এ সময় একদিন রাতে অজস্র গুলির শব্দ শুনলাম। সারা ঢাকা শহর চমকাচ্ছিল। রাতের আকাশ রঙ পাল্টাচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে। খবর এসেছে শেখ সাহেব নাকি মুক্তি পেয়েছেন। সারা শহরে উল্লাস। আমি কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। আমি বুঝতে পারছিলাম না দেশে কী হচ্ছে। সারাদেশে অস্ত্র। সকলের হাতে অস্ত্র। অন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ অস্ত্রের ব্যবহার কারো কাছে বাঞ্ছিত নয়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কেউ সে কথা শুনছে না। ছাত্রনেতা আ স ম আব্দুর রব বলেছেন, তাঁরা অস্ত্র জমা দেবেন না। তাদের নাকি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করার জন্যে আবার অস্ত্র ধরতে হতে পারে। তারা নাকি পাকিস্তান অভিমুখী অভিযান করতে পারেন। এ ধরনের কথাবার্তা আমার কাছে ছিল অর্থহীন বাগাড়ম্বর। কিন্তু কোথায় জানি একটা ভিন্ন অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম এরা কী চায়! ভারতের মাটিতে এদের ভূমিকা দেখেছি। ছাত্রলীগ নেতারা প্রকাশ্যেই তাজউদ্দিন আহমদের বিরোধিতা করেছে ভারতে। ভারতে স্বাধীন বাংলা সরকারের সঙ্গে একটি সমান্তরাল নেতৃত্ব ছিল ছাত্রদের। এই ছাত্রদের নেতৃত্বেই মুজিববাহিনী গঠিত হয়েছিল। এই মুজিববাহিনীর দায়িত্ব ছিল রাজাকার ও বামপন্থীদের চিহ্নিত করা। এ মুজিববাহিনী গঠিত হয়েছিল ভারতের মেজর জেনারেল ওবানের নেতৃত্বে। এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের অজ্ঞাতে এবং শেষ পর্যন্ত তাজউদ্দিন আহমদ মুজিব বাহিনীর বিরোধিতা করেছিলেন। এখানটাতেই আমার খটকা লেগেছিল।
আমার প্রশ্ন ছিল, তাহলে ভারত সরকার কী চায়? তাজউদ্দিন সরকারের পেছনে ভারত সরকার আছে। আবার তাজউদ্দিনের অনুমতি না নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠন করেছে ভারতের সেনাবাহিনী। তাহলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের কি কোনো পার্থক্য ছিল কৌশল নিয়ে?
কলকাতায় শুনেছি একটি নির্দিষ্ট লক্ষে মুজিববাহিনী গঠিত হয়েছে। ভারতের শাসক শ্রেণির কোনো কোনো মহলের ধারণা ছিল শেখ সাহেব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরবেন না। শেখ সাহেব স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে না এলে এক অভাবনীয় শূন্যতার সৃষ্টি হবে। সেই শূন্যতায় হাল ধরার জন্যেই মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছে। এই মহলের ধারণা এই শূন্যতায় মুজিববাহিনী হাল
ধরলে বামপন্থীদের হাতে ক্ষমতা চলে যাবে। এই বামপন্থীদের নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও মোজাফফর ন্যাপ। এ মহলের ধারণা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সবচে’ লাভবান হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি ও মোজাফফর ন্যাপ। পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে মাত্র একটি আসন পেয়েছিল মোজাফফর ন্যাপ। ছাত্র ফ্রন্টে তাদের কিছু প্রভাব থাকলেও কৃষক বা শ্রমিক ফ্রন্টে তাদের কোনো প্রভাব ছিল না। ৭১-এর যুদ্ধের সময় ভারতের মাটিতে কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যে আসে। প্রয়াত কমরেড মনি সিং ও মোজাফফর ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ স্বাধীন বাংলা সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। অপরদিকে ভারতের সরকারি মহলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি অর্থাৎ সিপিআই-এ সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব ডিপি ধর এবং পিএন হাসকার দুই ক্ষমতাসীন ব্যক্তিত্ব। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে এদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফলে ভারত সরকারের কাছে এই দুটি দলের গুরুত্ব অনেক। হয়তো এ কারণেই আগস্টে আমার ভারত প্রবেশকালে ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাকে সীমান্তে আটক করে জিজ্ঞেস করেছিল, আমি আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি বা মোজাফফর ন্যাপের সদস্য কিনা। আমি যতদূর জেনেছি অনেক দেন দরবারের ফলে ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টি বিশেষ ট্রেনিং-এর সুবিধা পেয়েছে ভারতের মাটিতে। অপরদিকে পিকিংপন্থী বা অন্যান্য চরম বামপন্থী বলে কথিত দলের সদস্যরা প্রশিক্ষণ নিয়েও শেষ পর্যন্ত সরকারিভাবে মুক্তিযোদ্ধা বলে স্বীকৃতি পায়নি। অর্থাৎ ভারতের মাটিতে ভারত সরকারের বাংলাদেশ সম্পৰ্কনীতির একাধিক রূপ দেখেছি :
১. সরকারিভাবে দৃশ্যত ভারত সরকার স্বাধীন বাংলা সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে।
২. সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাজউদ্দিন সরকারবিরোধী ছাত্রলীগকে মদদ গিচ্ছে।
৩. দিল্লির একটি রাজনৈতিক আমলামহল বাংলাদেশের মস্কোর অনুসারি বামপন্থীদের সাহায্য সহযোগিতা করেছে।
বাংলাদেশে ফিরে তেমন একটি চিত্র আমার চোখে পড়েছিল। দেশে তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সরকার চলছে। ছাত্রলীগ নেতৃত্ব সে সরকারের তোয়াক্কাই করছে না। কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। আর তখন লক্ষণীয় ছিল ভারতীয় দূতাবাসে কূটনীতিক নির্বাচন। এই দূতাবাসের অধিকাংশ কূটনীতিক ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে একসময় ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। ভারতের দূতাবাসের চেহারা দেখে মনে হতো শেখ সাহেব দেশে ফিরুক আর না ফিরুক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে মস্কোপন্থীরাই নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। যেন সেই প্রস্তুতি নিয়েই ভারত তার বাংলাদেশের দূতাবাস সাজিয়েছে। এ কথাগুলো ছিল তখন আমার একান্ত চিন্তা। কাউকে বলতে পারছিলাম না। তবে মনে হচ্ছিল তাজউদ্দিন সাহেব বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। ছাত্রলীগ তাঁকে বরদাস্ত করবে না। তাঁকে বরদাস্ত করবে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ ছাত্র জীবনে তাজউদ্দিন আহমদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা সকলেরই জানা ছিল। তবে আমি এতো কথা ভাবলেও সব কিছু গুছিয়ে নিতে পারছিলাম না।
