১৯৬৫ সালের ওইদিনগুলোতে আমাকেও বিশ্বাস করেনি। জাত-পাতের ভিত্তিতে আমাকে ভারতীয় চরই ভেবেছে। আমার সেই ছাত্ররা নির্বিয়ে আমাকে একথা বলেছে। আমি দুঃখ পাইনি। কারণ সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তানের এটাই উত্তরাধিকার। আমার একান্ত অনুগত ছাত্রটি হঠাৎ করে এ ধরনের চিন্তার অধিকারী হয়নি। সে তার পরিবারের সূত্রে এ চিন্তার অধিকারী হয়েছে। মানুষকে চিনেছে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে।
লক্ষণীয় যে, আজকে যারা ১৯৪৮ বা ১৯৫২ সালে স্বাধীনতা বাংলা গঠনের স্বপ্নের কথা বলেন, তাদের এ স্বপ্নের স্বাক্ষর কিন্তু সাহিত্যের পাতায় নেই। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে আমাদের আজকের বাঘা বাঘা কবি সাহিত্যিক এবং গল্পকাররা ১৯৬৫ সালের পূর্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়-এ লক্ষ্য নিয়ে কোনো সাহিত্য রচনা করেননি। আমাদের প্রথম সারির আজকের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে লেখকের মধ্যে অনেকেই সেদিন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। ১৪ আগস্ট উপলক্ষে রচনা লিখেছেন। আদমজী ও দাউদ পুরস্কার পাবার জন্যে আকাশ পাতাল তদ্বির করেছেন। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র সম্পর্কে পুস্তক রচনা করেছেন। কেউ আবার আইয়ুব খানের প্রভু নয় ভৃত্য’ এ বইয়ের অনুবাদ করে সরকারের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করেছেন।
অর্থাৎ খুব স্পষ্ট করে বলা যায়–আমাদের ষাটের দশকের সাহিত্যেও আমাদের স্বাধীনতার তেমন ছাপ নেই। এখানটায়ই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে ৭১-এর সংগ্রামের মৌলিক পার্থক্য। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একটি দীর্ঘ সাহিত্য ছিল। সে সাহিত্য প্রেরণা যুগিয়েছে। একটি বিরাট ভূমিকা পালন করেছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। সাহিত্যের এ ইতিহাসটি কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেই। অনেক হয়তো বলবে–১৯৫২ সালের পর থেকে আমাদের সাহিত্যের একটি অংশ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ভূমিকা আছে। আমাদের সাহিত্যে বাঙালি আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের একটি জোরালো দাবি আছে। আর আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে–সে সাহিত্যে স্বাধীনতার প্রশ্নটি আদৌ সোচ্চার ছিল না। সোচ্চার থাকলে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের নামে আমরা একটি আন্তর্জাতিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার সাহিত্য রচনা করতাম না।
তবে এ কথা ঠিক, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর একটি নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ যুদ্ধে প্রমাণিত হয় যে–পাকিস্তানের অঙ্গ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান অরক্ষিত। আমরা আক্রান্ত হলে আমাদেরই আক্রমণ প্রতিরোধ করতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেউ আমাদের বক্ষা করতে আসবে না এবং আমাদের রক্ষা করতে গেলে আমাদের নিজস্ব শক্তি থাকতে হবে। এ নিজস্ব শক্তির জন্যে চাই স্বাধীনতা। এ প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমাদের সামরিক বাহিনী এবং আমলাদের একটি অংশ আগরতলা ষড়যন্ত্র বলে কথিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন। অর্থাৎ আমি বলতে চাই যে-সাহিত্যে কবিতায় প্রবন্ধে জীবনাচরণে বা আকাঙ্ক্ষায় আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বা মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ফুটে ওঠে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর। তারপর মাত্র ছ’টি বছর। এ ছ’টি বছরে একটি জাতিকে একটি দেশের স্বাধীনতার জন্যে সামগ্রিকভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। এছাড়া এ প্রশ্নের কোনো সহজ প্রকাশ ছিল না। বাস্তব কারণে ছয় দফার নেতারা ছয় দফাঁকে স্বাধীনতার দলিল বলে ব্যাখ্যা করতে রাজি ছিলেন না। ছয় দফা সম্পর্কে আজকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে কথিত শিবিরেও বিভ্রান্তি এবং মতানৈক্য কম ছিল না। ছয় দফা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই ছ’দফার সম্প্রসারিত রূপ হয় এগারো দফা। একটি বিরাট সংগ্রামের প্রস্তুতি না নিয়েই ছয় দফা ও এগারো দফাঁকে সামনে নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। প্রতিপক্ষ পাকিস্তান সরকার বারবারই বলেছে–ছ’দফা বিচ্ছিন্নতার দলিল। এরা দেশদ্রোহী। এরা পাকিস্তান ভাঙতে চায়। এরা বাংলাদেশ স্বাধীন করতে চায়। অপরদিকে, একমাত্র ছাত্রলীগের একটি অংশ এবং বিচ্ছিন্নভাবে কতিপয় বামপন্থী গ্রুপ অবিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলতে থাকে।
কিন্তু তাও প্রকাশ্যে নয়। এরপরে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পর পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে সংশয় আরো গভীর করে তোলে। সাধারণ গ্রাম-গ্রামান্তরের মানুষের কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই একটি ভয়াবহ সংঘর্ষের দিকে দেশ এগিয়ে যায়। এ বিভ্রান্তি এবং সংশয়ের জন্যেই ৭১-এর সংগ্রামের নাম স্বাধীনতা যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, হিড়িকের বছর বা গণ্ডগোলের বছর। কোনো কারণ না থাকলে কোনো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন নাম বিভ্রাট হয় না।
এ বিভ্রান্তির কারণ খুঁজতে গিয়ে ৭১ এবং ৭২ এ দু’টি পরস্পরবিরোধী চিত্র আমাদের পীড়িত করেছে। ভয় পেয়েছি স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে। আমি লক্ষ্য করেছি কেউ সঠিকভাবে সব কিছু বুঝে-শুনে এ যুদ্ধ সমর্থন করছে না। তাদের সমর্থন সাময়িক, স্বতঃস্ফূর্ত এবং আবেগের। অপরপক্ষে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি অত্যন্ত সচেতন, ঐক্যবদ্ধ এবং তাদের এ অবিচল শক্তি থেকে তারা খুব সচেতনভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে। অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দেখেছি অসম্ভব বিভ্রান্তি।
