এ পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের সংগ্রাম এসেছিল। সে সগ্রামের প্রথম কথা ছিল বাঙালি নির্বাচনে জিতেছে। বাঙালি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। সুতরাং বাঙালিকে পাকিস্তান শাসন করতে দিতে হবে। না দেয়া হলে আমরা স্বাধীন হয়ে যাব। আমরা তোমাদের সঙ্গে থাকব না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই বুঝতে পারেনি এই স্বাধীন হবার অর্থটা। তাদের ধারণা ছিল একটা আপোষ হবেই। এক শ্রেণির তরুণ ছাড়া অনেকেই মনে করেছিল আপোষ হয়ে যাবেই। অন্তত ২২ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা থেকে মনে হচ্ছিল একটা মীমাংসা হয়ে যাবে। কারণ আমাদের নেতারা তখনো মীমাংসা টেবিলে বসছেন। আলোচনা করছেন একটি সমঝোতার জন্যে। এই পরিবেশে আর যাই হোক অন্তত যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া যায় না।
অথচ এমনটিই ঘটেছিল ১৯৭১ সালে। ২২ মার্চ যাদের সঙ্গে আলোচনায় বসলাম, মীমাংসা হচ্ছে বলে সরকারকে জানালাম তারা ২৫ মার্চ রাতে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কোনো দিক থেকেই আমরা তখন প্রস্তুত ছিলাম না। রাজধানী ঢাকাসহ কিছু শহরে কিছু সোরগোল আর গ্রাম-গ্রামান্তরে ছাত্রদের কিছু প্রচারধর্মী কর্মকাণ্ড ব্যতীত এ যুদ্ধ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। এ যুদ্ধ সম্পর্কে কোনো রাজনৈতিক মানসিক প্রস্তুতি ছিল না।
কিন্তু একটি যুদ্ধ এসে গেল। অধছ কেউ জানে না এ যুদ্ধ কে চালাবে। যার নেতৃত্ব দেবার কথা প্রথমে তার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। পরে জানা গেল তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। পরবর্তী স্তরের সকল নেতাদের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল নিজেদের বাঁচাবার এবং আশ্রয় খুঁজে বের করবার। সাধারণ মানুষের জানা ছিল না ভারতে যেতে হবে। তাদের জানার কথা নয় যে ভারত আশ্রয় দেবে। নির্যাতিত হিন্দুরা বাঁচার গরজে সীমান্তের দিকে ছুটেছিল। তাদের একটি ভরসা ছিল। কিন্তু মুসলমানেরা কেন ভারতে যাবে। কী করে যাবে। তারা ভারতে গেলে যে আশ্রয় পাবে তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়। কিন্তু এক পর্যায় দেখা গেল ভারত সকলের জন্যে দরজা খুলে দিয়েছে। আমি এপ্রিল মাসে আগরতলা গিয়ে এক কংগ্রেস নেতাকে এ প্রশ্ন করেছিলাম। বলেছিলাম পাকিস্তান আপনাদের এক নম্বর শত্রু। সে দেশের মানুষকে আপনারা আশ্রয় দেবেন কেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন দিল্লি গিয়ে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে জিজ্ঞেস করুন। ভারতে বেশ কিছুদিন ছিলাম। সে প্রশ্ন কাউকে আর জিজ্ঞেস করিনি। অনেক তরুণকে দেখেছি ভারতের মাটিতে। তাদের যুদ্ধ করতে দেখেছি। তারাও যুদ্ধ শেষে দেশের মাটিতে আমার মতো ফিরে এসেছে। তারাও দেশে ফিরে বিভ্রান্ত হয়েছে। ভেবেছে দেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত হবে কোনো মাপকাঠিতে। চিহ্নিত কিছু পরিবার ছাড়া অনেক পরিবারেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ছিল বাবা আর পক্ষে ছিল। অনেক পরিবারে অনেকে পাকিস্তানের বিপক্ষে ছিল। আবার অনেকে যুদ্ধ করে প্রাণও দিয়েছে। একজন সাধারণ তরুণ প্রশিক্ষণ ছাড়া যুদ্ধে গিয়েছিল। সে জানত দেশ স্বাধীন না হলে দেশে ফেরা যাবে না। যুদ্ধের জীবন স্বাধীন বাংলাদেশের পরবর্তী জীবনটি তার চোখের সামনে ছিল না। তাই সে দেশে ফিরে আমার মতো হতচকিয়ে গেল।
এর মধ্যে দেখা গেল চিরাচরিত নিয়মে জঁদরেল পাকিস্তানপন্থিরা বেঁচে যাচ্ছে। নেতাদের সার্টিফিকেট কিনছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। আত্মীয়-স্বজন মুক্তিযোদ্ধা বলে পার পেয়ে যাচ্ছে। ধরা পড়ছে ছা-পোষা রাজাকার। যে পুলিশ তাকে রাজাকার হিসেবে রিক্রুট করেছিল তারাই তাদের রাজাকার বলে গ্রেফতার করছে। পুলিশ দারোগা থাকছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সচিবালয়ে যাদের মন্ত্রণালয়ে পাকিস্তান সরকার চলেছে তাদের যাচাই করা হলো না। কারণ তারা উপরের তলার লোক। অভিজাত, শিক্ষিত। তাদের বেলা সবাই হলো পরিস্থিতির শিকার। আর ৫ টাকার রাজাকার গ্রেফতার হলো নির্বিচারে। এর মধ্যেই শুরু হলো দখল। জঁদরেল নেতা এবং তাদের আত্মীয়রা কল কারখানা থেকে শুরু করে পাকিস্তানিদের বাড়ি ঘর সকল দখল করল। তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বায়তুল মোকাররম থেকে শুরু করে সকল এলাকায় দোকানপাটের মালিক হলো বাঙালি কর্মচারিরা। কারণ অবাঙালি মালিক পলাতক।
এর প্রতিফলন অনিবার্যভাবে পড়ল অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনে। তারা প্রথমে চেয়ে চেয়ে দেখল নেতাদের কাণ্ডকারখানা। নেতাদের মতো তাদেরও হাতিয়ার আছে। তারা সেই হাতিয়ার ব্যবহার শুরু করল। দখল করতে শুরু করলো নারী, গাড়ি আর বাড়ি। এ অভিযোগই করেছিল আমার বাঙালি ছাত্রের অবাঙালি স্ত্রী। এদের সঙ্গে যোগ দিল এক শ্রেণির নতুন মুক্তিযোদ্ধা। এরা অধিকাংশই পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী। তারা ১৬ ডিসেম্বর অস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেল। এদের বলা হতো ষোড়শবাহিনী (Sixteenth Division)। পাড়ায় পাড়ায় এরা হলো বড় মুক্তিযোদ্ধা।
এ পরিস্থিতির একটি চিত্র আছে সেকালের সংবাদপত্রে। তখন প্রতিদিন দৈনিক বাংলায় নিখোঁজ মুক্তিযোদ্ধার ছবি ছাপা হতো। কিছুকাল পরে প্রতিবাদ আসতে শুরু করল। প্রকৃতপক্ষে ওই ছবিগুলো ছিল রাজাকার আলবদরের। ওদের মুক্তিযোদ্ধা বানাবার জন্যে এই ছবি ছাপানো হতো। ওরা ওই ছবি ছাপাবার পর নিরুদ্দেশ জগৎ থেকে ফিরে আসত। আবার যারা ফিরত না তাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজন ফায়দা লুটবার চেষ্টা করত।
