সন্ধ্যার দিকে খুলনা পৌঁছলাম। বাসেই ক’জন শ্রমিক আমার হাতে কিছু কাগজ গুঁজে কাগজগুলো খুলনার ড. কাহার সাহেবের কাছে পৌঁছে দিতে বলে। সে কাগজেও সমাজ বদলের আহ্বান। কোনোমতে কাগজগুলো আগে পড়ে মার ঘাটের দিকে ছুটলাম। লক্ষ্য করেছিলাম কাহার সাহেব লোকটি ভীতু এবং সন্ত্রস্ত। মনে হচ্ছিল সে যেন কোনো একটি নিষিদ্ধ কাজ করছে। আমার খটকা লেগেছিল। তা হলে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার শুরুতেই আবার আত্মগোপন করতে হবে নাকি।
স্টিমারে অসম্ভব ভিড়। ভারত থেকে মানুষ ফিরছে দেশে। অসংখ্য বরিশালের যাত্রী। পরে জানলাম ভাড়া দিতে হবে না। পৌঁছাতে ৩৬ ঘণ্টা লেগে গেল। কিন্তু কোথায়। যুদ্ধের পূর্বে সেগুনবাগিচা মরহুম কাজী মোতাহার হোসেন সাহেবের বাড়িতে ছিলাম। যুদ্ধের সময় একবার সেখানে এসে ফিরে গেছি। পরে শুনেছি আমার বইপত্রের কক্ষটি অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে স্থান নেই আমার। বন্ধুরা কে আছে জানি না। স্টিমারে দৈনিক বাংলার সুপারেনটেনডেন্ট রংপুরের নজরুল সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। শুনেছি চাকরিতেও অসুবিধা। পাকিস্তান আমলের দৈনিক পাকিস্তান নাম পাল্টে দৈনিক বাংলা হলো। যুদ্ধের ন’মাস যারা চাকরিতে ছিল না এ সময় শূন্য পদে পদোন্নতি অর্থাৎ যুদ্ধের পূর্বে আমি সিনিয়র সাব-এডিটর ছিলাম সে পদটি ঐ ন’মাসে পদোন্নতি করা হয়েছে। এমনটি ঘটেছিল বার্তা সম্পাদক তোয়াব খানকে নিয়ে। তিনি ন’মাসে স্বাধীন বাংলা বেতারে ছিলেন। ঢাকায় ফিরে দেখলেন তার পদ শূন্য নেই। ফলে অনেক ঝামেলার পর তিনি হলেন নির্বাহী সম্পাদক।
এমন ঘটনা ভিন্নভাবে হলেও পাকিস্তান আমলে আমার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। তখন তোয়াব খান দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা সম্পাদক। জনাব ফজলুল করিম প্রধান সহসম্পাদক। তার পরে আমি এবং গোলামুর রহমান চৌধুরী শিফট ইনচার্জ। এক সময় বেতন বোর্ডের মিটিংয়ে জনাব তোয়াব খান পশ্চিম পাকিস্তান গেলেন। ফজলুল করিম গেলেন লন্ডনে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্যে। প্রশ্ন দেখা দিল পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক কে হবেন। সাধারণ নিয়মে আমারই ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক হওয়ার কথা। কিন্তু তেমনটি ঘটল না। একদিন অন্যতম সহ-সম্পাদক সৈয়দ আব্দুল কাহার আমাকে বললেন, নির্মল দা, আপনাকে কিন্তু দায়িত্ব দেয়া হলো না। দায়িত্ব দেয়া হলো–গোলামুর রহমান চৌধুরীকে। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আহসান আহমেদ আসক গোলামুর রহমান চৌধুরীকে বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব দিলেন। হয়তো হিন্দু বলেই আপনাকে টপকে যাওয়া হলো।
এ ঘটনাকে আমি খুব গুরুত্ব দিলাম না। ভিন্ন কিছু ঘটবে তাও আমি মনে করিনি। শুধু ভেবেছি আমার সহকর্মী গোলামুর রহমান চৌধুরী যদি আমাকে বাদ দিয়ে দায়িত্ব নিতে পারে তাহলে আসক সাহেবের কী দোষ। আমি কাউকে বুঝতে দিলাম না, আমি দায়িত্বে নেই। এমন ভাব করলাম যেন আমিই ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক। এমনকি গোলামুর রহমানের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভিয়েতনাম নিয়ে একটি টেলিগ্রাম বের করলাম। খবরটি ছিল হ্যাঁনয়ে বিমান হামলা বন্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্ট জনসনের নির্দেশ। যদিও সব কাজই গোলামুর রহমান সাহেবই করেছিলেন। তবে অনেকের ইচ্ছা ছিল না এ ধরনের টেলিগ্রাম বের করার।
এ ছিল পাকিস্তান আমলের কথা। বাংলাদেশে এমন অবস্থা হবে তা বুঝতে পারিনি। প্রথম দিন দৈনিক বাংলায় গিয়ে হাজিরা দিয়ে চলে এলাম। কেউ তেমন উচ্চবাচ্য করলেন না। দৈনিক বাংলার সম্পাদক পরিবর্তন হয়েছে। আবুল কালাম শামসুদ্দিন বিদায় নিয়েছেন। সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান। আমি সকলের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম কেউ সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না। তবে কিছু কিছু বন্ধুকে আমি ফিরে আসায় খুব খুশি হতে দেখলাম। এদের মধ্যে আছেন হেদায়েত হোসেন মোরশেদ এবং মেসবাহউজ্জামান। তারা বলল, গণবাংলার নামে একটি নতুন পত্রিকা বের হচ্ছে। আপনাকে বার্তা সম্পদাক হতে হবে। আমি বললাম, না। আমার পেশা রাজনীতি, সাংবাদিকতা নয়। সুতরাং যতদিন চাকরি করি দৈনিক বাংলায় থাকব। বিকেলে আস্তানায় ফিরলাম। আস্তানা হচ্ছে রায়েরবাজার। রায়েরবাজার উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন কায়সার হচ্ছে। আমাদের দলের নেতা। ভারত থেকে ফিরে তাঁর বাসায় উঠেছিলাম। সেই বাসায়ই একদিন ভোরবেলা একটি অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হলাম। এ বাসায় প্রতিদিন এক লোক দুধ দিয়ে যায়। সে হঠাৎ আমাকে বলল, স্যার একটি রেডিও কিনবেন? রেডিওটির দাম সাতশ’ থেকে আটশ’ টাকা। আমি সত্তর টাকা বলেছি। আপনি আশি টাকা হলে নিতে পারেন। রেডিওর মালিক একজন বিহারী। মোহাম্মদপুরে থাকে। তাদের এখন বড্ড ভয় ও অভাব। দুধওয়ালা ওদের দশ হাজার টাকার ফার্নিচার এক হাজার টাকায় কিনেছে।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমি দুধওয়ালাকে বললাম, যারা আটশ’ টাকার রেডিও আশি টাকায় বিক্রি করে তাদের রেডিও বিনা পয়সায় আনলে কী হয়। তুমি আমার নাম করে ঐ বিহারীকে একটি ধমক দাও। তাহলে বিনা পয়সায় ঐ রেডিও দিয়ে দিবে। আমার কথায় দুধওয়ালা উৎসাহিত হলো। এবার আমি বাসার কাজে লোককে ডাকলাম। বললাম-ঐ ব্যাটাকে দড়ি দিয়ে বাঁধো এবং মোহাম্মদপুর থানায় দিয়ে এসো। আমার কথা শুনে লোকটি ছুটে পালিয়ে গেল। ঐ বাসায় থাকতে সে লোক কোনোদিন আমার চোখে পড়েনি।
