যাঁরা বলেন, ৭ মার্চ রেসকোর্সে শেখ সাহেবের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়া উচিত ছিল, তারা কি পরবর্তী চিত্রটি ভেবে দেখেছেন? ধরা যাক, শেখ সাহেব রেসকোর্স ময়দানেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো পাকিস্তান বাহিনীর হামলা এবং সে হামলায় নিশ্চয়ই রেসকোর্সেই লাখ খানেক মানুষ মারা যেত। তারপর কি আপনারা অভিযোগ করতেন না শেখ মুজিবুর রহমান হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? তাই আমার সেদিন মনে হয়েছিল ওর চাইতে বেশি কিছু বলার অবকাশ সেদিন ছিল না।
এ পটভূমিতে আমি নিজেই বিভ্রান্ত ছিলাম। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কি ভাষণ শেখ সাহেব দেবেন ১০ জানুয়ারি। ১০ জানুয়ারি ৭ মার্চ নয়। ৭ মার্চ যে আন্দোলনের শুরু ১৬ ডিসেম্বর সে আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে। নতুন রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব নিতে হবে। নেতার প্রতিটি কথা দেশে বিদেশে পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করা হবে। বুঝতে চেষ্টা করা হবে তাঁর মন মানসিকতা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি। দেশে এসে তিনি ৯ মাসের বিস্তারিত বিবরণ শুনতে পারেননি। সার্বিকভাবে জানেন না স্বাধীন বাংলা সরকারের কার্যাবলি। তার অনুপস্থিতিতে কোনো নীতি চূড়ান্ত হয়নি। চূড়ান্তকরণের প্রশ্নই ওঠেনি। সবকিছু যেন নতুনভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। মানুষ ভেবেছে শেখ সাহেব ফিরে এলে কি স্বাধীন বাংলার নতুন নীতি নির্ধারিত হবে? স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা শোনা যাবে? এ আশা নিয়েই সেদিন লাখ লাখ মানুষ রেসকোর্স ময়দানে এসেছিল। কিন্তু সে আশা পূরণ করার অবকাশ কি সেদিন ছিল?
৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১০ জানুয়ারির শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক অর্থে একই ব্যক্তি নন এমন একটি ধারণা নিয়েই আমি জনসভায় গিয়েছিলাম। সেদিনের শেখ সাহেবের ভাষণ শুনেছিলাম এবং লক্ষ করেছিলাম সাধারণ মানুষ যেন আরো কিছু চাইছে। শেখ সাহেব দীর্ঘ ভাষণ দিলেন না। শুধু তাঁর ভাষণের একটি বাক্য আমার কানে বাজল। তিনি বললেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে আমি প্রশংসা করতে পারলাম না। জনতা এ বাক্যটি ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছিল। তারা চেয়েছিল সরাসরিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করা হোক। কারণ ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সহায়তা না করলে এত রক্তপাত আর এত মৃত্যু বাংলাদেশে হতো না। সবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল বাংলাদেশে। জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করতে চাইলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাধা দিয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘ করেছে। আর ওই সময় আলবদর বাহিনী হত্যা করেছে বাংলাদেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের। এ ঘটনা ঘটেছিল ১৩, ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর। আর তার একমাস না যেতেই ১০ জানুয়ারি শেখ সাহেব ভাষণ দিলেন রেসকোর্স ময়দানে। সে ভাষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জোরালো কথা না থাকায় সাধারণ শ্রোতারা যেমন ক্ষুব্ধ হলো, আমারও মনে হলো কিছুদিনের মধ্যেই নতুন কিছু ঘটতে যাচ্ছে আমাদের রাজনীতিতে। মন্ত্রিসভায় নিশ্চয়ই এবার মতানৈক্য দেখা দেবে। কারণ স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন বাংলাদেশে ফিরে ঘোষণা করেছেন–সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য নেয়া হবে না। তাজউদ্দিন সাহেবের মার্কিনবিরোদী ভূমিকা ছিল খুবই স্পষ্ট। এ ভূমিকা নিয়ে মন্ত্রিসভায় বিরোধিতা ছিল। তাঁর নীতির বিরোধিতা করেছেন খন্দকার মোস্তাক আহমদ। তৎকালীন ছাত্রলীগ তাজউদ্দিনকে বিরোধিতা করেছে পদে পদে। শেখ সাহেবের ভাষণ থেকে আমার মনে হলো সরকারের নেতৃত্বে তাজউদ্দিন থাকছেন না।
কিভাবে নতুন সরকার গঠিত হবে, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন এ চিন্তা তখনো আমার মনে আসেনি। শুধু এটুকু মনে হলো, মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব পরিবর্তিত হবে। তাজউদ্দিনের নীতির পরিবর্তন হবে এবং কিছুদিন পরে সে ঘটনা ঘটল। শেখ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হলেন। প্রেসিডেন্ট হলেন আবু সাঈদ চৌধুরী। তাজউদ্দিন থাকলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় সূচিত হলো।
এ সময় বাস্তব কারণে আমার নিজের ভূমিকা পরিবর্তন হলো। এ পরিবর্তনের কেন্দ্র হচ্ছে জীবিকার জন্যে গ্রহণ করা সাংবাদিকতা পেশা।
মুখ্যত রাজনীতি আমার পেশা। নিজের সিদ্ধান্ত ছিল কোনকালে কারো অধীনে চাকরি করব না। আর চাকরি বা আমাদের কে দেবে। ছাত্র পড়ানোই ছিল আমার একমাত্র পেশা। ১৯৫৮ সালে এ পেশা নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। দেশে সামরিক শাসন জারি হয়েছে। অধিকাংশ রাজনীতিক আত্মগোপন করেছেন। অনেকেই জেলে। বন্ধুদের বক্তব্য হচ্ছে কোনো চাকরি নিলে হয়তো গ্রেফতার এড়ানো যাবে। নইলে সামরিক সরকার একদিন গ্রেফতার করবেই। বন্ধু আহমেদুর রহমান তখন দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক। তিনি বললেন, ইত্তেফাকে চাকরি নিন। আমি ব্যবস্থা করব। ইত্তেফাকের তখন অন্যতম সহকারী সম্পাদক আব্দুল আউয়াল। আউয়াল এক সময় ছাত্রলীগের সম্পাদক এবং আমি দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। আমার চাকরি হবার এক সপ্তাহের মধ্যে ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন গ্রেফতার হয়ে গেলেন। আমি গ্রেফতার হলাম একমাসের মধ্যে। জেল থেকে বের হলাম ১৯৬২ সালের জুন মাসে। ইত্তেফাকে সকলের চাকরি হলো। আমার চাকরি হলো না। চাকরি হলো জেহাদে। জেহাদ বন্ধ হয়ে গেল ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে। দৈনিক পাকিস্তান অর্থাৎ দৈনিক বাংলা প্রকাশিত হলো ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে। দৈনিক পাকিস্তানে চাকরি হলো সহসম্পাদক হিসেবে। দেশ স্বাধীন হবার পর আমার পদে আর ফিরতে পারলাম না। তখন কাগজের নাম দৈনিক বাংলা। শেষ পর্যন্ত সহকারী সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হলাম। সহকারী সম্পাদক ছিলেন শামসুর রাহমান, আহমেদ হুমায়ুন, মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ, ফজল শাহাবুদ্দিন প্রমুখ। তারা সবাই ছদ্মনামে উপসম্পাদকীয় লিখতেন। আমি নিজের নামে উপসম্পাদকীয় লিখতে রু করলাম। মাঝখানে একদিন একটি ঘটনা ঘটে গেল। এক তরুণ এসে দাবি করলো তার লেখা আমাদের ছাপাতে হবে। আমরা বললাম বাইরের কোনো লেখা ছাপা হয় না। সে দাবি করল আপনি নির্মল সেন নিজের নামে লিখতে পারলে আমি কেন নিজের নামে লিখতে পারব না। আর সেদিন থেকে নির্বাহী সম্পাদক তোয়াব খান আমাকে ছদ্মনামে লেখার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু নতুন নাম কোথায় পাব। পাশে সহ সম্পাদক সাদেকীন কাজ করছিল। সে বলল আমি একটি নাম দিচ্ছি। নাম হচ্ছে, অনিকেত। অর্থাৎ যার কোনো নিকেতন নেই–উদ্বাস্তু।
