সে থেকেই অনিকেত নামে আমার লেখা শুরু দৈনিক বাংলায়। অনিকেত নামে এ লেখা প্রথম বন্ধ হয়েছিল ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাকশাল গঠনের পর শেখ সাহেবের নির্দেশে। তবে তার আগেই আমার লেখা নিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে পদ্মা-মেঘনা-যমুনায়।
দৈনিক বাংলায় জানুয়ারিতে আমার লেখা নিয়ে প্রায় তোলপাড় হয়ে গেলো। তখন আমি নির্মল সেন নামেই লিখছি। আমার লেখা শিরোনাম ছিল ‘আমি ভয় পাই। আমার বক্তব্য ছিল আমাদের কাছাকাছি অনেক লোক এখন ঘুরছে। অনেক লোককে দেখছি নতুন পোশাকে। অনেকে সরকারের অনুগ্রহ পাচ্ছে। কিন্তু এরা তো চেনা মুখ। আমি স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে বেশ কয়েকবার ঢাকায় এসেছি। টেলিভিশনে এদের মুখ দেখেছি। কণ্ঠ শুনেছি বেতারে। মিছিল দেখেছি ঢাকা শহরে। এরা তখন তাণ্ডব নৃত্য করেছে সারা বাংলাদেশে। সারা দেশে এক মৃত্যুর রাজত্ব। এই মানুষগুলো এ রাজত্বের নেতৃত্ব করেছে। কণ্ঠ দিয়েছে বেতারে। নাটক লিখেছে। অভিনয় করেছে স্বাধীনতাবিরোধী নাটকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমার শেষ কথা ছিল–এদের দেখে আমি নতুন করে ভয় পাচ্ছি। এদের আমি বিশ্বাস করব কীভাবে। তাই আমি ভয় পাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার দু’মাসের মধ্যে ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরেছে।
প্রতিপক্ষের ভাষ্য হচ্ছে–নির্মল সেন আবার পরিস্থিতি ঘোলাটে করে দিছে। একদল মানুষ ভয় ভীতিতে বাধ্য হয়ে ওই ৯ মাসে অনেক কিছু করেছে। তারা গান গেয়েছে। নাটক করেছে। নেহাৎ বাঁচার জন্যে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ওই ভূমিকা নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে এমনি নতুন করে উসকে দেয়া আদৌ সঠিক কি? এতে ঘরে ঘরে বিবাদ দেখা দেবে। বেতার টেলিভিশনের শিল্পীদের কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। নতুন করে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে।
এ ব্যাপারে আমার ভিন্ন বক্তব্য ছিল। আমি লিখেছিলাম দেশে আটকেপড়া মানুষগুলোর খবর আমরা জানি। ৯ মাসের যুদ্ধকালে আমি অন্তত ৫ বার ঢাকা শহরে ঢুকেছি। ভারতে গিয়ে আবার ফিরে এসেছি। অসংখ্য মানুষের খোঁজ নিয়েছি। এদের জন্যে আমার সহানুভুতি ছিল। কারণ এরা নিত্য মৃত্যুর শিকার। কখন মৃত্যুর পরোয়ানা আসবে কেউ জানে না। সীমান্তের ওপারে যারা গিয়েছেন তাদের জীবনে এই আশঙ্কাটি ছিল না। তাদের প্রতি মুহূর্তে পাকিস্তানি হামলার ভয় ছিল না। কিন্তু ঢাকায় ভয়টি ছিল প্রতিদিন। সুতরাং ভয়ের মুহূর্তে সবকিছুই করে ফেলা সম্ভব।
তবু আমার প্রশ্ন ছিল রচিত গান এবং ইতিহাসের সন্ধান সম্পর্কে। অবাঙালিরা বাঙালির ইতিহাসের সকল খবর জানত না। তাদের পক্ষে খুঁজে খুঁজে ইতিহাসের নোংরা আবর্জনা বের করা সম্ভব ছিল না। এ নোংরা এবং আবর্জনা আমাদের লোকেরাই অনুসন্ধান করে বের করেছে। গান লিখেছে, নাটক করেছে। সবকিছুই মিথ্যা নির্ভর। তারা না করলে বা অসহযোগিতা করলে হয়তো বা ৭১-এর সংগ্রামকালে তৎকালীন পাকিস্তান বেতার থেকে ঐ অশ্লীল গান এবং নাটক আমাদের শুনতে হতো না। আমার বক্তব্য ছিল এই মানুষগুলোকে নির্বিচারে সব সুযোগ দিলে পুরনো ঐতিহ্য বহাল থাকবে। কোনোদিন এরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না। বলবে, বন্ধুকের নলের ভয়ে এরা এসব কিছু করতে বাধ্য হয়েছে। নিজের করার কিছু ছিল না। এরা বারবারই বিশ্বাসঘাতকতা করে বেঁচে যাবে। আর একথাও মেনে নিতে হবে, এরা সকলেই বন্দুকের ভয়ে করেছে তা সত্য নয়। অনেকেই নিজের ইচ্ছেয় এবং নিজের বিশ্বাসে এই ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। যে কোনো কারণেই হোক এ ঘটনা নিয়ে তেমন পর্যালোচনা হলো না। যারা ক্ষমতার কাছাকাছি আছে, তারা যেমন ছিল তেমন থাকল। মাঝখান থেকে কিছু চুনোপুটি রাজাকার আলবদর হিসেবে বেতার ও টেলিভিশনের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেল। নতুন যারা ক্ষমতায় এলেন তারাও প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন যে দালালিতে তারাও কম যান না। পূর্বতন সরকারের সবকিছু খারাপের মতো বর্তমান সরকারের সবকিছু ভালো বলেও তারা তীব্রস্বরে চিৎকার শুরু করলেন।
লেখাটি নিয়ে কোনো কোনো মহল আমাকে অভিনন্দন জানালেন। অনেকেই বিরূপ হলেন। পাকিস্তান আমলে এরা পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। তাদের বক্তব্য–অবস্থা এমন দাঁড়ালে তাদের চিরদিনই ভুগতে হবে। আর ক্ষমতাসীনদের বক্তব্য হচ্ছে–অবস্থা এমন দাঁড়ালে সুস্থভাবে সরকার চালানো যাবে না।
ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো আমার আরেকটি লেখা নিয়ে। তখন আমি অনিকেত নামে লিখছি। আমার লেখার বিষয় ছিল সরকারের একটি ঘোষণা ও বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের দাম। সরকার ঘোষণা দিলেন হিন্দুদের সমস্ত লুণ্ঠিত দ্রব্যসামগ্রী ফেরত দিতে হবে। আমি লিখলাম, ঘোষণাটি ভালো কিন্তু এ ঘোষণা কার্যকর করা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের লুটপাটের পণ্য কেউ তার ঘরে জমা করে রাখেনি। ফরিদপুরের টিন বিক্রি হয়ে চলে গেছে দিনাজপুরে। আমার বাড়ির রেডিওটি আমার পাশের বাড়ির লোক নিয়ে থাকলেও নিশ্চয়ই লজ্জায় সে আমাকে রেডিওটি ফেরত দেবে না। অনেক এলাকায় ঘর পুড়েছে। সেই পোড়া ঘরে ছাই ব্যতীত ফিরিয়ে দেয়ার মতো কিছুই নেই। কিন্তু সবকিছু ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলে আইন আদালতের প্রশ্ন উঠবে। এক্ষেত্রে অভিযোগকারীদের মধ্যে শতকরা ৯৯ জন হবেন সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের লোক। এই মামলাকে ভিত্তি করে আরেকটি প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক চিন্তা ভাবনা সমান্তরালভাবে জন্ম নেবে। একদিন ভয়ে এবং শঙ্কায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা মামলা করলেও সাক্ষ্য দিতে যাবে না। মামলায় একতরফা সিদ্ধান্ত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বেকসুর খালাস পাবে। তারপর একদিন বুকটান করে এসে বলবে, কিরে ব্যাটা মালাউন, দেখি তোরে এখন কে রক্ষা করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমার সুপারিশ ছিল লুষ্ঠিত দ্রব্যাদি ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক। পুলিশকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া হোক।
