চাকরিতে অপসন দিয়ে লাখ লাখ হিন্দু যেমন সেকালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে গিয়েছিল তেমনি লাখ লাখ মুসলমান ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিল। অপসন দিয়ে যারা পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন তাদের বলা হতো মোহাজের। মোহাজেররা অধিকাংশ অবাঙালি। তকালীন পাকিস্তানে তাদের কোনো সহায় সম্পত্তি বা আত্মীয়-স্বজন ছিল না। তাদের দাঁড়াবার জায়গা ছিল না। ফলে তাদের জন্যে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হয়। সৈয়দপুর, খালিশপুর, পার্বতীপুর, পাকশী, খুলনা, যশোর এবং ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুরে এদের জন্যে মোহাজের কলোনি নির্মিত হয়। স্বাভাবিক কারণে এ কলোনির অবাঙালি অধিবাসীরা একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধিতা করেছে। নির্বিচারে মুক্তিযোদ্ধাদের খুন করেছে। লুটপাট করেছে এদের সম্পদ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত ওরাই ছিল ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী।
আমার নিজের ধারণায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করাই এদের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। এরা দেশ ভাগের পর বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তানে এসেছিল। দেশ ভাগ না হলে তাদের ভিটে-মাটি ছাড়তে হতো না। পাকিস্তান তাদের অস্তিত্ব। পাকিস্তান না থাকলে তাদের অস্তিত্ব থাকে না। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৪ বছর বাঙালিরাও তাদের এক করে নিতে পারিনি। শুধুমাত্র ধর্মই যে সব কিছু নির্ধারণ করে না–প্রতি পদে পদে তা প্রমাণিত হয়েছে পাকিস্তানের ২৪ বছরে। তারই বিস্ফোরণ হয়েছিল ১৯৭১ সালে। কিন্তু অবাঙালিরা যাবে কোথায়? পাকিস্তান না থাকলে তাদের পূর্বপুরুষের ভূমি ভারতে ফিরে যেতে হয়। কিন্তু ভারতে ফিরে যাওয়া অনিবার্য কারণে সম্ভব নয়। তাহলে তাদের যেতে হয় পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে। কিন্তু সেখানেও তাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে তারা অনাহুত। তাই পাকিস্তান থাকলে তাদের অস্তিত্ব বহাল থাকে। এ চিন্তা থেকেই সেদিন তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পরের চিত্র হচ্ছে এখনো হাজার হাজার মোহাজের বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা পাকিস্তানে যেতে চায়। অথচ পাকিস্তান তাদের নিচ্ছে না। পাকিস্তানের করাচি শহরে প্রতিদিন মোহাজেরদের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের দাঙ্গা-হাঙ্গামা হচ্ছে। কারো জীবনে কোনো নিশ্চয়তা নেই। বেশ কয়েক বছর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফ ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের অর্থাৎ মোহাজেরদের পাকিস্তানে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সে প্রতিশ্রুতি আদৌ পালিত হবে কি না তাও নিশ্চিত নয়।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মধ্যে একটি মিনি পাকিস্তান ছিল বিশেষ করে মিরপুরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পরেও মিরপুরে কেউ ঢুকতে পারছিল না। মোহাজেররা নাকি তখনও সশস্ত্র প্রতিরোধ করেছিল। আর এ পরিস্থিতিতেই নাকি কে বা কারা জহির রায়হানকে সেখানে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। ফোনে নাকি বলা হয়েছিল-মিরপুরে গেলে শহীদুল্লাহ কায়সারের খবর পাওয়া যাবে। সে ফোন পেয়ে জহির রায়হান মিরপুর ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আর ফিরে এলেন না।
পরবর্তীকালে জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। একটি তদন্ত কমিটি নাকি একটি রিপোর্ট পেশ করেছিল। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রয়াত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবীর। জহির রায়হানের নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে আমরা অনেকেই লেখালেখি করেছি। সভা-সমাবেশ করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো রিপোর্ট পাওয়ার কথা অস্বীকার করা হয়েছে।
তবে স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও একটি প্রশ্নের জবাব আমি পাইনি। প্রশ্নটি হচ্ছে-জহির রায়হানের ব্যাপারে বিভিন্ন মহলের নিস্পৃহ আচরণ। একটি মানুষ যে এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। কেউ যেন তার খোঁজ রাখল না। আমরা ঘাতক দালাল নির্মূলের কথা বলি, গণআদালত করে গোলাম আযমের ফাঁসি দাবি করি। অথচ জহির রায়হানের নামটি চলচ্চিত্র জগৎ ছাড়া আর কোথাও উচ্চারিত হয় না। কেন হয় না, সে প্রশ্নের জবাব দেয়ার মতো কেউ এদেশে নেই।
৭. জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া
সাম্প্রতিককালে জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে নতুন তথ্য শোনা গেছে। বলা হয়েছে–পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল–বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থী শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানত তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মূহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে। তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে। তাহলে কোনটি সত্য? জহির রায়হানকে কারা গুম করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা, আল বদর, আলশামস, না রাজাকার? নাকি মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ? স্পষ্ট করে বললে বলা যায়–মুক্তিবাহিনীর এ অংশটি মুজিববাহিনী। ১৯৭১ সালে প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের অজান্তে গড়ে ওঠা মুজিববাহিনী সম্পর্কে অনেক পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে। বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হয়েছে, এ বাহিনী গড়ে উঠেছিল ভারতের সামরিক বাহিনীর জেনারেল ওবান-এর নেতৃত্বে। এ বাহিনী নাকি মিজোরামে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিজোদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এদের নাকি দায়িত্ব ছিল-রাজাকার, শান্তি কমিটিসহ বাংলাদেশের সকল বামপন্থীদের নিঃশেষ করে ফেলা। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে এ কথাগুলো বারবার লেখা হচ্ছে। কোনো মহল থেকেই এ বক্তব্যের প্রতিবাদ আসেনি। অথচ দেশে মুজিববাহিনীর অনেক নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আছেন। তারা কোনো ব্যাপারেই উচ্চবাচ্য করছেন না। তাদের নীরবতা তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বক্তব্যই প্রতিষ্ঠিত করছে এবং সর্বশেষ জহির রায়হানের নিখোঁজ হবার ব্যাপারেও মুজিব বাহিনীকেই দায়ী করা হচ্ছে।
