মুজিববাহিনীর ভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে জেনারেল উবান তার স্মৃতিচারণে বলেছেন-শেখ ফজলুল হক মনি তার কাছে অভিযোগ করেছেন, তাজউদ্দিনের ইচ্ছা হচ্ছে ক্ষমতায় থেকে যাওয়া এবং একটি বামপন্থী বাহিনী গঠন করা। এমনকি শেখ ফজলুল হক মনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের চতুরে জেনারেল উবানকে মাথায় কালো কাপড় বাঁধা সশস্ত্র কমিউনিস্ট যুবকদের দেখান।
জেনারেল উবানের স্মৃতিচারণের এক জায়গায় বলা হয়, অস্ত্র সমর্পণের ব্যাপারে শ্রী ডিপি ধর এবং শেখ মনির মধ্যকার এক তপ্ত বাদানুবাদের সাক্ষী হই। মনি শ্ৰী ধরকে বলেন, তারা অস্ত্র সমর্পণ করবেন না। প্রয়োজনে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হবেন। মনির সাহস ছিল প্রশংসনীয়। শ্রী ধর দৃশ্যত বিচলিত হলেন। মনি আমাকে পরে বলেন, তার আগেকার পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করেছে, শ্রী ধর তার দেশের চরম শত্রু। এটা পরবর্তীকালে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর প্রতিক্রিয়া ফেলে। শেখ মুজিব ক্ষমতা দখলের পর তাঁর সরকারের কাছে ডিপি ধর অবাঞ্ছিত ব্যক্তিতে পরিণত হন।
জেনারেল উবানের এই তথ্য কতদূর সত্য সে কথা মুজিববাহিনীর নেতারাই বলতে পারেন। তবে সবকিছুর পরেও প্রশ্ন থেকে যায় এই জেনারেল উবান কে? তাঁর স্মৃতিচারণে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনিই মুজিব বাহিনীর স্রষ্টা। সবকিছুই তাঁর একক কৃতিত্ব। সকলের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি চার যুবনেতার পরামর্শে মুজিববাহিনী গঠন করলেন কোন সাহসে? তিনি লিখেছেন তাজউদ্দীন ও কর্নেল ওসমানী এই বাহিনী গঠনের বিরুদ্ধে ছিলেন। জেনারেল মানেকশ, অরোরা এই বাহিনী গঠনের চরম বিরোধিতা করেছেন। তারপরেও জেনরেল উবান ওই বাহিনী গঠন করলেন কীভাবে! তার পেছনে কারা ছিল? তাহলে কি সেকালের ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সমান্তরাল দুটি স্রোত বা দুটি কেন্দ্র ছিল? নইলে একই যুদ্ধে দুই নেতৃত্ব এবং দুই কেন্দ্র সৃষ্টি হলো কীভাবে? জানি না জেনারেল উবানের বইতে এর কোনো ব্যাখ্যা আছে কিনা। কারণ পুরো বইটা আমার পড়া হয়নি।
আমি আগেও লিখেছি, কলকাতায় থাকতে মুজিব বাহিনীর কথা শুনেছি। তাদের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আর মুজিব বাহিনী গঠনের পর প্রমাণ হয়েছে, ৭১-র সংগ্রামে আদৌ কোনো সাংগঠনিক বা মানসিক প্রস্তুতি কোনো মহলের ছিল না। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সকলের একই ধারণা। লজ্জাজনকভাবে তাই সঠিক নেতৃত্ব দেয়ার দাবিদার চার যুব নেতাকে ভারতে এক জেনারেলের কাছে গিয়ে হাত পাততে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যে একটি বাহিনী গঠনের। অথচ উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং প্রস্তুতি থাকলে বিদেশে গিয়ে উচ্চবৃত্তি করতে হতো না। দেশের স্বাধীনতা নয়, কমিউনিস্ট দমনের জন্যে এ ধরনের ন্যক্কারজনক উদ্যোগ নিতে হতো না। তাহলে কি এ সংগ্রাম ছিল কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধেও। মুজিববাহিনীর জীবিত নেতারা এ প্রশ্নের জবাব দিলে খুশি হব।
তবে ১৯৭২ সালে বিস্তারিতভাবে অনেক কথাই জানতাম না। হঠাৎ একদিন রাজপথে ছাত্রলীগের মিছিলের একটি শ্লোগান শুনলাম। শ্লোগানটি হলো-বিশ্বে এল নতুন বাদ, মুজিববাদ মুজিববাদ এবং প্রথম আঘাত আমাদের ওপরই এল। বই খুঁজতে থাকলাম এ বাদ-এর আদিপর্ব জানার জন্যে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের সাথে আমাদের অর্থাৎ শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের বিরোধ অনিবার্য হয়ে উঠল। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এককভাবে বিশেষ করে চটকল এলাকায় আমাদের আধিপত্য ছিল। আমাদের সংগঠিত সংগঠন ছিল পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন। ফেডারেশনের নেতৃত্বে ১৯৬৪ সালে সামরিক শাসনামলে পরপর তিনবার চটকল শ্রমিকেরা ধর্মঘট করে। আমাদের সাফল্য অন্যান্য শিল্প এলাকায় আমাদের সংগঠনের বিস্তার ঘটায়। ঢাকা শহরের সমস্ত হোটেল শ্রমিক মোটামুটিভাবে আমাদের নেতৃত্বে আন্দোলন করত। এ পরিস্থিতি অনিবার্য কারণে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছে সহনীয় ছিল না। আমাদের দল শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল তখন গঠিত হয়নি। আমরা অর্থাৎ বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল অর্থাৎ আরএসপি মনে করতাম-লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিনের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ভুল পথ অনুসরণ করছে। কমিউনিস্ট পার্টির বিকল্প হিসেবেই আরএসপি গঠিত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর অকিাংশ আরএসপি কর্মী ও নেতা দেশান্তরী হয়। যারা পাকিস্তানে ছিলেন তাদেরও নির্যাতনের মুখে প্রকাশ্যে কাজ করা সম্ভব ছিল না। ষাটের দশকে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রমিক এলাকায় কাজ শুরু করে এবং গঠন করে পূর্ব পাকিস্তান চটকল শ্রমিক ফেডারেশন।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। কিন্তু তখনো আওয়ামী লীগের কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না। আওয়ামী লীগের একটি অংশ (যারা পরবর্তীকালে জাসদ গঠন করে। তারা আমাদের সংগঠন দখলের প্রয়াস পায়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের তরফ থেকে শিল্প এলাকায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রস্তাব দেয়া হয়। আমরা প্রত্যাখ্যান করি এবং সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন নামে একটি নতুন শ্রমিক সংগঠন গঠন করি। অপরদিকে আওয়ামী লীগ গঠন করে জাতীয় শ্রমিক লীগ। আমাদের কিছু কিছু নেতা শ্রমিক লীগে চলে যায়। এ ঘটনা ঘটে ছ’দফা ভিত্তিক আন্দোলন শুরু হওয়ার পর। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে ১৯৭১ সালের সংগ্রামের পূর্ব পর্যন্ত।
