১৯৭২ সালে এত কথা ভাবিনি। দুঃখ পেয়েছি জহির নিখোঁজ হওয়ায়। বেশি কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিছুদিন পরে আমিই বিব্রত হয়ে গেলাম। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম গুলি হলো আমাদের সংগঠন হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের মিছিলে।
মুজিব বাহিনী নিয়ে এ বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখিতে আমি আবেদন জানিয়েছিলাম যে মুজিববাহিনী সম্পর্কে যারা জানেন তাদের মুখ খোলা উচিত। কারণ তাদের সম্পর্কে নানা কথা বলা হচ্ছে। আমার এক লেখায় এই দাবিরই পুনরুক্তি করেছিলাম। তবে মুজিববাহিনীর জীবিত নেতাদের মধ্যে কেউই এ প্রসঙ্গে কথা বলেননি। কথা বলেছেন মুজিব বাহিনীর স্রষ্টা, ভারতের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এসএস উবান। তিনি একটি স্মৃতিচারণমূলক বই লিখেছেন। বইয়ের নাম ‘ফ্যাক্টস অব বাংলাদেশ’–‘দি ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ’। ক’দিন আগে ঢাকার একটি দৈনিকে এই বইয়ে মুজিববাহিনী সংক্রান্ত অধ্যায়টির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এই বইয়ে মুজিববাহিনী গঠন প্রক্রিয়া ও রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। এই বিবরণে সেকালের চারজন যুব নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই চারজন তরুণ নেতা হচ্ছেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ এবং আব্দুর রাজ্জাক। জেনারেল উবান বলেছেন, চার নেতা এসে তার কাছে একটি সমস্যা তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে–মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিতে বিভিন্ন ধরনের যুবক আসছে। এর মধ্যে দুষ্কৃতকারীরা আছে, তেমন ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মীরাও আছে। চার নেতার মতে, এদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্ত্র হাতে দিলে এসব অস্ত্র পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না বরং স্বাধীনতার পর নকশাল আন্দোলনের অনুরূপ কিছু করার জন্যে বাংলাদেশে লুকিয়ে রাখা হবে। তারা আরো অভিযোগ করেন, মুক্তিবাহিনীতে কর্মরত বাংলাদেশের কিছু সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্কিত চীনাপন্থী কমিউনিস্ট নেতাদের নাম তারা উল্লেখ করেন। এই নেতাদের মতে, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের, অনুমোদনক্রমে বিপুল সংখ্যক কমিউনিস্ট ক্যাডারকে রিক্রুট করে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অন্ত্র সজ্জায় সজ্জিত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে অভিযোগ করেও ফলাফল কিছুই হয়নি বলে যুবকরা জানান। এই তরুণ নেতাদের মতে, এ কারণেই একটি নতুন বাহিনীর গঠন প্রয়োজন। যে বাহিনী এ সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে। জেনারেল উবানের মতে, এই নেতারা ছিল সাহসী, বিচক্ষণ, দেশপ্রেমিক এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন। এ নেতারা আরো অভিযোগ করেছিলেন, ভারতের অভিজাত হোটেলে ভারতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নকশালপন্থী নেতাদের গল্প-গুজব করতে দেখা যায়। যুব নেতাদের মতে, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসন আমলে এরাই ছিল তাদের নিকৃষ্টতম শত্রু। তাদের সন্দেহ বাংলাদেশে শক্ত ভিত্তির ওপর একটি কমিউনিস্ট পার্টি দাঁড় করানোই ভারত সরকারের উদ্দেশ্য। তারা এ খবরও পেয়েছে, মওলানা ভাসানীর অনুসারীদের আলাদা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়া হচ্ছে। নেতাদের মতে, বাংলাদেশে সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্টদের উত্থান তারা মানতে পারে। কিন্তু চীনাপন্থী কমিউনিস্টরা কেন!
জেনারেল উবানের ভাষায়, এই নেতারা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের চরম বিরোধী। তারা তাজউদ্দীনকে সহ্য করতে পারত না। তাদের অভিযোগ তাজউদ্দীন আহমেদ মিথ্যাচার করে ক্ষমতায় বসেছেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হবার কথা ছিল না। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল নজরুল ইসলামের। ভারতের বিভিন্ন মহলে এ খবর কারো অজানা ছিল না। কিন্তু ভারত সরকার ওই সময় তাজউদ্দীনকে পরিবর্তন করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তারা মনে করত, এ ধরনের কোনো মতানৈক্য মুক্তিযুদ্ধে ফাটল ধরাবে। পাকিস্তান তার সুযোগ নেবে। আর এ পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের এ তরুণ নেতাদের পক্ষ থেকে একটি নতুন বাহিনী গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এ তরুণদের দাবি হচ্ছে এ বাহিনী হবে একান্তই স্বতন্ত্র, স্বাধীন এবং মুক্তিবাহিনীর বাইরে। এদের কর্মকাণ্ড বা গতিবিধি মুক্তিবাহিনী জানতে পারবে না।
কিন্তু এ ধরনের বাহিনী গঠনে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আদৌ একমত ছিলেন না। একমত ছিলেন না ভারতের সেনাপ্রধান মানেকশ। এ প্রস্তাবের চরম বিরোধিতা করেছেন জেনারেল আরোরা। তিনি ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার এবং ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর প্রধান। সেনা কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছিল যুদ্ধে দুই বাহিনী হতে পারে না। যে কোনো বাহিনী হোক না কেন সকল বাহিনীকেই একই কমান্ডের অধীনে থাকতে হবে। একই যুদ্ধে দুই কমান্ড থাকতে পারে না।
কিন্তু যুব নেতারা অনড়। শুধুমাত্র ভিন্নবাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে নয়, এ বাহিনীর নামকরণ সম্পর্কেও তাদের সুনির্দিষ্ট মতামত ছিল। সকল মহলের প্রতিবাদ সত্তেও তারা মুজিববাহিনী নামে একটি বাহিনী গঠনের প্রস্তাব দেন। এ বাহিনীর নামের ব্যাপারে জেনারেল উবানও আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু যুব নেতাদের বক্তব্য ছিল কারো কথায় কিছু আসে যায় না। এ বাহিনীর নাম মুজিববাহিনীই হবে এবং শেষ পর্যন্ত ৭১-এর যুদ্ধে মুজিববাহিনী একটি ভিন্ন বাহিনী হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
