৭১-এর সংগ্রামে পূর্বে আর একটি আকস্মিক ঘটনা ঘটে। একটি মহল থেকে সিদ্ধান্ত করা হয় যে হোটেল শাহবাগকে হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হবে। নাম হবে পোস্টগ্রাজুয়েট হাসপাতাল অর্থাৎ পিজি হাসপাতাল। হোটেল শাহবাগে শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। এ সময় ‘৭১-এর সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়। সাময়িককালের জন্যে হলেও হোটেল শ্রমিকদের আন্দোলন স্তিমিত হয়। তৎকালীন পিজি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছিল জেনারেল টিক্কা খানের একান্ত বংশধর। আমাদের শ্রমিক নেতাদের কাছে গেলে তাদের জানানো হয় যে তোমরা প্রয়োজনে তোমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বা মাতা শ্রীমতি গান্ধীর কাছে যেতে পার। আমাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না। হোটেল শাহবাগ হাসপাতালে পরিণত হবেই। এ পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু লক্ষণীয় যে পিজি হাসপাতালের কর্মকর্তারা যেমন ছিলেন তেমনই থাকেন। তাঁরা পোশাক বদলে একেবারে বাঙালি হয়ে যান একটি কৌশল অবলম্বন করে। বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মেডিকেল চেকআপের নামে হাসপাতালে ভর্তি করান। তকালে চার খলিফা নামে পরিচিত আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কুদুস মাখনও মেডিকেল চেকআপের নামে পিজি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং তারা সবাই শাহবাগ হোটেলকে পিজি হাসপাতালে পরিণত করার পক্ষে বিবৃতি দিতে থাকেন। এ পরিস্থিতিতে হোটেল শ্রমিকরা মিছিলের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই মিছিল পিজি হাসপাতাল ও আজকের শেরাটন হোটেলের মাঝামাঝি পৌঁছলে শেরাটন হোটেল থেকে মিছিলে গুলি করা হয়। গুলিতে আহতদের সংখ্যা জানা গেলেও নিহতদের সংখ্যা কোনোদিন জানা যায়নি। তৎকালে নতুন প্রকাশিত দৈনিক গণবাংলায় বিস্তারিতভাবে হতাহতদের সংবাদ পরিবেশন করা হয়। মিছিলে গুলিবর্ষণ আমাদের হতচকিত করে দেয় এবং একই সময় অপর একটি ঘটনা ঘটে।
আমাদের সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন আদমজীর শ্রমিক নেতা মাওলানা সাইদুর রহমান। ঢাকায় শ্রমিক দফতরে যাওয়া পথে তাকে কিডন্যাপ করে আওয়ামী লীগ অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে বাধ্য করা হয় সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন থেকে পদত্যাগ করতে। তিনি সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন থেকে পদত্যাগ করলে সাথে সাথে শ্রমিক লীগ সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। ওই সাথে শ্রমিক লীগের সভাপতি নোয়াখালীর নূরুল হক সাহেবও পদত্যাগ করেন।
আমাদের তখন ছিল অবাক হওয়ার পালা। দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা গণতান্ত্রিক অধিকারই ফিরে পাব। সকলের আকাক্ষা দেশে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে। কিন্তু তার পরিবর্তে আমাদের সভাপতি কিডন্যাপ হয়ে গেল। পরবর্তীকালে একের পর এক আমাদের ইউনিয়নগুলো হাইজ্যাক করা হতে লাগল। এক সময় নরসিংদী, কাঞ্চন, ঘোড়াশাল, মুড়াপাড়া, আদমজী, মদনগঞ্জ এলাকার সকল চটকলের শ্রমিক ইউনিয়ন আমাদের দখলে ছিল। কিন্তু একের পর এক সবই হাতছাড়া হতে থাকল। শ্রমিক ইউনিয়ন করা দুঃসাধ্য হয়ে গেল।
এমন সময় আঘাত আসল ভিন্নদিক থেকে। আমাদের নেতা রুহুল আমিন কায়সার এবং সিদ্দিকুর রহমান রায়েরবাজার এলাকায় থাকতেন। ওই এলাকার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় আমাদের ইউনিয়ন ছিল। আমাদের ইউনিয়ন ছিল একটি ওষুধ শিল্প কারখানায়। এ কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে আমাদের বিরোধ চলছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকে। মনে হলো মালিক দীর্ঘদিন থেকে আমাদের ঘায়েল করার পাঁয়তারা করছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তীকালে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী সন্ধ্যা রাতে রুহুল আমিন কায়সারের বাড়িতে হামলা চালাল। তিনি বাসায় ছিলেন না। তাকে বাসায় না পেয়ে তাঁর কমরেড সিদ্দিকুর রহমানের বাসায় যান এবং তাকে গুলিবিদ্ধ করেন। অনেক কষ্টে সিদ্দিকুর রহমান বেঁচে যান। এখনো সেই সন্ত্রাসীর গুলি তাঁর শরীরে। সেদিন আমরা কোনো থানারই সহযোগিতা পাইনি।
দলের এ অবস্থায় সাংবাদিক ইউনিয়ন নিয়ে আমার সাথেও সরকারের বিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ সময় শেখ সাহেব কলকাতায় গিয়েছিলেন কলকাতায় তাকে বিরাট সংবর্ধনা দেয়া হয়। কলকাতার জনসভার ভাষণে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ঘোষণা করেন। এ চারনীতি হচ্ছে-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। তার এ ঘোষণার পূর্বে দেশবাসী তিনটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতির কথাই জানত। সে তিনটি মূলনীতি ছিল গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। শেখ সাহেবের এ ঘোষণার পর আমি এক জনসভায় ভিন্ন মন্তব্য করি। আমার বক্তব্য ছিল–ভাঙা বাংলার কোনো জাতীয়তাবাদ হয় না। জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হলে তার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। উপমহাদেশে কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় বাঙালি জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সুতরাং বাঙালি জাতীয়তাবাদ এদের বাদ দিয়ে হতে পারে না। তবে কথাবার্তা, আচার আচরণ, সভ্যতা সংস্কৃতিতে এবং উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা বাঙালি। সে প্রশ্নে দ্বিমতের অবকাশ নেই। তাই জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি খুব সতর্কভাবেই বিবেচনা করতে হবে। নইলে ষড়যন্ত্রকারীরা এদের খতম করতে পারে।
