আমার বক্তৃতা পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে ডেকে পাঠালেন। দীর্ঘক্ষণ তাঁর সাথে আলাপ হলো। শুধু বলতে পারি যে গভীর মনোযোগ দিয়ে তিনি আমার কথা শুনছিলেন।
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, এই একটি মানুষের আমলেই লিখে বা কথা বলে সাড়া পাওয়া যেত। পত্রিকায় প্রকাশিত আমাদের লেখা বা বক্তব্য মনে হয় তিনি খুটে খুটে পড়তেন। আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে আমার প্রতিটি লেখা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিল। সে লেখার ভিত্তিতে নির্দেশ গিয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। একথা ঠিক, তাঁর আমলে শেষের দিকে তিনিই নির্দেশ দিয়ে আমার লেখা বন্ধ করেছিলেন। তবুও বলব তাঁর আমলে লেখায় সুখ ছিল। লিখলে ফল হতো। তারপর অনেকেই ক্ষমতায় এসেছেন। আজকেও ক্ষমতায় আছেন। আমার মনে হয় কেউ যেন আর আমাদের লেখা বিশ্বাস করতে চান না। একটা অবিশ্বাস নিয়ে আমাদের লেখা পড়তে শুরু করেন অথবা আদৌ পড়েন না। তাই আজ লক্ষ করা যায় সাংবাদিকদের লেখার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করে সাংবাদিকদের বক্তব্য সঠিক নয় বলে প্রমাণ করার চেষ্টাও এখন মুখ্য।
তবে আমি বলব না, সাংবাদিক মাত্রেই সং বা সত্যনিষ্ঠ। আমি বলব না সকল খবরই সত্য বা তথ্যভিত্তিক। সমাজের আর পাঁচটি পেশার মতো আমাদের পেশায়ও দুর্নীতি ঢুকেছে। আমরা নিশ্চয় নির্জন দ্বীপের বাসিন্দা নই। কিন্তু আমাদের লেখা অসত্য বা শুধুমাত্র মিথ্যাচার বলে উড়িয়ে দিলে কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না। আমার জীবনে ওই একটি মানুষের কালেই একটি ভরসা অন্তত ছিল যে কোনো কিছু লিখলে তা তাঁর চোখে পড়বে। তিনি পড়বেন এবং এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত দেবেন। আমার এ ধারণার একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট আছে। সে প্রেক্ষাপটের কথা পরে বলব।
১৯৭২ সালে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ–এ তিন মাসেই যেন সমস্ত পরস্থিতি আমার কাছে ঘোলাটে হয়ে উঠল। নিজের মনে প্রশ্ন দেখা দিল–এ কোন স্বাধীনতা। সেকালের কতগুলো তারিখ আজো আমার মনে জ্বলজ্বল করছে। সে তারিখ হচ্ছে–৮ জানুয়ারি, ১০ জানুয়ারি, ১২ জানুয়ারি, ১৭ মার্চ, ১৯ মার্চ ও ২৬ মার্চ।
৮ জানুয়ারি বেতারে শুনলাম–পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিয়েছেন। সে দিন ঢাকার আকাশে বাতাসে রাজপথে এক অকৃত্রিম উল্লাস দেখলাম। রাজধানী ঢাকা এসএলআর, স্টেনগান এবং বন্দুকের গুলিতে কাঁপছে। গুলিতে গুলিতে আকাশ প্রকম্পিত হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। ১০ জানুয়ারি শেখ সাহেব ঢাকায় পৌঁছালেন। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ঢাকা রেসকোর্স (আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে পৌঁছাতে তার সময় লেগেছিল দু’ঘণ্টার বেশি। সেদিন বোকার মতো ভেবেছিলাম উচ্ছ্বাসের এ অভিব্যক্তি ৯ মাস যুদ্ধকালের অনেক বিভ্রান্তির অবসান ঘটাবে। বিভ্রান্তি সরকারি দল এবং ভারতকে নিয়ে।
১২ জানুয়ারি শেখ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হলেন। তাজউদ্দিন আহমেদ সরে গেলেন। প্রেসিডেন্ট হলেন আবু সাঈদ চৌধুরী। সকলেই ভাবল এটা অনিবার্য ছিল। ঠুটো জগন্নাথ প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় থাকার লোক শেখ মুজিবুর রহমান নন। সে ক্ষেত্রে সংঘর্ষ অনিবার্য। এ সংঘর্ষ এড়াতেই নাকি তাজউদ্দিন আহমেদ সরে গিয়েছিলেন। আবার অনেকের কথা হচ্ছে-তাজউদ্দিন আহমদের প্রধানমন্ত্রী থাকার কোনো উপায় ছিল না। অপর একটি মহলের মতে, শেখ সাহেব জাতির পিতা হিসেবে প্রেসিডেন্ট থাকলে ভালো করতেন। তিনি সবাইকে শাসন করতে পারতেন। কিন্তু নিজে শাসনকর্তা হয়ে অন্যকে শাসন করা যায় না। তাতে সংশয় এবং ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়।
আর আমার মনে হলো ভিন্ন কথা। কথাটি হচ্ছে বাংলাদেশের চলার পথ সংকটপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। আমাদের সংগ্রাম পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র সাধারণভাবে সমর্থন করেনি। আমাদের চাওয়া-পাওয়া এবং আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের জন্যে পৃথিবীর কোনো সরকারই আমাদের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির মুক্তি আন্দোলনে নির্ভেজাল সাহায্য দেয়নি। দেয়ার কথাও নয়। সব দলের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ থাকে।
আর কিছুদিন যেতেই আমার মনে হলো স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের সমাজ জীবনে বিভাজন বড় গভীর। আমাদের স্বাধীনতা চাওয়া সকলের কাছে নির্ভেজাল ছিল না। তেইশ বছর আমরা পাকিস্তানে ছিলাম। পাকিস্তানের দু’অংশের মধ্যে হাজার মাইল ব্যবধান থাকলেও একটি সংযোগসূত্রও ছিল। তেইশ বছরের জীবনে ব্যবসা-বাণিজ্য আত্মীয় এবং চাকরির সুবাদে অনেক নৈকট্য গড়ে উঠেছিল। সে নৈকট্য বিশেষ করে ছিল উপরের মহলে। আমরা বঞ্চিত বলে আমাদের ক্ষোভ ছিল। আমাদের মতোই বঞ্চিত ছিল সীমান্ত প্রদেশ সিন্ধু এবং বেলুচিস্তানের লোক। আমরা বামপন্থীরা একথাগুলো সামনে এনেছি। আমরা কখনো বলিনি–পাকিস্তানের কোনো একটি অঙ্গ স্বাধীন হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। আমার অভিজ্ঞতা বলে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পর্যন্ত আমরা বড্ড বেশি পাকিস্তানি ছিলাম। এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমাদের শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন। সাহিত্যিকরা গল্প লিখেছেন। কবিরা কবিতা লিখেছেন। প্রতিদিন রচিত নতুন নতুন গান বেতারে পরিবেশিত হয়েছে। আমি নিজে অনুভব করেছি আমার অকৃত্রিম অনুগত ছাত্রটি পর্যন্ত
