৫. ভিটামাটি ছাড়া প্রতিটি মানুষের পুনর্বাসন ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. সমস্ত বৃহৎশিল্প এবং গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত জাতীয় সম্পদ জাতীয়করণ করে জাতীয়করণলব্ধ উপস্বত্ত্ব ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন এবং পুনর্গঠনে নিয়োজিত করতে হবে।
৭. যুদ্ধবাজ ও মানবতাবিরোধী বন্দি খান সেনাদের ও তাদের সহযোগিদের গণআদালত গঠনের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। বাংলাদেশে অবস্থানকারী পাকিস্তানি তথা পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিক এবং পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাংলাদেশের নাগরিকদের নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা বিধানকল্পে বিশ্বজনমত গঠন করতে হবে।
৮. সকল বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী ও পশ্চিম পাকিস্তানি পুঁজি ও সম্পত্তি বিনা। ক্ষতিপূরণে বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
৯. সকল কর্মক্ষম নাগরিকের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে এবং ভিক্ষাবৃত্তি বেআইনী ঘোষণা করতে হবে। কর্মে অক্ষম সকল নাগরিক এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবার পরিজনদের ভরণ পোষণের সম্পূর্ণ ভার রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।
১০. সামাজিক ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণকল্পে কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শ্রমজীবী মানুষের কার্যকর প্রতিনিধিত্বের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
১১. সামাজিক ন্যায়-নীতির ভিত্তিতে জমির পরিমাণ বেঁধে দিতে হবে এবং উদ্ধৃত্ত জমি গরিব ও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিলি করতে হবে।
আমরা আরো বলেছিলাম শুধুমাত্র বিপ্লবী সরকার গঠন নয়, বিপ্লবী সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যে ইউনিয়ন হতে জাতীয় পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদানকারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমবায়ে গণকমিটি গঠন করতে হবে। এ কমিটিই শরণার্থীদের পুনর্বাসন, ক্ষত্রিস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন সম্পর্কে বিপ্লবী সরকারের নিকট সুপারিশ করবে এবং বিপ্লবী সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে সহযোগিতা করবে।
বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে দেশি ও বিদেশি মালিকানায় সমস্ত বৃহৎ শিল্প সংস্থা রাষ্ট্রায়ত্ত করতে হবে। পূর্বের মতো শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের উদ্যোগে শিল্পসংস্থা গড়ে তুলতে ব্যক্তি মালিকানায় স্থানান্তর করা চলবে না। একদিকে যেমন বেসরকারি উদ্যোগে বৃহৎ শিল্প গঠনের সুযোগ প্রদান ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গঠন একই সঙ্গে চলতে পারে না, অন্যদিকে তেমন রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে গণস্বার্থ বিরোধী কোনো বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রসারের সকল সম্ভাবনার অবলুপ্তি না ঘটলেও প্রকৃত শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে উঠতে পারে না।
আজকে অনেকের ধারণা, স্বাধীনতার পর বিপ্লবী সরকার গঠনের আহ্বান জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) জানিয়েছিল। সে তথ্য সঠিক নয়। ১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর এ ঘোষণা আমরা দিয়েছিলাম। জাসদের জন্য তখনো কারো কল্পনায়ও ছিল না। আমাদের এ ঘোষণা বিশেষ করে ছাপা হয়েছিল দৈনিক বাংলায়।
আমার দ্বিতীয় সমস্যা, চাকরি ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন দেখা গেল। তখন গণবাংলা নামে একটি নতুন দৈনিক প্রকাশিত হতে যাচ্ছিল। দৈনিক বাংলা থেকে অনেক সাংবাদিক সে সংবাদপত্রে যোগ দেয়। অন্যতম সহকারি সম্পাদক জনাব সানাউল্লাহ নূরী গণবাংলার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ফলে দৈনিক বাংলার সহকারি সম্পাদকের একটি পদ শূন্য হয়। ঐ শূন্য পদে আমি নিযুক্ত হই। দীর্ঘদিন পর শেষ হয় আমার সহ-সম্পাদকের পালা। এবার আমি সহকারি সম্পাদক। এর আগে অনেক কলাম লিখে থাকলেও এবার শুরু হলো নিয়মিত কলাম লেখা। কিন্তু সঙ্কট দেখা দিল সাংবাদিক ইউনিয়ন নিয়ে। যে সঙ্কট স্বাধীনতার পরবর্তী দশ বছর আমাকে বিব্রত করেছে।
আমরা অর্থাৎ শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল প্রচারপত্র বিলি করলাম। বললাম বিপ্লবী সরকার গঠনের কথা। কিন্তু জনমনে তেমন ছাপ ফেলতে পারলাম না। সকলের একটি আশা। ভাবছে একটা কিছু হবে। কিন্তু কী হবে কার কোনো ধারণা কারো মাথায় এলো না। সবচেয়ে মুশকিল হলো শত্রু মিত্র চিহ্নিত করা। পৃথিবীর কোনো দেশে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়নি সে সমস্যার সৃষ্টি হলো বাংলাদেশ। মুখ্য হয়ে দেখা দিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের বিপক্ষের শত্রু নিয়ে আলোচনা। এমনটি ৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় ঘটেনি। সকলেই ব্রিটিশের বিপক্ষে ছিল। অনেকেই পাকিস্তান চায়নি। আবার অনেকেই অখণ্ড ভারত পায়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পক্ষ এবং বিপক্ষ তখন বিভাজন হয়নি। একথা সত্য ৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তান উভয় দেশেরই সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ দেশান্তরী হয়েছে। তাদের কষ্টের সীমা ছিল না। তবুও ৪৭ সালের ঘটনার সঙ্গে এই ঘটনার তফাৎ ছিল।
৭১ সালে দেশের লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার ফলে প্রায় কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। বাকি সকলেই তঙ্কালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে গিয়েছিল এবং এদের মধ্যে অধিকাংশই নিয়ত শঙ্কা এবং ভীতির মুখোমুখি হয়েছে। মৃত্যুর প্রহর গুনেছে। তাদের কোথাও বলার সাধ্য বা সুযোগ ছিল না। এদের অনেকের সন্তান হাজার হাজার তরুণ ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। যুদ্ধ করেছে। আবার অনেক স্বজন পূর্ব পাকিস্তান থেকেছে। কেউ বিশ্বাসে, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগিতা করেছে। পাকিস্তান বাহিনী তাদের নির্যাতন চালাবার জন্য গ্রামে গ্রামে রাজাকার, শহরে শহরে আলবদর ও আল শামস সৃষ্টি করেছে। এ কাজে সহযোগিতা করেছে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ একাধিক রাজনৈতিক দল। গ্রামে শান্তি বাহিনী তৈরি করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের রুখবার জন্যে। এই রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করেছে। লুটপাট করেছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে। এদের অনেক আত্মীয় তখন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শত্রু মিত্র শনাক্ত করা কঠিন ছিল। এটা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম ছিল না। এটা ছিল পাকস্তিান থেকে স্বাধীন হবার সংগ্রাম। পাকিস্তান শব্দটির সঙ্গে সাধারণ মুসলমানদের একটা ধর্মীয় অনুভূতির টান ছিল। অনেকে মনে করতো পাকিস্তান ইমানের অঙ্গ। পাকিস্তান আল্লাহর সৃষ্টি। মসজিদের যেমন ইমাম পরিবর্তন করা গেলেও মসজিদ ভাঙা যায় না, তেমনি পাকিস্তানের শাসক পরিবর্তন করা যায় কিন্তু পাকিস্তান ভাঙা যায় না। এ মানসিকতাও গ্রাম গ্রামান্তরে ছিল।
