একথা মনে রাখতে হবে যে-প্রথম দিকে ভাষা আন্দোলনের প্রবক্তা কোনো বামপন্থী দল ছিল না। প্রবক্তা ছিল তমুদ্দিন মজলিশ। যারা খোলাফায়ে রাশেদিন-এর সমাজ কায়েমের প্রবক্তা ছিল। তারাই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি প্রথম জানিয়েছিল। আমার মতে, তাদের এ দাবির সাথে পাকিস্তান গঠনের দাবি সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। পাকিস্তান না হলে মুসলমানের উন্নতি হবে না। হিন্দুদের সাথে সহযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। ঠিক সেই যুক্তিতেই তারা বলেছিল, রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হলে বাঙালি মুসলমানরা চাকরি পাবে না।
প্রতিযোগিতায় হেরে যাবে অবাঙালিদের কাছে। পাকিস্তান সৃষ্টি হবে অর্থহীন। তাই লক্ষ করা যায়, প্রথম বাংলাকে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি করা হয়। পরে বলা হয়, বাংলা হবে উর্দুর সঙ্গে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা। সারা পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ জন নাগরিক বাঙালি হলেও কেউ কিন্তু বাংলাকে একক রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করল না। পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই ভাষা নয় এমন একটি ভাষা অর্থাৎ উর্দুকে বাংলার সাথে স্থান দেয়া হলো! এক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের চেয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছিল বাংলা ভাষাভাষীদের সুযোগ সুবিধার প্রশ্ন।
তবে এ প্রশ্ন আমি বাদ দিতে রাজি আছি। বলা যেতে পারে, সবকিছু বাদ দিয়ে বামপন্থীদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করাই ছিল শ্রেয়। কিন্তু সম্ভব ছিল কি? যারা এ ব্যাপারে তত্ত্ব দিচ্ছেন তারা কি কোনোদিন সেকালের বাস্তব পরিস্থিতি ভেবে দেখেছেন? আমি সেকালের তিনটি বামপন্থী দলের কথা উল্লেখ করেছি। লক্ষ্যণীয় যে, এ তিনটি দলের নেতৃত্ব এসেছে মধ্যবিত্ত হিন্দু সম্প্রদায় থেকে। এ দলগুলোর শতকরা ৯৫ থেকে ৯৯ জন সদস্য হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। দেশভাগের পরে তাদের পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত। তারা দেশান্তরী হবে কিনা সে সমস্যার সমাধান হয়নি। অনেক পরিবারে সদস্যই ইতোমধ্যে দেশান্তরী হয়েছে। তাদের ভারতভিত্তিক মূল রাজনৈতিক দল সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কখনো মুসলমান কমরেডদের ভারত থেকে পাকিস্তানে আসতে বলা হচ্ছে। হিন্দু কমরেডদের বলা হচ্ছে পাকিস্তান থেকে ভারত যেতে–অর্থাৎ সিদ্ধান্তই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে।
এ পরিস্থিতিতে সমাজেও সংশয় ও বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে। একজন মুসলমান কমরেড জানে না তার পাশের হিন্দু কমরেডটি তার পাশে থাকবে কিনা। কোনো দাঙ্গা দেখা দিলে তাকে রক্ষা করা যাবে কিনা এবং এ পরিস্থিতি চরমে উঠল ১৯৫০ সালে। ভয়াবহ দাঙ্গা হলো পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায়। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী। এ দু’প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব চুক্তি হলো। এ চুক্তির ফলে ভারতের দাঙ্গা দুর্গত মুসলমানদের পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের দাঙ্গা দুর্গত হিন্দুদের ভারতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। পরিবহনের ব্যবস্থা করল উভয় সরকার। দু’টি দেশের মানুষ দেশান্তরী হলো শুধুমাত্র তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যে।
আজকে ৪৮ বছর পরে লেখালেখি করে এ পরিস্থিতি কাউকে বোঝানো যাবে না সেদিনের হিন্দু কমরেডদের পক্ষে সেদিনের পূর্ব বাংলায় ইচ্ছে না থাকলেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করা সহজ ছিল না। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছাড়াও ছিল সরকারি নির্যাতন। কথাগুলো ছিল এমন–কমিউনিস্ট মানে হিন্দ, কমিউনিস্ট মানে নাস্তিক আর হিন্দু মানে পাকিস্তানের বিপক্ষে। সুতরাং এদের জেলে পাঠাতে হবে। সম্ভব হলে জেলে পাঠাবার আগেই তাদের শেষ করতে হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি যেনো জন্ম নিয়েছিল কমিউনিস্ট ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার জন্যে। এর এই বাস্তব পরিস্থিতিতে হিন্দুদের নেতৃত্বে যতটুকু সম্ভব চালু ছিল বামপন্থী কর্মকাণ্ড। আত্মগোপনের জন্যে প্রত্যেক নেতাকেই একটি আরবি নাম দিতে হয়েছিল। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই আমার ধারণা সেকালে বামপন্থী কর্মসূচিতে জাতীয়তাবাদ আন্দোলনকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন হতো না।
এ পটভূমি সামগ্রিক বিচার বিবেচনা করলে অনেক কথাই বেরিয়ে আসবে। এবং বোঝা যাবে যে, আমরা যারা সে আমলের স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার কথা বলি তাদের অনেক স্বপ্নই বোধ হয় সঠিক ছিল না। সে স্বপ্ন ছিল একান্তইভাবেই মনগড়া। এখানে উল্লেখযোগ্য যারা ষাটের দশকের আগ পর্যন্ত তীব্র ভারতবিরোধী, পাকিস্তানপন্থী ছিল তাদেরই দেখা গেলো ষাটের দশকে এসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতা হিসেবে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের যে অংশটি এতদিন পর্যন্ত কমিউনিস্টদের পি করে শ্লোগান দিত–হো হো মাও চীনে যাও ব্যাঙ খাও, তারাই যেন আন্তর্জাতিক হয়ে গেলো। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা তুলছে খুব কঠোর এবং কঠিনভাবে। ছাত্রদের এ অংশটির আন্দোলনে বিপর্যস্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিবুর রহমান এমনকি মওলানা ভাসানী পর্যন্ত। আমার লেখায় অনেকে হয়তো ক্ষুব্ধ হবেন। আমি লিখেছি পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবির আন্দোলনের সাথে বাঙালিত্বের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ছিল পাকিস্তান দাবির মতোই একটি দাবি। এই দাবির পেছনে যুক্তি ছিল–আমরা বাঙালিরা উর্দু জানি না। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে আমরা চাকরি পাব না। অখণ্ড ভারতে আমরা প্রতিযোগিতায় হিন্দুদের সঙ্গে পারিনি। সুতরাং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে। আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা হচ্ছে ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত বাঙালিয়ানার দাবি তেমন তীব্র ছিল না। এই প্রসঙ্গে আমি বারবার একটি গানের কথা উল্লেখ করেছি।
