আজকে অনেকে বলতে চেষ্টা করেন, আজকের বাংলাদেশ মুসিলম লীগের ১৯৪০ সালের পাকিস্তান প্রস্তাবেরই পরিণতি। ১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রস্তাবে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার কথা ছিল। এর একটি অংশ হবে সিন্দু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে গঠিত। অপরটি হবে-বাংলা ও বৃহত্তর আসাম নিয়ে গঠিত। সকলেরই জানা, ১৯৪৬ সালে এ প্রস্তাব সংশোধিত হয়েছিল। মুসলিম লীগের সাংসদের বিশেষ অধিবেশনে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন শহীদ সোহরাওয়াদী। অর্থাৎ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবের ফলেই মূল পাকিস্তান প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। দু’টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সমবায়ে পাকিস্তান গঠনের পরিবর্তে এককেন্দ্রিক পাকিস্তান গড়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরপরেও আজকে একজন লেখক বলতে চান, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্বপ্নে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার চিত্র ছিল। সে স্বপ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সার্বভৌম বাংলা গঠনের দাবি তুলেছিলেন ১৯৪৭ সালে এবং ১৯৭১ সালে সেই ভিত্তিতেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। সবচেয়ে মজার কথা হচ্ছে, যারা বাংলাদেশ চাননি, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের চরম বিরোধীতা করেছেন, তাঁরাই আজকে আগ বাড়িয়ে বলতে চাচ্ছেন–পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না এবং লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ তারা কেউ আর স্বীকার করতে চান না, মূল লাহোর প্রস্তাবের আদৌ অস্তিত্ব ছিল না পাকিস্তান গঠনকালে। পাকিস্তান লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে গঠিত হয়নি। সুতরাং লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ গঠনের কোনো প্রশ্নই আসে না। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা এবং লাহোর প্রস্তাবের নতুন মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তাহলে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে পাকিস্তান প্রস্তাবের কোনো সম্পর্ক ছিল না? লাহোর প্রস্তাব কি বাংলাদেশের আন্দোলনে কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি? এ পশ্নের জবাব ইতিবাচক। আমি ইতিপূর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একটি অংশের অগ্রণী ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছি। আমি একথাও বলার চেষ্টা করেছি, এ অংশের অনমনীয় ভূমিকা শেখ মুজিবুর রহমান এবং মওলানা ভাসানীকে বিপর্যস্ত করেছিল। এই দুই নেতা পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলন তাদের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। তারা পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে বেড়ে উঠেছিলেন। এ আন্দোলনের সঙ্গে তাঁদের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। সেই পাকিস্তানকে এক তুড়িতে না করে দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের এ অংশের নেতৃত্বের সাথে পাকিস্তান আন্দোলনের সম্পর্ক ছিল পাঠ্যপুস্তকের পাঠ্যক্রমে। আর পাকিস্তান ছিল তাদের কাছে। শোষণ ও বঞ্চনার প্রতীক। তাই পাকিস্তান ভাঙার প্রশ্নে তাদের আত্মার আত্মীয়তার কোনো সংযোগ ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরনো নেতৃত্বের সাথে নতুন নেতৃত্বের এ দ্বন্দ্ব পরবর্তীকালে প্রতি পদে পদে ফুটে উঠেছে এবং বারবার মনে হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান এবং মওলানা ভাসানী হয়তো বাংলাদেশের স্বাধীনতাই চাননি। অনেকের কাছে মনে হতে পারে আমার লেখায় এ প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক নয়। আমার জবানবন্দির প্রথম পর্বেই একথা আলোচিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমি ইচ্ছা করেই এ কথাগুলো পরে লিখছি। কারণ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন কোনো ধরাবাঁধা ছকে হয়নি। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে মতানৈক্য ছিল। সে মতানৈক্যের ফলেই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সম্পর্কে নেতৃত্ব নিয়ে এখন প্রশ্ন ওঠে। এখনো বিতর্ক হয়। বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, অনেক সময় মনে হয় যে, ৭১-এর সংগ্রামটাই বোধ হয় সঠিক ছিল না। এ মনে হওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে না পারলে অনেক প্রশ্নই অমীমাংসিত থেকে যাবে। বোঝা যাবে না–কেন মওলানা ভাসানী ২৫ মার্চের পূর্বরাত পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের কথা না বলে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কথা বলেছিলেন। কেন শেখ সাহেব ৭ মার্চের ভাষণে এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলার পূর্বে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ বলেছিলেন। আমার মতে, কোনো কিছুই হঠাৎ করে ঘটেনি। ঘটেনি বলেই সেদিনের ঘটনার প্রেক্ষাপট জানা দরকার।
একটা প্রশ্ন বিভিন্ন পত্রিকায় বারবার আলোচিত হয়েছে। প্রশ্নটি হচ্ছে–মওলানা ভাসানী কেন স্বাধীন বাংলাদেশের কথা না বলে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কথা বলেছিলেন। ১৯৬৮ সালে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা গঠনের দাবি জানানো হয়। ছাত্রদের এ গ্রুপটি তার অনুগত হলেও তিনি দাবি মেনে নেননি। তিনি বলেছেন, আমার লাশের ওপর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবে।
শেখ সাহেব ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন–এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। কেন তিনি শুধু স্বাধীনতার সগ্রামের কথা বলেন না! সে প্রশ্নে আমি পরে আসছি।
