১. পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি, ২. পাকিস্তানের বাঙালি দালালদের সম্পত্তি, ৩. রুগ্ন শিল্প কারখানা। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে এই তিন ধরনের শিল্প মালিকানা সরকারকে নিতে হয়। এতে সমাজতন্ত্রের নাম গন্ধ ছিল না।
তবে এই শিল্প কারখানাগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত করার সময় এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন দেখা দেয় অন্তর্বর্তীকালের জন্যে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর তত্ত্বাবধায়ক কে হবে। বিস্ময়ের সাথে দেখা গেল, তৎকালীন সরকার বাঘের কাছে গরু রাখালি দিলেন। অবাঙালি শিল্প কারখানায় দলীয় আত্মীয়-স্বজনদের প্রশাসক করা হলো। আর বাঙালি বস্ত্রকল ও পাটকলের মালিকদেরই দায়িত্ব দেয়া হলো তাদের কল কারখানা দেখাশুনার। স্বাভাবিক নিয়মে আত্মীয়-স্বজন ও দলের লোকেরা রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা লুটপাট করে ছাড়লেন। আর বাঙালি মালিকরা তাঁদের মালিকানায় কারখানার সবকিছু আত্মসাত করে ব্যাংক ঋণসহ বাজারে কোটি কোটি টাকার ঋণ সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন। এই লুটপাটের খাতের নাম হলো রাষ্ট্রায়ত্ত খাত। একদল উৎসাহী বুদ্ধিজীবী ও ষড়যন্ত্রকারী এই খাতকে সমাজতন্ত্রের পক্ষে বিরাট পদক্ষেপ বলে সমাজতন্ত্রকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যে উঠে-পড়ে লাগলেন।
সে পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলেছি ১৯৭২ সালে ২৬ মার্চ একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল জাতীয় জীবনে। সমাজতন্ত্রকে চিরতরে নির্বাসন দেয়ার জন্যে সেদিন পরিত্যক্ত সম্পত্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করে নাম দেয়া হলো সমাজতন্ত্র। এক শ্রেণির সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী এ রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে সমাজতন্ত্রের সাথে সমার্থক করে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিষ উদগীরণ শুরু করল। সেই ষড়যন্ত্র মাজো চলছে। আজো তারা সেদিনের রাষ্ট্রায়ত্ত করাকে সমাজতন্ত্রের সমার্থক বলে প্রচার করার চেষ্টা করছে। এ সুবাদে পরিকল্পিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে দিনের পর দিন লেখালেখি করে যাচ্ছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় লেখা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে দুর্নীতি ও লোকসানের কথা। বেসরকারি খাত নিয়ে এ মহাটির কোনো মাথাব্যথা নেই। বেসরকারি খাতের মালিকেরা যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এ ব্যাংকগুলোকে পথে বসিয়েছে, সে ব্যাপারে ঋণ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কথা না বলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিরুদ্ধেই কথা বলা হচ্ছে বেশি। লুটপাট করছে। পৃথিবীর দেশে দেশে বেসরকারি খাতের এটাই যে চিরায়ত চিত্র, সে নিয়ে এরা আদৌ উদ্বিগ্ন নয়। সমাজতন্ত্রকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে লুটপাটের সমস্ত দায়িত্ব সমাজতন্ত্রের উপরই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ থেকে এ পর্বের শুরু। সমাজতন্ত্রের নামে ধাপ্পাবাজি শুরু হয় তথাকথিত রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তি লুটপাটের মধ্য দিয়ে। সেই লুটপাটের সকল দায়িত্ব শুধু সেকালের সরকারের নয়। সেকালের সরকার সমাজতন্ত্রের নামে লুটপাট কায়েম করেছিল। পরবর্তীকালে জিয়া, এরশাদ, বেগম জিয়া এবং আজকের শেখ হাসিনা সেই রাষ্ট্রায়ত্ত খাত নিয়ে একই খেলা খেলছেন।
কেউ বলছে না যে, ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ এমনি বিশেষ কারণে বস্ত্রকল, পাটকল, ব্যাংক, বীমা রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানি ব্যতীত অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়নি। এ পদক্ষেপ সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে হলে প্রথমেই রাষ্ট্রায়ত্ত করা হতো বিদেশিদের কারখানা। এর কারণ নিহিত ছিল ১৯৭১ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের শ্রেণি চরিত্রে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। বাঙালি অবাঙালি অধিকাংশ শিল্পপতি ছিল মুসলিম লীগ পন্থী। সুতরাং আওয়ামী লীগ সদস্যেদের শিল্প কারখানা সম্পর্কে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। ওই শিল্প কারখানা কেনার মতো মূলধনও তখন আওয়ামী লীগ সদস্যদের ছিল না। ফলে এ শিল্পগুলো বেসরকারি খাতে বিক্রি করে দেয়ার প্রশ্ন আদৌ আসেনি। নিজেদের পকেটে বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তল্কালীন সরকার পুঁজি বিনিয়োগের অংক বেঁধে দেন। এক শ্রেণির জ্ঞানপাপী স্বল্পমূল্যে এই কলকারখানার মালিক হতে না পেরে এর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। আর এক শ্রেণির আওয়ামী লীগের ভাই-ব্রাদারও পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক মোক্তার হয়ে সবকিছু আত্মসাৎ করে এবং এটাকেই সমাজতন্ত্র বলে প্রচার করে নিজেদের লুটপাট জায়েজ করার চেষ্টা করে। পরবর্তীকালে বাকশাল কায়েম করে সবকিছু সমাজতন্ত্রের জন্যে করা হচ্ছে, এ বক্তব্যকে আর এক দফা যৌক্তিকতার ভিত্তি দেয়া হয়। আর প্রতিপক্ষকে সুযোগ দেয়া হয় সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জঘন্য প্রচারণার।
আমার কাছে রাজনীতিটা গোলমেলে মনে হচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা শুরু করেছিল। এই হামলার কথা সকলের জানা থাকলেও সংগঠিত প্রতিরোধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। ব্যক্তি বা সমষ্টিগতভাবে কেউই জানত না এ যুদ্ধ কী রূপ নেবে। এ ব্যাপারে সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগেরও কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। ছাত্রলীগের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছিল না। একটি মাত্র দল এবং সেই দলের একমাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান হওয়ায় কারো কিছু করার বা বলার ছিল না।
