প্রশ্নটি প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু সাদামাটা কথায় ব্যাখা করা অতো সহজ নয়। কারণ বামপন্থীরা কথা বলতে গেলে বামপন্থীদের মধ্যকার বিভাজন মেনে নিতে হবে। বামপন্থী হিসেবে তৎকালীন পূর্ববাংলায় বৃহৎ দল হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি। এ কথা সকলেরই জানা যে লেনিনের মৃত্যুর পর যে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে। তখন স্ট্যালিনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক দুনিয়া কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব দিত। একই কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের নির্দেশ অনুযায়ী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির রণনীতি ও কৌশল নির্ধারিত হতো। লক্ষ করলে দেখা যাবে মস্কোনীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ১৯৪৬ সালের আগে জন্মের পর থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শরিক হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর বা গদর পার্টির সদস্য হিসেবে অনেক নেতাই জেল খেটেছেন, ব্রিটিশের নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়ার পর বড় ধরনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে তাঁরা দুরে থেকেছেন। ত্রিশের দশকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন করেনি। কারণ তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পক্ষ থেকে কংগ্রেসকে বুর্জোয়া নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান বলে তাদের নেতৃত্বে কমিউনিস্টদের আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিতে বারণ করা হয়। পরবর্তীকালে ফ্যাসিবাদের উত্থানের পর আবার কংগ্রেস নেতৃত্বকে মেনে নেয়ার নির্দেশ দেয় তৃতীয় আন্তর্জাতিক। আবার তৃতীয় আন্তর্জাতিকের নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকে জনযুদ্ধ বলে ঘোষণা করে। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে। নেতাজী সুভাষ বসু ও তাঁর নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজকে ফ্যাসিবাদী বলে আখ্যায়িত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ সমর্থন করে। অর্থাৎ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মূলনীতি নির্ধারিত হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত পূর্ব বাংলা সম্পর্কে তাদের কোনো ভিন্ন কর্মসূচি ছিল না।
এর মাঝখানে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে আর একটি ঘটনা ঘটে। ১৯৪৮ সালে কোলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসে বিডি রণদিভে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে বলা হয়, ব্রিটিশ চলে গেলেও ভারত বা পাকিস্তান স্বাধীন হয়নি। এ আজাদী ঝুটা। লাখ লাখ মানুষ অনাহারে আছে। সুতরাং আঘাতের পর আঘাত করে ক্ষমতাসীন সরকারের উচ্ছেদ ঘটাতে হবে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের এ সিদ্ধান্ত শুধু ভারত নয়, পাকিস্তানের জন্যেও প্রযোজ্য ছিল। প্রযোজ্য ছিল বলেই পূর্ব বাংলায়ও একই ধরনের আন্দোলন হয় এবং এ আন্দোলন করতে গিয়েই ইলা মিত্র নির্যাতিত এবং গ্রেফতার হয়েছিলেন। অর্থাৎ ইলা মিত্র শুধু তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন না। এ ইতিহাস থেকে আমি বোঝাতে চাচ্ছি, লেনিনের মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যে ধারা রচিত হয়েছিল সেই ধারায়ই পরিচালিত হয়েছে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি। তাই তাদের আন্দোলনের কথা বরাবরই উপেক্ষিত হয়েছে। সুতরাং তাত্ত্বিক দিক দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচিতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কোনো চিন্তা ভাবনা ছিল না। প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে অন্য বামপন্থীরাই বা কী করেছিল?
তৎকালীন পূর্ব বাংলায় আরো দুটি বামপন্থী দল ছিল–বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আরএসপি ও ফরোয়ার্ড ব্লক। ফরোয়ার্ড ব্লক গঠিত হয়েছিল ১৯৩৯ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে। নেতাজী দেশান্তরী হলে ফরোয়ার্ড ব্লক সুভাষপন্থী ও মার্কসবাদী নামে বিভক্ত হয়ে যায়। অপরদিকে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল গঠিত হয় ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চ। এ দলটির সকল নেতারা ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে যান। সকল নেতাদের মুক্তি পেতে পেতে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত শেষ হয়ে যায়। এ দলটির লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্র। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বিকল্প হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিল। এদের সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল-লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন ভুল পথে চলেছে। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্যে নতুন দল দরকার। এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন অনুশীলন সমিতির অগ্নিযুগের নেতারা। কিন্তু এ দলের গঠন পর্বেই নেতাদের জেলে যেতে হয় এবং ভারত বিভক্ত হয়। তবুও ফরোয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি দেশ ভাগের চরম বিরোধিতা করেছিল। শেষ পর্যন্ত শরিক হয়েছিল-সার্বভৌম বাংলা গঠনের আন্দোলনে।
মোটামুটিভাবে এটাই ছিল বামপন্থী দলগুলোর ইতিহাস। যদি আমি ধরে নিই যে কমিউনিস্ট পার্টি, আরএসপি এবং ফরোয়ার্ড ব্লকের তৎকালীন দায়িত্ব ছিল সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা। তবুও প্রশ্ন থেকে যায় তাদের পক্ষে এ আন্দোলন করা আদৌ স্বাভাবিক ছিল কি? অনেকে বলেন, ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়, এ আন্দোলনের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দ্রুণ ছিল। তবে এ ব্যাপারে আমার কিছুটা দ্বিমত আছে।
