পাকিস্তান আমলের শেষ দিক থেকেই ছাত্রলীগের নেতৃত্ব সম্পর্কে আমার মনে নানা প্রশ্ন ছিল। আমি এক সময় ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক ছিলাম। সভাপতি ছিলেন আব্দুল মোমিন তালুকদার। সম্পাদক ছিলেন আব্দুল আউয়াল। আমাদের কালে ছাত্রলীগের স্বতন্ত্র নেতৃত্ব ছিল–যাহা আওয়ামী লীগ তাহাই ছাত্রলীগ নয়। ১৯৫৬ সালে নীতিগত প্রশ্নে ছাত্রলীগের নেতৃত্বের বিপরীত একটি অংশের সঙ্গে আমাদের মতানৈক্য হয়। তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি সুয়েজ খাল সংঘর্ষের সময় মিশরের বিরুদ্ধ ব্রিটেন ও ফরাসির পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর আমলে একের পর এক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রতিটি চুক্তি ছাত্রলীগ সমর্থন করতে থাকে। প্রতিবাদে ছাত্রলীগের নেতৃত্বের একটি বড় অংশ ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করে। এ পদত্যাগকারীদের মধ্যে আমি ব্যতীত ছিলেন এনায়েতুল্লাহ খান, আবদুল হালিম, জহিরুল ইসলাম, আহমদ হুমায়ুন, ময়মনসিংহের কাজী আব্দুল বারী, নোয়াখালীর নুরুল হক চৌধুরী (মেহেদী) প্রমুখ। আমাদের পদত্যাগের পর ছাত্রলীগ একেবারেই আওয়ামী লীগের লেজুড়ে পরিণত হয়।
কিন্তু এর একটি পরিবর্তন লক্ষ করা গেলো ষাটের দশকে। আমাদের দল অর্থাৎ শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল তখন গঠিত হয়নি। আমরা আরএসপি বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলের নামেই গোপনে কাজ করতাম। আমাদের কাজ ছিল শিল্প এলাকায়, শ্রমিক সংগঠনের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন। আমাদের আমলেই আইয়ুব খানের সামরিক শাসন লজ্জন করে সারা পূর্ব পাকিস্তানে তিনবার চটকল ধর্মঘট হয়। আমাদের প্রভাব ছিল খুলনা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত।
এ সময় ছাত্রলীগের নেতারা আমাদের সঙ্গে বারবার বৈঠকে বসে। তাদের বক্তব্য ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে এবং এ জন্য আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমাদের বক্তব্যও ছিল স্পষ্ট। আমরা বলতাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা আছি, কিন্তু আগেই জানা প্রয়োজন বাংলাদেশ নামে আমরা কোনো রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে চাচ্ছি। একবার ভারতবর্ষ ভেঙে পাকিস্তান হয়েছে। আমরা আর একটা পাকিস্তান করতে চাই না। ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তব্য ছিল, সে প্রশ্ন এখন নয়। সে প্রশ্ন পরবর্তীকালে বিবেচনা করা যাবে। এ মুহূর্তের প্রশ্ন বাংলাদেশ স্বাধীন করা।
এ আলোচনায় আমি খুব বিশেষ অংশগ্রহণ করতাম না। এ আলোচনা নিয়ে আমার সংশয় ও বিভ্রান্তি ছিল। আমি দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের সদস্য ছিলাম। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকেই আমি ঘনিষ্ঠভাবে চিনি। এই নেতারা বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে চায়, এ বিশ্বাস আমার আদৌ ছিল না। তাহলে এরা কী চায়? এদের পেছনে কারা আছে? আওয়ামী লীগের কোন অংশ এদের সমর্থক? আমার কাছে কোনো কিছু স্পষ্ট ছিল না। শুধু এটুকু বুঝতাম যে শেখ মুজিবুর রহমানের সায় না থাকলে কারো এ ব্যাপারে কথা বলা সম্ভব না। পরবর্তীকালের আর একটি ঘটনা আমাকে বিভ্রান্ত করল। ঘটনাটি ছিল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দাবি করে প্রস্তাব উত্থাপন নিয়ে। এ প্রস্তাব নিয়ে মতান্তর হয়। একদিকে আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ এবং অপরদিকে নূরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কুদুস মাখন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন চট্টগ্রামের স্বপন চৌধুরী। এ প্রস্তাব উত্থাপনের পর স্বপন চৌধুরী ছুরিকাহত হয়।
আমার মনে গভীর সংশয় দেখা দেয়। তাহলে সত্যি সত্যি শেখ সাহেব কোন দিকে? আমি যতদূর শুনেছি শেখ ফজলুল হক মনি, নূরে আলম সিদ্দিকী ও মাখনের পক্ষে। তাহলে শেখ সাহেবের ভূমিকা কী? আবার একথাও শুনেছি যে সকলেই স্বাধীনতার পক্ষে হলেও এই সময় স্বাধীনতা সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ সময়োচিত ছিল না। ছিল না বলেই এই প্রস্তাব নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। তবুও আমার মনে হয়েছে–ছাত্রলীগের একটি অংশ অন্তত আমাদের কালের মতোই স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছে।
এ পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুরু হয়। সংগ্রামের সময় দেখেছি ছাত্রলীগের যৌথ নেতৃত্ব। যৌথভাবেই তারা তাজউদ্দিন আহমেদের বিরোধিতা করেছে। মুজিববাহিনী গঠন করেছে। ৭১-এর সংগ্রামে নিজস্ব নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাত্রলীগের কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কথা শোনা যায়নি। কিন্তু পুরনো কোন্দল দেখা দিল মার্চ মাসের পর থেকে। সেই কোন্দলে বিভক্ত হলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। পরবর্তীকালে গঠিত হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। কিন্তু কেন?
আজ স্বাধীনতার ২৭ বছর পর কল্পনাকাহিনী বা গল্প লেখার অবকাশ নেই। অথচ এটাই সত্য, সাম্প্রতিককালে ৭১-এর যুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গিয়ে সকলেই রণাঙ্গণের ইতিহাস লিখছেন। লিখছেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখালেখি হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেকালের যুদ্ধের কোনো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হচ্ছে না। কেন সেই যুদ্ধ হয়েছিল? কারা এর উদ্যোক্তা? কারাই বা সহযোগী? সে প্রশ্ন সকলেই এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সে প্রশ্নের জবাব একদিন দিতেই হবে।
একটি মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, এ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব বামপন্থীরা নিল না কেন? তাদের কথা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছে। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত সমাজকে ১৯৭১ সালে জাতীয়তাবাদের কথা বলেই ঐক্যবদ্ধ করা হলো। অথচ বামপন্থীরা জাতীয়তাবাদের কথা বলল না। তারা প্রথমেই সমাজতন্ত্রের শ্লোগান দিল। অবৈজ্ঞানিকভাবে তারা জাতীয়তাবাদের পর্বটি এড়িয়ে যেতে চাইল। কিন্তু পারল না। সেই জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম হলো, কিন্তু বামপন্থীদের নেতৃত্বে নয়। নেতৃত্ব দিল বুর্জোয়া শ্রেণি। তারা ধ্বনি তুলল জয় বাংলা। বামপন্থীরা বলল–জয় সর্বহারা। কিন্তু জয় সর্বহারার ধ্বনি জয় বাংলা স্লোগানের আবেগে তলিয়ে গেল। কেন এমন হলো?
