কিন্তু এ চুক্তি কেন করা হয়েছিল? মজার কথা হচ্ছে, কেউ চাক বা না চাক ১৯৭২ সাল থেকে ২৫ বছর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ১৮ মার্চ পর্যন্ত চুক্তি বহাল ছিল। চুক্তির বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমান থেকে বেগম জিয়া পর্যন্ত সকলেই কথা বলেছেন। ক্ষমতার বাইরে থাকতে সকলেই এ চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে কেউ এ চুক্তি বাতিল করেননি। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি খুব জোরেশোরে এ চুক্তি নবায়ন না করার ঘোষণা দিয়ে হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। কারণ সকলেরই জানা ছিল ১৯৯৭ সালের ১৮ মার্চ এ চুক্তির স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ চুক্তি নবায়নের কোনো অবকাশ নেই। চুক্তি নবায়ন না করার প্রতিশ্রুতি এক ধরনের শূন্য কুম্ভের ঢক্কা নিনাদের মতোই মনে হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ওই ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তিতে কী ছিল। কেন এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং কেনই বা আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ প্রতিটি দল এ চুক্তির বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিতে বাতিল করতে পারেনি। তাহলে কি সকলেই ভারতের ভয়ে ভীত ছিল। জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে বেগম জিয়া পর্যন্ত ফেস্ট এ চুক্তি বাতিল করলেন না কেন? আজও তাঁরা এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল প্রথম দিকে এ চুক্তিটি পড়বার। এ চুক্তিটি বাংলায় অনুবাদ হওয়ার পূর্বে আমার হাতে পড়েছিল। আমি লক্ষ করেছিলাম চুক্তিটি যেন ৭১-এর যুদ্ধের সময় ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের চুক্তির কার্বন কপি। ভারতের এককালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেএন দীক্ষিত বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগেই এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। জেএন দীক্ষিত ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, চুক্তি ভারত চাপিয়ে দেয়নি। বাংলাদেশের অনুরোধে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দীক্ষিতের এ মন্তব্য সম্পর্কে সরকারিভাবে আওয়ামী লীগ মহল থেকে কোনো উচ্চবাচ্চ্য করা হয়নি। তবে বলা হয়েছে, একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার এ ধরনের চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিল। কারণ তখনো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বন্ধুর সংখ্যা তেমন ছিল না। গণচীন এবং মুসলিম বিশ্ব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। চীনের ভেটোর ফলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ পায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় মেনে নিতে পারেনি। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব বিশেষ করে কিউবার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করেছে। এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী চুক্তি করার উদ্যোগ নেয়।
তবে একথা সত্য, আজকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একথা বলা হলেও বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির স্বপক্ষে আওয়ামী লীগ কোনোদিনই জোরালো যুক্তি দিতে পারেনি। তাদের এই অক্ষমতা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নিয়ে সংশয় ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। প্রতিপক্ষ প্রচার করেছে, সব কিছুই ভারত চাপিয়ে দিয়েছে। আমার মনে হয়েছে প্রথম থেকেই তকালীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিপক্ষের শক্তি খাটো করে দেখতে চেষ্টা করেছেন। কেউই বুঝতে চেষ্টা করেননি, ৭১ সালেও বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে মতানৈক্য ছিল। এক ভাই স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধ করেছে, আর এক ভাই রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা কম ছিল না। আর আমাদের এক শ্রেণির নেতা ব্যক্তিস্বার্থে প্রথম থেকেই এই রাজাকারদের আশ্রয় এবং প্রশ্রয় দিয়েছেন। ফলে প্রথম থেকেই ভারত বিরোধী প্রচারণা হালে পানি পেয়েছে। কেউই বুঝতে চাননি, সেকালের ভারত বিরোধী মুখ্যত স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধী ছিল এবং এ পরিস্থিতিতে বুঝবার অক্ষমতার জন্যে সেকালের একটি ঘটনা আজো স্বাধীনতার চেতনার দাবিদার একটি মহল গর্বভরে উচ্চারণ করে।
ঘটনাটি হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনীর প্রত্যাহার। একটি কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে এলে প্রথমে সবাই খুশি হলেও পরবর্তীকালে কী ঘটবে তা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। কারণ প্রথম থেকে আমার সন্দেহ ছিল, যুদ্ধের কারণে আমরা ভারতীয় অনুরাগী হলেও ঐতিহ্য এবং ১৯৪৭ সালের উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা ভারত বিরোধী। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ৭১ সাল পর্যন্ত ২৩ বছর আমাদের বোঝানো এবং শেখানো হয়েছে, আমাদের দুঃখ-কষ্ট এবং দারিদ্রের জন্যে দায়ী হিন্দুরা এবং হিন্দুস্তান অর্থাৎ ভারত।
ন’মাসের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের সে চিন্তা ও চেতনা মুছে ফেলতে পারার কথা নয়। ফলে ভারত এবং ভারতীয় বাহিনী তাদের আচরণে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলে আমরা রাতারাতি ভারত বিরোধী হয়ে যাই। ভারতীয় বাহিনী আমাদের মুক্তিদাতা বাহিনী না হয়ে দখলদার বাহিনী হয়ে যাবে এবং দেশের মানুষ এ বাহিনীকে সহ্য করবে না। দীর্ঘদিন ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে অবস্থান করলে স্বাধীনতার বিরোধীতা এ বাহিনীকে দখলদার বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পাবে এবং সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করবে।
আর কেউ বুঝতে না পারলেও এই অপ্রিয় সত্যটি প্রথমে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাই পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন থেকে ফেরার পথে নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধীর সামনে ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে অবস্থান সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে শেখ সাহেব বলেছিলেন, বাংলাদেশ চাইলেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ থেকে চলে যাবে।
