জীবনে দু’বার স্বাধীনতা দেখেছি। প্রথম স্বাধীনতা দেখেছিলাম ১৭ বছর বয়সে। দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা দেখলাম ৪১ বছর বয়সে। প্রথম স্বাধীনতার ভয়াবহ স্মৃতি তখনও মন থেকে মুছে যায়নি।
১৯৪৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা এসেছিল সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ বিভাগের মাধ্যমে। উপমহাদেশের দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের কাছে স্বাধীনতা ছিল ভয়, ত্রাস এবং শঙ্কার। কোটি কোটি মানুষের জীবনে সে স্বাধীনতা ছিল অমানবিক এবং দানবীয়। সেই স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভেবেছি এই স্বাধীনতার অর্থ কী। যে স্বাধীনতা মানুষকে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করে, সেই স্বাধীনতার শিকার সাধারণ মানুষকে দেশান্তরী হতে দেখেছি। দেখেছি ভিন দেশ থেকে আরো একদল মানুষকে সর্বশান্ত হয়ে আমার দেশে আসতে। ওদের কারো চোখে কোনো আশা বা ভাষা নেই। সবই অনিশ্চিত। নিজের জননীকে দেখেছি দেশান্তরী হতে।
তবে সে দৃশ্য বেশিদিন দেখতে হয়নি। আমার স্বাধীন দেশটির নাম পাকিস্তান হওয়ায় আমার জেলে যাওয়া হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। স্বাধীন পাকিস্তানের মুক্ত বায়ুতে আমাদের থাকার অধিকার ছিল না। ১৯৪৭ সালের পর যারা জন্মেছেন তাদের সে পরিস্থিতি বোঝার কথা নয়। আমি ওই বয়সেও বুদ্ধি দিয়ে বুঝতাম যে ভারতবর্ষ নামক উপমহাদেশটি ভাগ হয়েছে ব্রিটিশের নেতৃত্বে। একটি ভাগের নাম ভারত। ওই ভাগটিতে কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান লুটেপুটে খাবে। অপর ভাগের নাম পাকিস্তান। সেখানে লুটেপুটে খাবে মুসলিম লীগ নামক একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এই দুটি প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশের সঙ্গে মিলেমিশে ভারত শাসন করেছে। এই উপমহাদেশে মানুষ নামে কোনো প্রাণী নেই। মুখ্যত হিন্দু মুসলমান নামে কোটি কোটি জীব আছে। এদের একটি অংশে শাসক ও শোষণ করার দায়িত্ব ব্রিটিশ দিয়েছে কংগ্রেসকে। অপর অংশের দায়িত্ব পেয়েছে মুসলিম লীগ। আমার রাজনীতিক জ্ঞান আমাকে শিখিয়েছিল এই শোষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। লড়তে গেলে বেশিদিন বাইরে থাকা যাবে না। ওই পাকিস্তান সৃষ্টির পর মাত্র বছরখানেক জেলের বাইরে ছিলাম। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের সৃষ্টি। আর আমি গ্রেফতার হলাম ১৯৪৮ সালের ২০ আগস্ট। জেল থেকে বের হতে ১৯৫২ সাল কেটে গেল, অর্থাৎ জেলের বাইরে রাজনীতির ঝামেলা আমাকে পোহাতে হয়নি বছর চারেক।
তবে জানতাম যে, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিতে নতুন কিছু ঘটবে না। ব্রিটিশ ধাচেই একটি রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা হবে। নেতৃত্ব থাকবে দুর্জন এবং দুর্বল ব্যক্তিদের হাতে। মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।
কিন্তু ১৯৭১ সাল তো ১৯৪৭ নয়। এই সংগ্রামের একটি ভিন্ন উত্তরাধিকার আছে। একটি ভিন্ন স্বপ্ন ও একটি ভিন্ন আকাক্ষা আছে। সেই স্বপ্ন ও আকাক্ষার ভিত্তিতে ৭১-এর সংগ্রামের জন্ম। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে দেশ স্বাধীন হলেই ওই সমস্যার সমাধান হবে তার স্বপক্ষে কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। কারণ এই যুদ্ধের নেতারা আমার চেনা। অসম্ভবভাবে জানা। ৭১ সালের ৯ মাসে আরো জানা হয়ে গেছে তাদের চরিত্র। ভিন্ন দেশের মাটিতে থেকে যারা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ক্লেদাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে, তারা বাড়ি ফিরে কী করতে পারে তা বুঝতে বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। অথচ সেই অপ্রিয় সত্যটি হৃদয়ঙ্গম করলে ৭১-এর যুদ্ধের কোনো অর্থ থাকে না। তবু আশা। ব্যাখ্যা এবং যুক্তিহীন স্বপ্ন। তবুও ভেবেছি দেখি শেখ সাহেব দেশে ফিরলে কী হয়। এমন সময় খবর এল শেখ সাহেব মুক্তি পেয়েছেন। ঢাকায় আসছেন ১০ জানুয়ারি।
শেখ সাহেব এলেন দশ তারিখে। রেসকার্সের জনসভায় তাঁর ভাষণ শুনতে গেলাম। শেখ সাহেবের দিকে তাকিয়ে চমকে গেলাম। শরীরটা দারুণ ভেঙে গেছে। মুখে নিদারুণ ক্লান্তির ছাপ। চারদিকে উদ্বেলিত জনতা যেন তাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। খুব মনযোগ দিয়ে তাঁর ভাষণ শুনলাম। মানুষ কান পেতে শুনল। মনে হলো মানুষ তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত ভাষণ পায়নি। তার কাছে যেন অনেক পাওয়া ছিল। ৯ মাস শেখ সাহেবের অনুপস্থিতিতে তারা সংগ্রাম করেছে। অনেক কিছু হারিয়েছে। ভেবেছে ৭ মার্চের মতো একটি অগ্নিঝরা ভাষণ তাঁর কাছ থেকে শুনবে। সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
আমি কিন্তু তেমনটি ভাবিনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ অগ্নিঝরা হলেও আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। সেদিনের জনতা ক্ষুব্ধ ছিল। শেখ সাহেব সমালোচিত হয়েছিলেন স্বাধীনতা ঘোষণা না দেয়ার জন্যে। আমার কথা ছিল-৭ মার্চ ওর চেয়ে বেশি কিছু বলার তার ছিল না। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’-ওই সময় এর চেয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব বা স্বাভাবিক ছিল না। যাঁরা বলতে চান তিনি স্বাধীনতা চাইতেন না কিংবা স্বাধীনতার নামে ভাওতা দিয়েছেন তাঁদের সঙ্গে আমি একমত নই। একটা কথা সবাইকে মেনে নিতে হবে, শেখ সাহেব যে কোনো অর্থেই ওই ভাষণ দিয়ে থাকুন না কেন, ওই ভাষণ থেকে পিছু হটবার তাঁর কোনো উপায় ছিল না। আমি তর্কের খাতিরে সমালোচকদের বক্তব্য মেনে নিতে রাজি–যাঁরা বলেন, তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতা করতে চেয়েছিলেন বা সমঝোতা করে প্রধানমন্ত্রী হলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হতোই। ইতিহাসের কোনো আন্দোলনই শুধুমাত্র নেতারা নির্ধারণ করে না। আন্দোলনের গতিপথে একসময় জনতাই নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায়। সে জনতাকে নেতৃত্ব দিতে না পারলে একসময় নেতৃত্বই ছিটকে পড়ে যায়। জনতা নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলে।
