এবার কিছুদূরে এগোতেই মুক্তিবাহিনীর কিছু ছেলের সঙ্গে দেখা হলো। তারা আমাকে চিনত। তারা বললো আপনাকে আটক করা হয়েছে শুনে আমরা এসেছি। তারা ক্যাপ্টেনকে ডেকে বলল, কোনোদিন ঢাকা গেলে নির্মল সেনের সঙ্গে দেখা করতে আপনাদের অনুমতি লাগবে। আপনারা কাকে ধরেছেন? কিন্তু এরপরও বিপদ কাটল না। সন্ধ্যার দিকে শান্তিবাজারে পৌঁছলাম। পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। আমাদের পরিচয়পত্র কোনো কাজে এলো না। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর আমাদের ছেড়ে দেয়া হলো। আমি থানার দারোগাকে বললাম, একটি সার্টিফিকেট লিখে দিন। কারণ সারাদিন এই হেনস্তা আদৌ ভালো লাগছে না। দারোগা রাজি না।
থানা থেকে ছাড়া পেলাম। কিন্তু কোথায় যাব? এ অবস্থায় আগরতলা যাওয়া যাবে না। ভাবলাম উদয়পুর যাব। উদয়পুরে ধীরেন দত্ত আছেন। পঞ্চাশের দশকে আমাদের সঙ্গে ঢাকা জেলে ছিলেন। শুনেছি উদয়পুরে তিনি একটি স্কুল দিয়েছেন পিতার নামে। ধীরেন বাবু ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআই-এর লোক। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং ভালো লোক হিসেবে পরিচিত। এই ভেবে উদয়পুরের বাসস্ট্যান্ডে গেলাম। দেখলাম একটি ট্যাক্সি উদয়পুর যাচ্ছে। ড্রাইভার আমাদের অসুবিধা বুঝল। বলল, ধীরেন বাবুকে আমরা চিনি। তাঁর বাসায় আপনাদের আমি পৌঁছে দিতে পারব। কিন্তু তাতেও বিপদ কাটল না। কিছুদূর যেতেই সামরিক বাহিনীর লোক ট্যাক্সি থামাল। বললো ট্যাক্সিতে বাংলাদেশের কেউ থাকলে তাদের নামতে হবে। আমি বললাম, আমি বাংলাদেশের লোক কিন্তু নামব না। যা খুশি করতে পারেন। এবার ড্রাইভার নিজেই নেমে গেল। গিয়ে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কথা বলল। আমাদের আর গাড়ি থেকে নামতে হলো না। গভীর রাতে উদয়পুর গিয়ে পৌঁছালাম। আমাদের দেখে ধীরেন বাবু অবাক হয়ে গেলেন। তার সঙ্গে শেষ দেখা ১৯৫২ সালে ঢাকা জেলে। তারপর দেখা হলো ১৯ বছর পর ১৯৭১ সালে। রাতে ওই বাসায়ই থাকলাম। উদয়পুরে আরএসপির সংগঠন আছে। সকালবেলা ধীরেন বাবু আরএসপির বন্ধুদের খবর দিলেন। এবার বাসা পরিবর্তন করতে হলো। আমরা আরএসপির তল্কালীন শিক্ষক নেতা মোহিত ধরের বাসায় উঠলাম। তখন চারদিকে বৃষ্টি আর বৃষ্টি। এদিকে পথের ক্লান্তিতে স্বপন অসুস্থ হয়ে গেছে। তার জ্বর হয়ে গেল। হাতের তালু ফুলে গেল। শেষ পর্যন্ত তার হাত অপারেশন করতে হলো! তাই বেশ কিছুদিন থাকতে হলো উদয়পুরে। আর বন্ধুদের কথা হচ্ছে আপনাদের আর একা একা পথে ছেড়ে দেয়া যাবে না। কাউকে সঙ্গে করে আগরতলা যেতে হবে। নইলে আবার বিপদে পড়তে পারেন। তাই আগরতলা পৌঁছতে পৌঁছতে আগস্ট মাস কেটে গেল। আর আগরতলা পৌঁছে দেখলাম পুরো পরিস্থিতি পালটে গেছে। সর্বত্রই যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি।
আগরতলা পৌঁছে বাড়ির খবর পেলাম। শুনলাম রাজাকাররা বৃদ্ধ কাকা ও তার ছেলেকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘটনা হচ্ছে যে ছেলেটি কাকাকে ধরেছিল তার জন্ম হয়েছিল কাকারই হাতে। আমার কাকা এবং কাকার ছেলে দুজনেই ডাক্তার। তবে দেশি রাজাকাররা খারাপ ব্যবহার করলেও ভালো ব্যবহার করেছিল বালুচ বাহিনীর লোকেরা। ডাক্তার বলে তাড়াতাড়ি তারা দুজনকেই ছেড়ে দিয়েছিল।
ইতিমধ্যে কোলকাতা থেকে চিঠি লিখেছে কাকার ছোট ছেলে। সে তার স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে পৌঁছে জানতে চেয়েছে যুদ্ধের খরব। আমি তাকে জবাব দিয়েছিলাম এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আর কেউ না গেলেও ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবসে আমি ঢাকায় থাকবই। ভয় নেই।
.
আমার জবানবন্দি আমার জীবনী নয়। তবুও কখনো কখনো জবানবন্দিতে আমার জীবনের ছাপ পড়ছে। তবে তাও সাজানো গোছানো নয়। অনেক ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা থাকছে না। আমার কথা হচ্ছে–জবানবন্দি যেহেতু জীবনী নয়, তাই সর্বক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা থাকবে না।
আমার জবানবন্দির প্রথম পর্ব ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সে পর্বে অনেক কথা বলা হয়ে গেছে। তবে দ্বিতীয় পর্বে সে পর্বেরও কিছু উল্লেখ থাকবে। হয়তো পুনরাবৃত্তি হবে। এ ব্যাপারে আমি নিরূপায়।
প্রথম পর্বের শেষ দিকে আমি কিছু কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছিলাম। সেই ঘটনায় মধ্যে আছে ভারত থেকে আমাদের বাংলাদেশে ফেরার কথা। এখানে আমাদের অর্থ হচ্ছে আওয়ামী লীগ গোষ্ঠীর বাইরে রাজনীতিকদের কথা। ১৯৭১ সালের সংগ্রামে অনেক রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিল। তবে ভারতে তিনটি দলই সরকারিভাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। এই তিনটি দল হচ্ছে–আওয়ামী লীগ, মোজাফফর ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টি। মওলানা ভাসানী স্বাধীন বাংলা সরকারের উপদেষ্টা মনোনীত হন। কিন্তু আমাদের প্রতি ভারত সরকার বা স্বাধীন বাংলা সরকারের তেমন সুনজর ছিল না। আমাদের দলের ছেলেরাই বাংলাদেশ সীমান্তে নদীয়া জেলার গেদেতে প্রথম ভারতের মাটিতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। এই শিবির পরিদর্শনে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন এসেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের শিবির স্বাধীন বাংলার সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ আমাদের অপরাধ ছিল আমরা শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের সদস্য। আর ঐ শিবিরটি পরিচালনা করেছেন ভারতে আমাদের বন্ধুপ্রতিম দল বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল অর্থাৎ আরএসপি। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্ট করে ঐ শিবিরটি আমাদের চালু রাখতে হয়েছিল।
