সেই জহির অর্থাৎ জহির রায়হান ৭১-এর যুদ্ধের সময় কলকাতায় গিয়েছিলেন। তাঁর পেশা ছাড়েননি। স্টপ জেনোসাইড ছবি করেছিলেন। আমার প্রশ্নের কঠিন জবাব দিয়েছিলেন অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতিত জনতার চিত্র ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জহির কোলকাতায় গেলেও শহীদুল্লাহ কায়সার ঢাকা ছাড়লেন না। কেন ছাড়লেন না আমি জানি না। ৭১ সালে আমি বারবার ঢাকা এসেছি। সকলের পরিবারের খবর নিয়েছি। শুনেছি শহীদুল্লাহ সাহেব ভালো আছেন। সর্বশেষ শুনেছি যুদ্ধের শেষ পর্বে আল বদরের হাতে খুন হয়েছেন শহীদুল্লাহ কায়সার। সেই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়েছিলেন জহির রায়হান। কে নাকি ফোন করে জানিয়েছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সাকে মিরপুরে খুঁজে পাওয়া যাবে। পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিলেন জহির রায়হান। মিরপুর থেকে জহির রায়হান আর ফেরেননি।
কেন এমন হলো? কেন এমন হয়? সে প্রশ্ন তখন আমি ভাবতে চেষ্টা করিনি। হাতে কলম ছাড়া কিছু ছিল না। নিজেকে দারুণ অসহায় মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এ কোন স্বাধীনতা, কাদের স্বাধীনতা। কারা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কলকাঠি নাড়াচ্ছে। জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে সভা, সমিতি, মিছিল, কমিটি হয়েছে। কোনো ফায়দা হয়নি। সে প্রশ্নে পরে আসছি।
তাহলে জহির রায়হান কোথায় হারিয়ে গেলেন? কেন ফিরলেন না? কারা তাঁকে মিরপুরে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল? সে রহস্যের সমাধান আজো হয়নি। এ নিয়ে অনেক কাহিনী আছে। কেউ কেউ বলতে চায় জহির রায়হানের কাছে আল-শামস, আল-বদর ঘাতকদের তালিকা ছিল। জহির রায়হান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে জন্যেই পাকিস্তানের সহচরেরা তাকে খতম করেছিল। মিথ্যা টেলিফোন করে নিয়ে গিয়েছে। মিরপুরের দুর্গম এলাকায় এবং সেখানেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
আজকের মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের একটি ভিন্ন ইতিহাস আছে। এ দু’টি এলাকা মোহাজেরদের পুনর্বাসনের কলোনি হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এ মোহাজেরের অধিকাংশ অবাঙালি। এরা ভারতের বিহার, উড়িষ্যা এবং উত্তর প্রদেশ থেকে এসেছে ভারত বিভাগের পর। এদের মধ্যে অনেকে চাকরিজীবী। এরা দেশ বিভাগের সময় পাকিস্তানে কাজ করার জন্যে অপসন দিয়েছিল। সে অপসন ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হয়েছিল সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে। বলা হয়েছিল–হিন্দু মুসলমান দুটি স্বতন্ত্র জাতি। এদের পক্ষে পাশাপাশি বসবাস করা সম্ভব নয়। তাই ভারতবর্ষ ভাগ করতে হবে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে গঠিত হবে ভারত। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে গঠিত হবে পাকিস্তান। দেশ ভাগ হলেই নাকি সব সমস্যার সমাধান হবে। দুসম্প্রদায় দু’টি রাষ্ট্রে শান্তিতে বসবাস করবে।
কিন্তু দ্বি-জাতি তত্ত্ব দেশ ভাগের আগেই হোঁচট খেল প্রথম পদক্ষেপে। কারণ নতুন গঠিত ভারত ও পাকিস্তান থেকে সামগ্রিকভাবে হিন্দু ও মুসলমানদের এক রাষ্ট্র থেকে অপর রাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হলো না। অর্থাৎ ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানরা থেকে গেল। আর পাকিস্তানে থেকে গেল হিন্দুরা। অর্থাৎ মুসলমান মুক্ত ভারত বা হিন্দু মুক্ত পাকিস্তান গঠিত হলো না। নিশ্চয়ই তখন প্রশ্ন তোলা যেত, ৬ কোটি মুসলমান যদি ৩০ কোটি হিন্দুর সঙ্গে ভারতে থাকতে পারে তাহলে অবিভক্ত ভারতের ত্রিশ কোটি হিন্দুর সঙ্গে দশ কোটি মুসলমান কেন থাকতে পারবে না। একই যুক্তিতে বলা যায় যদি পাকিস্তানের আড়াই কোটি মুসলমানের সঙ্গে দেড় কোটি হিন্দু বসবাস করতে পারে তাহলে সমগ্র ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি কেন বাস করতে পারবে না?
কিন্তু তখন যুক্তির পরিবেশ ছিল না। ছিল সংশয় সন্দেহ আর ষড়যন্ত্রের যুগ। ব্রিটিশ বেনিয়া, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত বিভাগের। ভারতে কংগ্রেস, পাকিস্তানে মুসলিম লীগ আর সবার ওপরে রাজত্ব করছে ব্রিটিশ। এ তিন দল মিলে সুনিপুণভাবে ভারত বিভাগের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল। আর এ পরিকল্পনার অঙ্গ হিসেবে সমগ্র ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। মানুষ হিসেবে মানুষের পরিচয় মুছে গিয়েছিল। এ উপমহাদেশে মানুষের প্রথম পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল হিন্দু, মুসলমান ও শিখ। সুস্থ মানবতার কোনো চিহ্ন আদৌ ছিল না। সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস চরমে উঠেছিল। এ পটভূমিতেই গঠিত হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান।
কিন্তু এ তত্ত্ব যে কত অলীক তা প্রমাণ হলো সরকার গঠন ও সরকারি কর্মচারিদের নিয়ে। সরকার গঠন করবে ভারতে কংগ্রেস এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ। এ দু’সরকারের কর্মকর্তা হওয়ার জন্যে পাকিস্তান থেকে হিন্দু নেতারা ছুটলেন ভারতে আর ভারত থেকে মুসলমান নেতারা ছুটলেন পাকিস্তানে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য হলো পূর্ববঙ্গের লোক। আজকের বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানিও ভারতে এসেছিলেন পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ থেকে। আর ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে মুসিলম লীগ নেতা লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন। পাকিস্তানের হিন্দু নেতারা কোটি কোটি হিন্দুদের পাকিস্তানে রেখে নিজের আখের গোছাতে গেলেন ভারতে। একইভাবে ভারতের মুসলমান নেতারা কোটি কোটি অসহায় মুসলমানদের ভারতে ফেলে পাকিস্তানে গেলেন। এক অভূতপূর্ব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো সরকারি কর্মচারিদের ব্যাপারে। তাদের বলা হলো-তাদের পছন্দমতো তারা ভারত এবং পাকিস্তানে চাকরি করতে পারবে। এ ব্যবস্থাটিকে বলা হতো অপসন। অর্থাৎ ইচ্ছে হলে ভারতের মুসলমান সরকারি কর্মচারিরা অপসন দিয়ে পাকিস্তানে আসতে পারে। আবার পাকিস্তানের হিন্দুরাও একইভাবে ভারতে যেতে পারে।
