একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতে মুজিববাহিনী গঠিত হয়। শোনা গিয়েছিল মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়েছে স্বাধীন বাংলা সরকারের কোনো অনুমতি
নিয়ে। মুজিববাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতারা। আরো শোনা গিয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীন করা ছাড়াও মুজিব বাহিনীর আরো কিছু দায়িত্ব ছিল। সে দায়িত্ব হলো বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর রাজাকার, আলবদর, আল শামস, এবং শান্তি কমিটির সদস্যদের খতম করা। আর একই সঙ্গে বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করা। এ খবর একটি আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল বামপন্থী মহলে। আমি আগরতলা থাকাকালে এক নেতৃস্থানীয় আমলা আমাকে বলেছিলেন, আপনি ভারতের পূর্বাঞ্চলে থাকবেন না। এটা উপদ্রুত এলাকা। আপনার রাজনীতি ভারত সরকারের পছন্দ নয়। গ্রেফতার এড়াতে হলে কোলকাতায় চলে যান।
একথা যে কতটা সত্য তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম আগস্টে দ্বিতীয়বার ভারতে ঢুকবার কালে। আমি এপ্রিলের শেষ দিকে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে ভারত যাই। অর্থ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহের জন্যে জুলাইয়ের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসি। আগস্টের শেষের দিকে আবার ভারতে যাই। তখন ভারতে যাবার সব পথ বন্ধ। ঢাকা থেকে লঞ্চে রায়পুর। রায়পুর থেকে লক্ষ্মীপুর। তারপর বেগমগঞ্জ। বেগমগঞ্জ থেকে গুণবতী হয়ে চৌদ্দগ্রাম দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। কিন্তু বিপাকে পড়ে যাই ত্রিপুরা সীমান্তে গিয়ে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আমাকে আটক করে এবং থানায় নিয়ে জেরা করতে শুরু করে। থানায় প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে-’আপনি আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, বা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য কিনা। আমার পূর্বের লেখায় এ প্রসঙ্গে আমি অবতারণা করেছি। অনেক জবাবদিহির পর যে আমাকে উদয়পুরে পৌঁছাতে হয়েছে, তাও লিখেছি।
আমার নিজের জীবনের এ অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে মুজিব বাহিনী গঠনের খবর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল বামপন্থী মহলে। তাই বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রশ্ন উঠেছিল দেশে ফিরব কোন পথে। সড়ক পথে। সড়ক পথে আদৌ ফেরা নিরাপদ কিনা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়েছিল আমি একা সড়ক পথে বাংলাদেশে ফিরব। আমার কোলকাতার বন্ধুরা আমাকে প্রায় যশোর পৌঁছে দিয়ে গেল। আর যশোর পৌঁছেই একটি পোস্টার আমার চোখে পড়ল। পোস্টারটি মোজাফফর ন্যাপের। পোস্টারে লেখা তিনটি শ্লোগান-গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র। স্লোগান তিনটি দেখে আমি চমকে গেলাম। অথচ স্বাভাবিক নিয়মে এই তিনটি শ্লোগানে আমার আপত্তি থাকার কথা নয়। যদিও ৭১-এর সংগ্রামে এই তিনটি স্লোগান লক্ষ্য ছিল বলে সুনির্দিষ্টভাবে কখনো বলা হয়নি। সে সংগ্রামের লক্ষ্য গণতন্ত্র ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্রের অঙ্গ তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার ধারণা, গণতান্ত্রিক সমাজ কায়েম হলে ঘোষণা দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলতে হয় না। তবে এই ধর্ম নিয়ে এই উপমহাদেশে সমস্যা থাকায় ধর্মনিরপেক্ষতা একটি বিতর্কিত শব্দ। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত উপমহাদেশে অনেক রক্তপাত হয়েছে। তাই এ শব্দটি একান্তভাবে স্পর্শকাতার। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেও ভারতে ধর্মভিত্তিক দাঙ্গা কমানো যায়নি। পাকিস্তানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে গালাগালি দেয়া হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মহীনতা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। তাই আমার মনে হয়েছিল এ স্লোগানটি বাংলাদেশে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে না তো?
আমাদের ৯ মাসের সংগ্রাম সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছায়নি। এ সংগ্রাম নিয়ে বিতর্ক ছিল না তাও বলা যাবে না। এটাও সত্য, একটি গোষ্ঠী এ শ্লোগান নিয়ে আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। ধর্মের নামে লুটতরাজ, রাহাজানি করেছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আমলাদের একটা বড় অংশ জড়িত ছিল। এক শ্রেণির রাজনীতিক আদর্শের নামে এ সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল। ন’মাসের সংগ্রামে তারা নিশ্চিহ্ন হয়নি। মুছে যায়নি তাদের ধ্যান ধারণা। তাই আমার ধারণা পরবর্তীতে এ স্লোগানটি নতুন বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। আমার মতে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবেশ সৃষ্টি করা বাঞ্ছনীয়।
ন্যাপের পোস্টারে সমাজতন্ত্র শব্দটিও আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। আমরা জাতিগতভাবে ১৯৭১ সালের সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। তেমন রাজনৈতিক প্রস্তুতিও ছিল না। সংগ্রামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের কথাও কোনোদিন জোরে সোরে উচ্চারণ করেনি। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে এ সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে, এ কথাও উচ্চারিত হয়নি ৭১-এর সংগ্রাম চলাকালে। আর আমার বিশ্বাস পোস্টারে লিখে দিলেই কোনো শ্লোগান অর্থবহ নয়। তাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। কোন আদর্শে বিশ্বাস না করে সে আদর্শ বাস্তবায়নের কথা বললে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। অথবা আদর্শ পরিণত হয় নিছক ভাওতাবাজিতে। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে এটা স্পষ্ট ছিল, আওয়ামী লীগ কোনো শ্রেণি-সংগ্রামে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল নয় এবং তাদের পক্ষে সমাজতান্ত্রিক সমাজ কায়েম করার কথাও স্বাভাবিক নয়। তবে নিঃসন্দেহে দল হিসেবে ন্যাপের এ স্লোগান দেবার অধিকার আছে। তবুও আমার কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। আমার ভয় ছিল ঘর পোড়া গরুর সিদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাবার কথা।
