১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে আমি পাঁচবার ঢাকা শহরে ঢুকেছি। মাঝখানে প্রতিটি এলাকায় একই কথা শুনেছি। সকলেররই এক প্রশ্ন ‘ভারতীয় বাহিনী কবে আসবে? ইন্দিরা গান্ধী কবে সৈন্য পাঠাবেন। ইন্দিরা গান্ধী সৈন্য পাঠাচ্ছেন না কেন? তিনি কি আমাদের মেরে ফেলতে চান?
ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার এমএলএদের হোস্টেলে দেখা হয়েছিল আমাদের একজন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যের সঙ্গে। আমার ছাত্রলীগের বন্ধুর নাম আব্দুল আউয়াল। চাঁদপুরের কচুয়া থেকে পরিষদ সদস্য। আউয়াল জন্ডিসে ভুগছিল। আমাকে দেখে কেঁদে ফেলল। বলল, ‘নির্মল, শ্রীমতী গান্ধী আমাদের মেরে ফেলবেন। তিনি কি পাকিস্তান আক্রমণ করবেন না? আমি আউয়ালের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের কথা। মনে হয় সে প্রেক্ষাপটেই ত্রিপুরার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী সুখময় সেনগুপ্ত আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-ভারতীয় বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকলে বাঙালিরা ক্ষুব্ধ হবে না তো? কী প্রতিক্রিয়া হবে সে কথা কি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারেন?
আমি তার এ প্রশ্নের জবাব দিতে সময় নিয়েছিলাম। বলেছিলাম-এ মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয় বাহিনীকে বুকে টেনে নেবে। ভবিষ্যতে কী হবে তা আমি জানি না। তবে সেদিন যে প্রশ্নের আম জবাব দিতে পারিনি সে প্রশ্নের জবাব দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের মাটিতে পা ফেলেই বুঝতে পেরেছিলাম। আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল মাসের সংগ্রামে দীর্ঘদিনের ক্লেদ, সংশয় এবং ভয় দূর করা আদৌ সম্ভব নয়। ঢাকায় ফিরে যে কথাগুলো প্রথম শুনলাম তার মর্মার্থ হচ্ছে–চরম ভারত বিরোধিতা। কোনো কৃতজ্ঞতা নয়। কোনো মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়। সর্বত্রই শুধু লুটপাটের কাহিনী। একদিকে লুটপাটকারী মুক্তিবাহিনী। সে পরিপ্রেক্ষিতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ১৭ মার্চ। ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে আসেন। আর ২৬ মার্চ দেশের কলকারখানা রাষ্ট্রায়াত্ত করা হয়।
১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা সফরে আসেন। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ লোক তাঁকে সংবর্ধনা জানায়। ১৯ মার্চ ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদী বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি নিয়ে পরবর্তীকালে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বেই ভারত বিরোধী মানসিকতা দানা বাঁধতে থাকে। সর্বত্রই আলোচিত হতে থাকে, ১৯ মার্চের পূর্বেও জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ ভারত সরকারের সঙ্গে সাত দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। ২৫ বছরের চুক্তি তারই বর্ধিত রূপ।
জনাব অলি আহাদ তার ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৫’ নামক গ্রন্থের ৪৪০ পাতায় জনাব তাজউদ্দিনের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিবরণ দিয়েছেন। সে চুক্তি হচ্ছে নিম্নরূপ—
১. ভারতীয় সমরবিদদের তত্ত্বাবধানে আধা সামরিক বাহিনী গঠন করা হবে। গুরুত্বের দিক থেকে অস্ত্রশস্ত্র এবং সংখ্যায় বাংলাদেশের মূল সামরিক বাহিনী থেকে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
২. ভারত থেকে সমর উপকরণ ও অস্ত্রশস্ত্র কিনতে হবে। এ ব্যাপারে ভারতীয় সব বিশারদদের পরামর্শ নিতে হবে।
৩. ভারতের পরামর্শেই বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে।
৪. বাংলাদেশের বার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ভারতের পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
৫. বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অনুরূপ হতে হবে।
৬. ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিগুলো ভারতীয় সম্মতি ব্যতীত বাতিল করা যাবে না।
৭. ডিসেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের পূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ভারত যে কোনো সময় যে কোনো সংখ্যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে এবং বাধাদানকারী শক্তিকে চুরমার করে অগ্রসর হতে পারবে।
জনাব অলি আহমেদের পুস্তকে উল্লিখিত ৭ দফা চুক্তি সম্পর্কে প্রকাশ্যে তেমন কোনো বিতর্ক হয়নি। একটি মহল হতে প্রথম থেকেই এমন একটি চুক্তির কথা বলা হচ্ছিল। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্চ্য করেননি। অপরদিকে সেকালের বিরোধী দলগুলো এ চুক্তির কথা উল্লেখ করলেও প্রকাশ্যে লিখিতভাবে এ চুক্তির কথা কেউ বলেনি। তবে প্রচারণার ফলে একটি বিশ্বাস জন্মেছিল, এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও হতে পারে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী মহল এ চুক্তির প্রশ্নে সংশয় সৃষ্টির প্রয়াস পায়। বলা হতে থাকে, তাজউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এ সময় বাংলাদেশ সরকারের আর একটি ঘোষণা জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
পাকিস্তান আমলে ভারতের তুলনায় আমাদের মুদ্রার মূল্য বেশি ছিল। ৭১-এর যুদ্ধের সময় আমরা কলকাতায় ১০০ টাকা নিয়ে গেলে ১৩০ টাকা পেতাম। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দু’দেশের মুদ্রার মান সমান বলে ঘোষণা করা হয়। কোন প্রেক্ষিতে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছিল সাধারণ মানুষ তা জানতে চায়। অর্থনীতির সাধারণ নিয়মেই আমাদের মুদ্রার মান হ্রাস হওয়ায়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম। এ ঘটনা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। আর এ পটভূমিতেই ১৯ মার্চ ২৫ বছর মেয়াদী ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, ফলে জনমনে সংশয় এবং বিভ্রান্তি আরো গম্ভীর হয়।
