আমার এ লেখা নিয়ে আমার সুহৃদ মহলেও বিতর্কের সৃষ্টি হলো। তারা অভিযোগ করলো আপনি কি লুটেরাদের বিচার চান না। আপনি কি চান না যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের সকল লুষ্ঠিত দ্রব্য ফিরে পাক। আপনার লেখায় তো মনে হচ্ছে আপনি রাজাকার ও হামলাকারীদের বাঁচিয়ে দিতে চাচ্ছেন। আমার সে কালের এ ধরনের লেখাগুলো নিয়ে এখনো আমাকে অভিযুক্ত করা হয়। আমি সেদিনও যে জবাব দিয়েছি, আজকেও আমার সেই জবাব দিতে হবে।
একথা সত্য, নয় মাসের সংগ্রামে বাংলাদেশের মানুষ অসাধ্য সাধন করেছে। একটি মানচিত্র পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু আমার ধারণা এবং বিশ্বাস হচ্ছে ৭১-এর আন্দোলনে তীব্রতা ছিল আবেগের। রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের প্রশ্ন ছিল একান্তই গৌণ। প্রথমে কেউ চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। পাকিস্তান বাহিনী হামলা শুরু করার পরে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেকেই কোনো কিছু না জেনে শুনেই ভারতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছে। তার কাছে কোনো সামগ্রিক চিত্র ছিল না। রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ না থাকার ফলে দেশ স্বাধীন করার প্রশ্নটিই ছিল মুখ্য। দেশের পরবর্তী রাজনৈতিক চিত্র আদৌ স্পষ্ট ছিল না কারো কাছে। আর ইতোমধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে গিয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি ঘরে। আমরা বাঙালির শাসন চাই কিন্তু সে জন্যে পাকিস্তান ভাঙতে হবে সে প্রশ্নটি মুখ্য ছিল না। আমি আগেও বলেছি এ প্রশ্নে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বিভাজন ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা বাড়ি ফিরে দেখল তাদের অনেকের আপনজনই রাজাকার এবং শান্তি কমিটির সদস্য। অথচ তাদের সঙ্গেই তাদের ঘর করতে হবে। এদের সঙ্গে কী আচরণ করা হবে এই কথা কেউ বলল না। পাকিস্তানের সহযোগিতার জন্যে কিছু লোককে গ্রেফতার করা ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না। যে ছেলেটি বাড়ি ফিরে দেখল তার মা রাজাকারের সহযোগিতা করেছে, সেই মায়ের কাছেই তার আশ্রয় নিতে হলো। অনেক মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা যুদ্ধের উন্মাদনায় কিছুদিনের জন্যে হলেও তার রাজাকার আত্মীয়-স্বজনকে ক্ষমা করতে চাইল না। অনেকেই নিজের স্বজনকে খুন করল। আবার কাউকে জেলে পৌঁছে দিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবে প্রতিরোধের কর্মসূচি বা সামাজিক সংস্কারের কর্মসূচি কোনো তরফ থেকেই দেয়া হলো না। মাঝখান থেকে আরেকটি প্রশ্ন বড় করে দেখা দিল। মুসলমান সমাজে জাত-পাতের বিভেদ গৌণ। চাচাতো বা মামাতো ভাই বোনের মধ্যে বিয়ে হয়। লক্ষ করা গেলো এ জন্যেই রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ না থাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের মনে এক সময় সেই রাজাকার স্বজন হয়ে দেখা দিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তীব্র না হওয়ায় সে সেই রাজাকার স্বজনের সঙ্গেই সহাবস্থান শুরু করল। এক সময় এটাই হয়ে দাঁড়াল সবচেয়ে বড় যুক্তি। অর্থাৎ রাজাকার হলেও আমার স্বজন বলেই তাকে মুক্তি দিতে হবে। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে কেউ মুক্তিযুদ্ধে গেলে তার ভবিষ্যৎ কর্মপথ বেছে নিতে অসুবিধে হতো না। দুঃখজনক হলেও সত্য, আওয়ামী লীগসহ কোনো রাজনৈতিক দলই মুক্তিযুদ্ধের এ দিকটি কখনোই ভেবে দেখেনি। কেউ ভাবতে চেষ্টা করেনি, সামগ্রিকভাবে সমাজে মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্যতা গ্রহণযোগ্য করতে না পারলে শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের লুট করা দ্রব্য ফেরত দিতে বললে সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সঙ্কট আরো গম্ভীর হবে বলেই আমার ধারণা ছিল এবং আমার লেখার শেষ পর্যন্ত একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো।
একই সময় আমি ভারতীয় পণ্যের দাম সম্পর্কে একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলাম। তখন কোলকাতায় সাপ্তাহিক দেশ-এর দাম ছিল ষাট পয়সা। ঢাকায় দেশ বিক্রি হতো এক টাকায়। আমি বলেছিলাম এ প্রবণতা ভালো নয়। মানের দিক থেকে ভারত ও বাংলাদেশের মুদ্রা মান তখন এক ছিল। এ সত্ত্বেও কেন ভারতের পণ্য বাংলাদেশে বেশি দামে বিক্রি হবে, এটাই ছিল আমার প্রশ্ন। আমার ভয় ছিল অন্যত্র। আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেয়ার সময় বলতাম করাচির তিন টাকার চাল আমাদের ঢাকায় ৬ টাকায় কিনতে হয়। সুতরাং ওই পাকিস্তান আমরা চাই না। ওই পাকিস্তানে আমরা থাকব না। একই ধারায় যদি প্রশ্ন ওঠে ভারতীয় পণ্য এদেশে বেশি দামে বিক্রি হলে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। ওরা পাকিস্তানের মতোই আমাদের ঠকাচ্ছে।
আমার এই লেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠল বিভিন্ন মহলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তাকে সঠিকভাবে আমার কথা বোঝাতে পেরেছিলাম। কিন্তু রাজাকারদের গ্রেফতার করা বা মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা দেয়া নিয়ে আমার লেখা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
একদিন খবর পেলাম জহির রায়হান মিরপুরে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। আমি হতভম্ভ হয়ে গেলাম। জহির আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। জহিরের বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের সঙ্গে দীর্ঘদিন এক সঙ্গে জেল খেটেছি। সাংবাদিক ইউনিয়ন করেছি। তবে জহিরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ভিন্ন ধরনের। আমি যখন ছাত্রলীগ করতাম তখন আব্দুল গাফফার চৌধুরী ও জহির রায়হান ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত জহির সিনেমায় চলে গেল। সব নিয়েই জহিরের সঙ্গে আমার আলাপ হতো। তার সিনেমা নিয়ে একমত হতাম না। পাকিস্তান আমলে সর্বশেষ জেল খেটে বের হয়েছিলাম ১৯৬২ সালের জুন মাসে। পরদিন জহিরের কায়েতটুলির বাসায় গিয়েছিলাম। তর্ক বেধে গেল জহিরের ছবি ‘সঙ্গম’ নিয়ে। জহির বলল, উপায় নেই। আপনারা সাধারণ দর্শকের রাজনৈতিক চেতনা উন্নত করতে না পারলে ওরা বোম্বে মার্কা ছবিই দেখবে। আমাদের মতো মানুষের পক্ষে বারবার লোকসান দিয়ে ভালো ছবি করে টিকে থাকা সম্ভব হবে না।
