কেন দেশের কোনো বিপ্লবে এ এমন ঘটনা ঘটছে কিনা। আমি সেই পড়ন্ত বেলায় তাকিয়ে তাকিয়ে সেই হাসি আর কান্না দেখলাম। ওরা কেউ আমাকে চিনত না–আজো কেউ চিনবে না। অথচ আমি সেই দৃশ্যের এক সাক্ষী আজো বেঁচে।
পরদিন বিকেলে খবর এল পথ পরিষ্কার। কিন্তু নিজেদের উদ্যোগেই যেতে হবে। গুণবতী স্টেশনের দক্ষিণে রেললাইন পার হতে হবে। ওই রেললাইনে সন্ধ্যাবেলায় সান্ধ্য আইন জারি। এবার আমরা রওনা হলাম চারজন। আমি, স্বপন এবং কুমিল্লার লালমাইয়ের কাছে মগবাড়ির দু’ভদ্রলোক।
আমরা কিছুদূর যেতেই পিছন থেকে এক বুড়ি ছুটতে ছুটতে এলেন। পরনে সাদী থান। বললেন, বাবা রেললাইনে পাক সেনাবাহিনী। ও পথে যাবে না। আমার সঙ্গে আমাদের বাড়ি চলো।
বুড়ি তার বাড়িতে আমাদের বসিয়ে চলে গেলেন। দশ মিনিট পর ফিরে এলেন। দেখলাম দূর রেল লাইনে একদল ১০/১২ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা পাহারা দিচ্ছে। দেখছে পাকবাহিনী আসছে কিনা। এই কিশোরদের পাহারার মধ্যে দিয়ে আমরা রেল লাইন পার হলাম। বুড়ি বললেন, বাবা জানি না তোমরা কার পুত্র। দিনমানে এ পথে আর লোক পাঠাবে না। বুড়ির সে কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজছে।
কিন্তু বিপদ শেষ হলো না। আমরা কোনো পথ চিনি না। কারো কাছে জিজ্ঞেস করাও বিপজ্জনক। শুনেছি চৌদ্দগ্রামের কাছে সীমান্ত পাড়ি দিতে হবে। ওপারে ভৈরব টিলায় রাতে আশ্রয় মিলতে পারে।
বিপদে পড়ে গেলাম, চৌদ্দগ্রামের কাছে গিয়ে। কাছে একটি স্কুল। ওই স্কুলের পাশে সড়ক। ওই সড়ক দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে উঠতে হবে। তারপর একটি ছোট খাল। ঘোট খাল পার হয়ে কাদামাটির জমি। তারপর ভারতীয় সীমানা।
স্কুলের পাশে যেতেই একদল লোক বলে উঠল উত্তরে দেওয়ান বাড়ি যান। আশ্রয় পাবেন। আমরা দেওয়ানবাড়ির দিকে মোড় নিতেই আর একজন বলে উঠল সাবধান ওদিকে যাবেন না। ওটা রাজাকারদের বাড়ি। ইতোমধ্যে সামনে একটা রিকশা এসে দাঁড়াল। রিকশাওয়ালা বলল, তাড়াতাড়ি সড়কে উঠে খাল পার হয়ে ওপারে যান। দূরে আর্মি দেখা যাচ্ছে।
তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বৃষ্টি পড়ছে। ওই বৃষ্টির মধ্যে কাদামাটিতে ছুটতে ছুটতে এক সময় ভৈরব টিলায় পৌঁছলাম। ভয় কমল। কিন্তু স্বস্তি পেলাম না। আবার বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত। ইতিহাসে এর দৃষ্টান্তের অভাব নেই। বাংলাদেশে তো নেইই।
ভৈরব টিলায় নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। আমরা চারজন–আমি, স্বপন ও কুমিল্লার দু’জন সঙ্গী। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ভৈরব টিলায় নতুন কিছু চালাঘর দেখলাম। ওই চালাঘর তৈরি করেছে বাংলাদেশের শরণার্থীরা। তারা আমাদের রাতে খেতে এবং থাকতে দিতে রাজি হলো। তবে পয়সা দিতে হবে। বাংলাদেশে এ অভিজ্ঞতা ছিল না। পয়সা দিয়ে রাতে খেলাম এবং ভৈরব টিলায় থাকলাম। টিলার অধিবাসীরা জানাল ভোরের দিকে আমাদের টিলা থেকে নেমে একিনপুর যেতে হবে। একিনপুর গেলে আগরতলা যাবার পথ যাওয়া যাবে।
ভোরে একিনপুর গিয়ে আটকে গেলাম। ভারতের সীমান্ত বাহিনী আমাদের তাদের ক্যাম্পে নিয়ে গেল। আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। তাদের প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কোন রাজনৈতিক দল করি। আমাদের জিজ্ঞেস করা হলো, আমরা আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি বা ন্যাপ করি কিনা। তাদের প্রশ্নে মনে হলো, এই তিনটি দলই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। আমি আমার রাজনীতি ও সাংবাদিকতার পরিচয় দিলাম। কিন্তু খুব একটা কাজ হলো না। শুনলাম তারা কর্নেল ভট্টাচার্য নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো আমি বাংলাদেশের কোনো নেতাকে চিনি কিনা। আমি বললাম, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে বামপন্থী নেতা কমরেড মনি সিং এবং তোয়হাসহ সকলকেই আমি চিনি। কিছুক্ষণ পর আমাদের ছেড়ে দেয়া হলো। কিন্তু আমাদের সঙ্গীদের ওখানেই আটকে রাখা হলো।
এবার একিনপুর থেকে চোত্তাখোলার পথে রওনা হলাম। চোত্তাখোলায় আওয়ামী লীগ নেতা খাজা আহম্মদ আছেন। ভাবলাম তাঁর কাছে থেকে একটি পরিচয় নিতে পারলে আর বিপদে পড়ব না। সেদিন আকাশে ছিল মেঘ রৌদ্রের খেলা। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। আবার রোদ উঠছে। পাহাড়ি পথ। কখনো নামছে আবার কখনো উঠছে। চোত্তাখোলায় পৌঁছে খাজা আহম্মদের দেখা পেলাম। তিনি আমাদের পরিচয়পত্র দিলেন। এবার আমরা রাজনগরের দিকে রওনা হলাম। রাজনগরে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প আছে। রাজনগর পৌঁছাবার আগে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা আমাদের আটক করল। খাজা আহম্মদের পরিচিতি পত্র গ্রাহ্যই করল না।
আমার ভয় হলো স্বপনকে নিয়ে। শুনেছি এখন ত্রিপুরায় পাকিস্তানি এজেন্ট গ্রেফতার করা হচ্ছে। আমি ভাবলাম শত হলেও আমার বাংলায় নাম। আমি কোনোমতে এড়িয়ে যেতে পারব। কিন্তু স্বপনের প্রকৃত নাম মোসাদ্দেক। এই আরবি নামটি জানতে পারলে স্বপনকে যে পাকিস্তানি এজেন্ট হিসেবে ধরা হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। স্বপনকে নোয়াখালীর বাড়ি থেকে যখন নিয়ে আসি তখন সে বাড়ির কেউই আমার প্রস্তাবে রাজি ছিল না। এখন স্বপনের কিছু হলে আমি তাদের কী জবাব দেবো। তাই ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর লোকদের আমি শুধু হাত পা ধরতে বাকি রেখেছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে স্বপনকে বাঁচাতে হবে। কিছুক্ষণ পর আমাদের ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ক্যাম্পের এলাকায় নিয়ে যাওয়া হলো। আমাদের মাঠের মাঝখানে দাঁড় করানো হলো। চারদিকে ঘিরে থাকল সামরিক বাহিনীর লোক। এ পরিবেশেও ভারতীয় বাহিনীর একজন জোয়ান অদ্ভুত একটা কথা বলল। তার কথা হচ্ছে ইধার তো হিন্দু-মুসলমান ফারাক নেহি হায়। তাহলে তোমাকে আটক করল কেন? আমার তখন পরনে লুঙ্গি, গায়ে হাওয়াই শার্ট এবং মুখভর্তি দাড়ি। ঘন্টাখানেক পর একজন ক্যাপ্টেন ছুটতে ছুটতে এল। সে বলল, আমরা খুবই দুঃখিত। তুমি বাংলাদেশে খুবই পরিচিত একজন ব্যক্তি। তোমরা চলে যেতে পার।
