতি বন্ধ। চাকরিতে তারা কোনো সুযোগ সুবিধা পাবে না। এ পরিবেশেই সেকালের পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক জীবনে বাঙালিয়ানার জন্ম হয়। এ নতুন প্রজন্মের কাছে পাকিস্তান একটি অভিশাপ। এ অভিশাপের কবল থেকে বাঁচতে হলে স্বাধীন হতে হবে। বাঙালির রাজত্ব কায়েম করতে হবে। লক্ষণীয়, পাকিস্তানে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে কথিত বিদ্রোহের চেষ্টায় নেতৃত্বে ছিল সামরিক ও বেসামরিক আমলা। কোনো রাজনীতিক নয়। এ বিদ্রোহকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার জন্যে সামরিক এবং বেসামরিক আমলারা শেখ সাহেবকে নেতৃত্বে বসিয়েছিল। আওয়ামী লীগের কোনো সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে অভিহিত বিদ্রোহের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ ঘটনা থেকে পরিষ্কার, রাজনৈতিক নেতৃত্বের তুলনায় নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমলারা অনেক বেশি পাকিস্তানবিরোধী হয়েছিল। তারা একটি পরিবর্তন চেয়েছিল, যে পরিবর্তন পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোতে সম্ভব নয়। তবে সেই পরিবর্তনের চিন্তাধারার মধ্যে সমাজ বদলের কোনো কথা ছিল না। মুখ্য কথা ছিল সমাজের রূপান্তর হোক বা না হোক বাঙালিরাই বাঙালিকে শাসন করবে। আমাদের সংগ্রাম অবাঙালিদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাথমিকভাবে মূল নেতৃত্ব রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে আসেনি। সেখানে একটি প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব এবং দ্বিধা ছিল। কারণ স্বাধীনতার প্রশ্নটি কোনো দলীয় স্তরেই সামগ্রিকভাবে উত্থাপিত হয়নি। ফলে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান বা স্বাধীন বাংলাদেশ হবে, এ প্রশ্নের বিতর্কও শেষ পর্যন্ত ছিল এবং সেক্ষেত্রে আমার সুস্পষ্ট ধারণা হচ্ছে-পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সম্পর্কের কারণে শেখ মুজিবুর রহমান বা মওলানা ভাসানী কোনোদিনই একটি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। আমার ধারণা শেষ পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন পরিস্থিতির শিকার। তারা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। প্রসঙ্গত ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর একটি ভাষণ এখনো আমার কানে বাজছে। তখন মওলানা ভাসানীকে কৃষকের নয়নমণি বলা হতো। শেখ সাহেবকে বলা হতো বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা। মওলানা ভাসানী তাঁর পল্টনের ভাষণে বললেন, বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা আর কৃষকের নয়নের মনি ভাসানী, কোনো কিছুই কাজে আসবে না। মুজিব তোমাকে পষ্ট করেই বলি-পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন না হলে তোমার বা আমার গায়ের চামড়া থাকবে না। অর্থাৎ মওলানা সাহেবের সুর একান্তই পরিষ্কার-পরিস্থিতি তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। অপরদিকে শেষ কথাও বলতে পারছেন না। প্রশ্ন উঠতে পারে, কৌশল হিসেবেই মওলানা সাহেব স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি নিশ্চয়ই জবাব দিতে পারেন। যে–১৯৪০ সালের পাকিস্তান প্রস্তাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দুই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র নিয়েই পাকিস্তান গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই মূল প্রস্তাব গ্রাহ্য না করে পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল এবং সেই পটভূমিতেই স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান দাবি করা যায়। কারণ এ দাবি যুক্তিসঙ্গত এবং আইনসঙ্গত।
