প্রকৃতপক্ষে ঢাকায় ফিরে আমি হতচকিয়ে গিয়েছিলাম। ৭১ সালে আমি বারবার ঢাকায় এসেছি। সীমান্ত অতিক্রম করেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে গিয়েছি। শরণার্থীদের শিবিরে গিয়েছি। তখন সবকিছু আঁচ করতে পারিনি। শুধু বুঝেছি একটা যুদ্ধ হচ্ছে। এ যুদ্ধে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে। দেশ স্বাধীন করতে না পারলে দেশে ফেরা যাবে না। এ নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার ভারতের মাটিতে। শরণার্থীদের শিবিরে একটি অদ্ভুত মনোভাব দেখেছি। হিন্দুরা স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একথাও ভাবছে, দেশ স্বাধীন হলে হয়তো তারা ভারতের মাটিতেই থেকে যাবে। মুসলমানদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের দেশ স্বাধীন করতেই হবে। সকলেরই চিন্তা দেশ কী করে স্বাধীন হবে? কবে হবে? কারা করবে? কোন বাংলাদেশ আমরা পাব। সেখানে গিয়ে দাঁড়ানো যাবে কি? এ প্রশ্নের মীমাংসা ভারতের মাটিতে হয়নি।
অসংখ্য তরুণ যুদ্ধে গিয়েছে। কেউ প্রাণ দিয়েছে। কেউ প্রাণ দেবার জন্যে বদ্ধপরিকর। কিন্তু ভবিষ্যৎ তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কোন বাংলাদেশে ফিরবে তারা। সকলের সঙ্গে একটি মাত্র চিত্র আছে। চিত্র হচ্ছে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করেছিল। আওয়ামী লীগেরই সরকার গঠন করার কথা। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তান সরকার নির্বাচনের রায় মেনে নেননি। পরিবর্তে ইতিহাসের জঘন্যতম অত্যাচার চালাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে। সকলকে ঘর ছাড়তে হয়েছে। ঘরে থাকা যায় না বলে। কেউ অস্ত্র হাতে নিয়েছে নিজ দেশে থেকে। কেউ ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়েছে। জানতে পেরেছে ভারত সরকার সহযোগিতা করছে। কারও মনে প্রশ্ন জাগেনি ভারত কেন সাহায্য করবে। কেন আমরা ভারত যাব। ভারতের সহযোগিতায় স্বাধীনতা পাওয়ার পর আমাদের অবস্থা কী দাঁড়াবে। কারও মাথায় এমন কোনো চিন্তাই আসেনি। সাধারণ স্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের এটাই ছিল মানসিক অবস্থা। তারা কখনো ভাবতে চেষ্টা করেনি যুদ্ধ পরবর্তীকালে তাদের কী ভূমিকা হবে। হয়তো একমাত্র মুজিব বাহিনী ছাড়া আর কোনো বাহিনীকে তেমনি করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের কিছু উদ্যোগ থাকলেও সাধারণভাবে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা ছিল দলবিচ্ছিন্ন। তাদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল না।
দেশ স্বাধীন হবার পর এ চিত্রটি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকল ঢাকায় ফিরে। কলকাতায় থাকতে শুনেছি ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হবার সপ্তাহখানেক পর স্বাধীন বাংলা সরকারের সদস্যরা ঢাকায় এসেছেন। কেউ নির্দিষ্টভাবে জানে না কোথায় কী হচ্ছে। কেন হচ্ছে। কিভাবে হচ্ছে।
ঢাকায় তখন অস্ত্রের ঝনঝনানি। বড় চুল, কাঁধে এসএলআর হচ্ছে একজন মুক্তিযোদ্ধার ছবি। অনেকের আবার এক মুখ দাড়ি। পাড়ায় পাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। বিভিন্ন ইউনিটের নামে সাইনবোর্ড। কোথাও দাদা গ্রুপ। কোথাও মামা গ্রুপ। এমনি গ্রুপের কোনো হিসাব নেই। মুক্তিযোদ্ধা অর্থ হচ্ছে সমাজের একটি শক্তিশালী ব্যক্তি। সমাজের যা কিছু সে করতে পারে। চাকরি দখল কতে পারে। আমার কাছে সব চিত্রটাই গোলমেলে মনে হতে লাগল। এর মধ্যে একদিন আমার একজন ছাত্রের স্ত্রী আমার কাছে এসে হাজির। মেয়েটি অবাঙালি। আমার ছাত্র বাঙালি। সে বলল, মাস্টার মশাই আমি মেনে নিচ্ছি অবাঙালিরা ভালো নয়। তারা অনেক খারাপ কাজ করেছে। খুন করেছে। ভেবেছিলাম মুক্তিযোদ্ধারা ভালো। এখন দেখছি তাদের চরিত্রও তেমন প্রশংসা করার মতো নয়। বন্দুকের জোরে ওরা আমাদের বাড়ি কেড়ে নিচ্ছে। প্রতিরাতে নিয়ে যাচ্ছে তরুণীদের। মেয়েটির কথা আমার অবিশ্বাস হলো না। বললাম, এতবড় ঘটনার মধ্যে অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এটাই পুরো চিত্র নয়। কিন্তু নিজের মনকে বোঝাতে পারছিলাম না। আমি নয়াপল্টন এলাকায় থাকি। খোঁজ নিয়ে নিজেই জানলাম অনেক বাড়ি হস্তান্তরের কাহিনী।
মনটা বিক্ষিপ্ত। শুধু ভালো লাগছিল তাজউদ্দিন সাহেবের কিছু ঘোষণা। তিনি ঘোষণা করলেন, কারো বেতন দু’হাজার টাকার বেশি হবে না। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কোনো সাহায্য আমরা নেব না। আবার ভেবেছি তাজউদ্দিন সাহেব বুঝে কথা বলছেন কিনা।
আমার সামনে সমস্যা তিনটি–১, দলের রাজনীতি, ২. দৈনিক বাংলায় চাকরি, ৩, সাংবাদিক ইউনিয়ন। দল সম্পর্কে পূর্বেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দল হচ্ছে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল। আমরা দলের পক্ষ থেকে একটি প্রচারপত্র বিলি করেছিলাম ১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর এবং তার ভিত্তিতে সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে। আমরা আমাদের প্রচারপত্রে ১১ দফা কর্মসূচি দিয়েছিলাম। যে কর্মসূচিতে বলা হয়েছিল—
১. মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণপ্রতিষ্ঠানের সমবায়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করতে হবে।
২. সকল পর্যায়ে গণকমিটি গঠন করতে হবে।
৩. শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্যে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
৪. স্বাধীনতা সগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবার এবং যারা মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়েছেন তাঁদের সুস্থ জীবনধারণের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
