২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হামলার আগে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাজউদ্দিনের দেখা হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার কথা ছাড়া অন্য কোনো কথা শেখ সাহেব বলেছিলেন, তাজউদ্দিন সাহেব তা কোনোদিনই বলেননি। অর্থাৎ সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি শেখ সাহেবের কোনো নির্দেশ ছিল না। সাম্প্রতিককালে সে কালের কিছু ছাত্রলীগ নেতা শেখ সাহেবের কিছু নির্দেশের কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি পত্রিকায় এমনো লেখা হচ্ছে যে, শেখ সাহেব নাকি জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্যে লন্ডন গিয়ে লন্ডনের ভারতীয় হাইকমিশনার থেকে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা বলেছিলেন। তখন তিনি নাকি মুক্তিবাহিনী গঠনের কথাও বলেছিলেন। অথচ সাংগঠনিকভাবে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ যে একেবারেই অন্ধকারে ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এর ছাপ আছে পরবর্তী ঘটনায়। পরবর্তীকালে তাজউদ্দিন আহমেদের প্রধানমন্ত্রী হওয়া, মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় মুজিবনগর স্থাপন, স্বাধীন বাংলা সরকার গঠন–সব কিছুই ছিল স্থান কাল পাত্র হিসেবে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফল। সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সব কিছু করা হয়েছিল সে কথা যেমন সত্য নয়, তেমন একথাও সত্য যে তখন সবকিছু গুছিয়ে করা সম্ভব ছিল না।
এ অবস্থা চলছিল যুদ্ধের নমাস। যুদ্ধ শেষে প্রশ্ন দেখা দিল–স্বাধীন বাংলার নেতৃত্ব কে করবে? কেউই তখন নিশ্চিত নয় যে-পাকিস্তান জেল থেকে শেখ সাহেব আদৌ ফিরবেন কিনা। এমন একটি কথা যুদ্ধকালে খন্দকার মোশতাক চাউর করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, শেখ মুজিব আর স্বাধীনতা দুটো পাওয়া যাবে না। শেখ মুজিবকে জীবিত চাইলে অধিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে পাকিস্তানেই থাকতে হবে। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে শেখ সাহেবকে জীবিত পাওয়া যাবে না। খন্দকার মোশতাক আহমদের এ ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং শেখ সাহেব তখনো জীবিত। তবুও সন্দেহ সংশয় আছে যে, শেখ সাহেব আদৌ ফিরবেন কিনা, আর আদৌ ফিরলে কিভাবে ফিরবেন। একটি মহলের বক্তব্য হচ্ছে, এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল ভারতের মাটিতেই। এবারে ভারত সরকারও শঙ্কিত ছিল। সেকালের একটি ঘটনা এ ব্যাপারে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালে প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তিনি একটি কথাই বলেন যে, শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়া হোক। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হোক। ভারতের পক্ষে লাখ লাখ শরণার্থীর বোঝা বহন করা আদৌ সম্ভব নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে শরণার্থীদেরকে নিজস্ব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শ্রীমতী গান্ধীর কথা খুব পরিষ্কার। সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু শেখ মুজিবুর রহমান। এ প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল শেখ সাহেবের ফিরে না আসার প্রশ্নটি এবং শঙ্কিত হয়েছিল ভারত সরকার। সকলেরই প্রশ্ন ছিল–শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের রূপ কী হবে? ভারত সরকারের একটি মহলের মতে, তাজউদ্দিন আহমেদ সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুসারী। তাঁর নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ সরকার একটি বামপন্থী সরকার হবে। উপমহাদেশে ভারসাম্য বিপর্যস্ত করবে। অনেকেরই ধারণা, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যেই ভারতের সেনাবাহিনী মুজিববাহিনী গঠন করেছিল। মুজিববাহিনী স্পষ্টতই কমিউনিস্ট বিরোধী ছিল। মুজিববাহিনী দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি হয়নি। তারা বলেছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা অস্ত্র সমর্পণ করব না। মুজিব বাহিনীর অন্যতম নেতা শেখ ফজলুল হক মনি মুজিব বাহিনীর স্রষ্টা জেনারেল ওবানকে বলেছিলেন–ভারত সরকারের মস্কোপন্থী আমলা ডিপি ধর বাংলাদেশে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের চেষ্টা করছে (উল্লেখ্য যে পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল)। ৭১ এর সগ্রামের সময় ভারতের মাটিতে কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যে কার্যক্রম শুরু করে।
প্রসঙ্গত আর একটি সমস্যাও ছিল। সত্যি সত্যি শেখ মুজিব ফিরে না এলে মুজিববাহিনীর পক্ষে পরিস্থিতি মোকাবেলা কি আদৌ সম্ভব হবে? আমার মনে হয় সে প্রেক্ষিতেই ভারত সরকার আর একটি পদক্ষেপ নিয়েছিল। লক্ষ করলে দেখা যাবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত বাংলাদেশে যে কূটনীতিকদের পাঠিয়েছিলেন তাদের অনেকেই ছিল এককালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং শুভানুধ্যায়ী। রাজনৈতিক দিক থেকে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। অর্থাৎ শেখ সাহেব যদি ফিরে না আসেন, যদি বামপন্থীরাই ক্ষমতায় যায় সে পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতিও ভারত সরকারের ছিল। এটা হচ্ছে একান্তই আমার মত। তবে এসময় স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রায় সকল মহলই বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। কেউ বুঝতে চাইলেন না, বাংলাদেশ ভিয়েতনাম জার্মানি কিংবা কোরিয়া নয়। ওই তিনটি দেশ ভাগ হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক কারণে নয়। এখানে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার একটি জাতিগত দিক আছে। কিন্তু বাংলাদেশ ভাগ হয়েছিল সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে। একটি সংশয়, বিভ্রান্তি ও প্রতিহিংসার পরিবেশ। পাকিস্তানের পর ২৩ বছর সেই বিভক্তিকে যৌক্তিক বলে বোঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে। অপরদিকে অমুসলমানের ধন-সম্পদ জমিজমা দখল করে একটি নতুন শ্রেণি গড়ে উঠেছে। মোটামুটিভাবে তারাই সমাজের নেতা। ১৯৭১ সালের ঘটনা এই মহলেরও একটি প্রতিক্রিয়া ঘটায়। স্বাভাবিকভাবেই এ মহলটি ভীত এবং সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তাদের আশঙ্কা দেশ স্বাধীন হলে দেশত্যাগী হিন্দুরা ফিরে আসবে। তাদের পৈত্রিক জমি ফেরত দিতে হবে। পরের সম্পদ লুণ্ঠন করে গড়ে ভোলা তাদের সাধের সংসার ছারখার হয়ে যাবে। এ আশঙ্কা অস্বাভাবিক নয় এবং বাস্তবে এমন ঘটনা না ঘটলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অসংখ্য মানুষ বাংলাদেশে ফিরল আসাম, পশ্চিম বাংলা ও ত্রিপুরা থেকে। কেউ এল স্বপ্নের জন্মভূমি দেখতে। আবার কেউ এল ফেলে যাওয়া সহায় সম্পদ ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে। গ্রাম-গ্রামান্তরে একটি নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। ওপারে বাঙালিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেও কোথায় যেন একটা ক্ষত ছিল। এ ক্ষত নিরাময় করার কোনো চেষ্টা কোনো মহল থেকে হলো না। ফিসফিস করে বলা হতে থাকল, ভারত বাংলাদেশকে গ্রাস করবে। এ পটভূমিতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি। পরবর্তীকালে ২৬ মার্চ জাতীয়করণ করা হলো পাটকল, বস্ত্রকল। একটি মহল থেকে প্রচার করা হলো–আমাদের পাটকল, বস্ত্রকল শেষ করা হচ্ছে ভারতীয় বেনিয়াদের স্বার্থে। এমনো বলা হলো যেন পাটকল ও বস্ত্ৰকলের যন্ত্রপাতি মেশিন সবই ভারতে পাচার করা হচ্ছে। আমি আগেই বলেছি–দেশ স্বাধীন করার প্রশ্নটি শুধুমাত্র শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার না করে তার গতি-প্রকৃতি এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে চিন্তাভাবনা বা প্রস্তুতি থাকলে এ ঘটনা ঘটত না। তখন এ ঘটনা আমাকে পীড়িত করত। কিন্তু করার কিছু ছিল না। কারণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে ন্যাপ যেন তাদের ৭১-এর সংগ্রামের স্বপ্নেই বিভোর। সবার মনে একই চেতনা এবং চিন্তা যে আমরা বিরাট একটা কাজ করেছি। কেউ ভাবলাম না যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের শত্রু অনেক শক্তিশালী। প্রস্তুতি ছাড়া একটি সংগ্রামকে লক্ষ্যে পৌঁছানো খুব কঠিন। কেউই বুঝতে চাইলাম না যে আমাদের নিজস্ব শক্তি থাকলে আমরা ভারতের উপর নির্ভর করতাম না, ভারতের ওপর নির্ভরতা প্রমাণ করে যে, আমাদের দেশি ও বিদেশি শক্তি আমাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, তাই আমাদের স্বাধীনতার পরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সঙ্কট মোকাবেলা করাই ছিল একমাত্র কাজ। কিন্তু সে কাজটি কেউ করলাম না। তিনটি দল দাবি করতে শুরু করল যে তারাই একমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী। আর এ সময় শুরু হলো–আওয়ামী লীগের প্রধান শক্তি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব। আর আমার মনে হচ্ছিল-এবার আর এক বিস্ফোরণের দিকে এগুচ্ছে। সবাই বড় গোলমেলে। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি এ সমস্যা বিবেচনায় না নিলেও প্রতিপক্ষ এর সুযোগ নিল। একাত্তরের যুদ্ধের পরাজিত শক্তি ভারত বিরোধী প্রচারণা শুরু করল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে কোনো আন্দোলন এই পরাজিত শক্তির সাহায্য ও সহযোগিতা পেতে থাকল।
