একথা বলে শেখ সাহেব জিজ্ঞাসু চোখে শ্রীমতি গান্ধীর দিকে তাকিয়েছিলেন। শ্রীমতি গান্ধী উচ্চবাচ্য করেননি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনী প্রত্যাহার করায় মানুষ ভাবতে থাকে শেখ মুজিব বাপের বেটার মতো কথা বলেছেন। তাঁর এক ধমকেই ভারতীয় বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের এ মন্তব্য তখন আমার কাছেও খারাপ লাগেনি। কিন্তু সাথে সাথে নিজের মনেই প্রশ্ন জেগেছে–ভারতীয় বাহিনী নিয়ে এ মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে কেন? তাহলে কি ভারতীয় বাহিনীকে আমরা দখলদার বাহিনী হিসেবেই দেখেছি। নইলে শেখ মুজিবের ধমকে তাদের যেতে হয় কেন? তারা কেন সাধারণভাবে তাদের দায়িত্ব শেষ করে? তাহলে কি তখনই আমাদের ধারণা ছিল, ভারতীয় বাহিনী দখলদার বাহিনী হিসেবে থেকে যাবার চেষ্টা করতে পারে? নইলে স্বাধীনতার দু’মাসের মধ্যেই আমরা এমনভাবে ভাবতে শুরু করলাম কেন?
এ সময় সকলের অলক্ষ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন বাংলাদেশে অধিকাংশ কলকারখানার মালিক ছিল অবাঙালি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা দেশ ত্যাগ করে। সমস্যা দেখা দেয় তাদের ফেলে যাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সম্পত্তি নিয়ে।
ইতোমধ্যে একটি চক্র এই সম্পত্তি গ্রাস করতে চেষ্টা করে। অবাঙালিদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ও দোকানের বাঙালি কর্মচারিরা রাতারাতি সকল কিছুর মালিক হয়ে যায়।
সে ছিল এক লজ্জাজনক পরিস্থিতি। কিছুদিন পরে দেখা গেল ঢাকা শহরে সমস্ত অবাঙালিদের ব্যবসা আবার চালু হয়েছে। মালিক হয়ে বসেছে বাঙালিরা। এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অবাঙালিদের ফেলে যাওয়া ভবনে দলীয় অফিস স্থানান্তর করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, টঙ্গী, খুলনা শিল্প এলাকায় অবাঙালিদের ছোটখাটো কারখানা দখল করেছে বাঙালিরা। রাজধানী ঢাকায় রাতের অন্ধকারে এক শ্রেণির বাঙালি তাদের ভবন ও সহায়-সম্পত্তির মালিক হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ লুটপাটের নেতৃত্ব দিয়েছিল এক শ্রেণির তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা। এদের বলা হতো ষোড়শ বাহিনী। প্রকৃতপক্ষে এরা মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। অনেকে একাত্তরে যুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগিতা করেছে। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা বোল পাল্টিয়েছে। বন্দুক কাঁধে নিয়ে পরের সম্পত্তি দখলে নেমেছে। আমি আগেই বলেছি স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃবৃন্দ কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই এই যুদ্ধে নেমেছিলেন। তাঁদের চোখের সামনে কোনো সামগ্রিক চিত্র ছিল না। তারা বুঝতে চেষ্টা করেননি, একটি অসংগঠিত রাজনৈতিক প্রশিক্ষণহীন বাহিনীকে নিয়ে যুদ্ধ করলে তার ফলাফল কী হতে পারে। তাদের চোখের সামনে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা ছাড়া কোনো আদর্শ ছিল না। যুদ্ধের পর তারা দেশে ফিরে দেখেছে তাদের যুদ্ধকালীন নেতারা প্রতিপক্ষের গাড়ি-বাড়িসহ সবকিছুই দখল করেছে। ফলে তারাও নির্দ্বিধায় তাদের নেতাদের অনুসরণ করেছে এবং এমনি করে বেদখল হয়েছে অবাঙালিদের সকল সহায় সম্পত্তি। আমি হলফ করে বলতে পারি বাংলাদেশের নব্য পুঁজিপতিদের প্রাথমিক মূলধন এসেছে এই লুটপাট থেকে। এখনো নিরপেক্ষ জরিপ হলে দেখা যাবে, আমাদের অধিকাংশ কোটিপতিদের এই ধনসম্পদের মালিক হওয়ার উৎস সেকালের লুণ্ঠন। হিন্দু আর অবাঙালিদের সম্পত্তি।
কিন্তু এই লুটপাটেরও একটা সীমা ছিল। এ লুটপাটকারীরা অবাঙালিদের ছোটখাটো শিল্প কারখানা বাড়ি গাড়ি জবর-দখল করলেও বড় বড় শিল্প কলকারখানায় স্বাভাবিক কারণে তারা হস্তক্ষেপ করেনি। কারণ এই কারখানাগুলো দখল করা গেলেও এই কারখানা চালাবার শক্তি বা সামর্থ্য তাদের ছিল না। এই বড় কারখানার মধ্যে ছিল পাটকল ও বস্ত্ৰকল। এই পাটকল ও বস্ত্ৰকলের মালিক ছিল আদমজী, বাওয়ানী ও ইস্পাহানী গোষ্ঠী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেখা গেল এই কারখানার মালিক দেশান্তরী হওয়ায় এগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ সকল কারখানায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো খবরদারি করার চেষ্টা করলেও তাদের পক্ষে কারখানা সচল রাখা সম্ভব ছিল না।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়–পরিত্যক্ত কারখানা সম্বন্ধে। ইতোমধ্যে এই কারখানা সম্বন্ধে বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন সুপারিশ করা হচ্ছিলো। অনেক মহল থেকে বলা হলো-বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রনীতি সমাজতন্ত্র। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা থেকেই এই শিল্প কারখানাগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত করা হোক। কোনো ব্যক্তি মালিককে এই কারখানা দেয়া সঠিক হবে না। শুধু পাটকল, বস্ত্রকল নয়, এ সমস্যা দেখা দিলো ব্যাংক ও বীমা নিয়ে এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ পাটকল, বস্ত্রকল এবং ব্যাংক, বীমা রাষ্ট্রায়ত্ত করার ঘোষণা দেয়া হলো। বাঙালি ও অবাঙালি মালিকদের চা বাগানও রাষ্ট্রায়ত্ত করা হলো। রাষ্ট্রায়ত্ত করা হলো না বিদেশি মালিকদের ব্যাংক, বীমা ও চা বাগান।
আমাদের আওয়ামী লীগের বন্ধুরা চিৎকার শুরু করল। দেশে সমাজতন্ত্র এসে যাচ্ছে এবং সেই লক্ষ্যে সমস্ত শিল্প কারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করা হচ্ছে। আমাদের দল অর্থাৎ শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল থেকে বলা হলো এটা পরিত্যক্ত সম্পত্তির সমাজতন্ত্র (Abandoned Properties Socialism) অর্থাৎ আমরা বলতে চেয়েছি প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ কোনো সমাজতন্ত্রের দল নয়। আবার কোনো দেশে সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করলেই দেশটি সমাজতন্ত্রী হয় না। ব্রিটেনের শ্রমিক দল ক্ষমতায় এসে মূল ও ভারি শিল্প রাষ্ট্রায়ত্ত করে। তার ফলে কোনোদিনই ব্রিটেন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়নি। শ্রমিক দলের পরে রক্ষণশীল দল ক্ষমতায় এসে আবার এই সম্পত্তি বেসরকারি খাতে দিয়ে দেয়। ফলে ব্রিটেনের সমাজে কোনো মৌলিক রূপান্তর হয় না। সমাজতন্ত্র একটি আদর্শগত বিশ্বাস। আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত হয় একটি রাষ্ট্র। ওই আদর্শে বিশ্বাস না থাকলে সমাজতন্ত্রের ভিত রচনা করা যায় না। অথচ সমাজতন্ত্রের বিশ্বাস থেকে নয়, একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারকে অনেক সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করতে হয়েছিল। এই সম্পত্তির আবার তিনটি ভাগ ছিল।
