শহিদুল্লাহ ভোরের দিক কুমিল্লা রওনা হয়ে গেলো। অনেক রাতে ফিরে এল হাঁপাতে হাঁপাতে। বললো, স্যার বড় বিপদ। নিজেই ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় বাসে নামলে শহিদুল্লাহসহ আরো কয়েকজন যাত্রীকে সামরিক বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। প্রায় বিকেল পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের হাঁটু এবং কনুই পরীক্ষা করে দেখে ক্রলিং-এর কোনো দাগ আছে কিনা। শহিদুল্লাহ বেঁচে যায় কারণ পকেটে একটি আইডেনটিকার্ড ছিল। ওই কার্ডে লেখা ছিল সে একটি ইলেট্রিক দোকানের ম্যানেজার। শহিদুল্লাহর বক্তব্য ছিল তার দোকানের কর্মচারীরা গ্রামে পালিয়ে গেছে। সে তাদের ফিরিয়ে নেবার জন্যে গ্রামে যাচ্ছিল। কথায় কথায় জোহরের নামাজের সময় হয়ে যায়। শহিদুল্লাহ কৌশল করে নামাজ পড়বার জন্যে সেনাবাহিনীর কাছে একটি টুপি চায়। এতে সেনাবাহিনীর বিশ্বাস জন্মে যে শহিদুল্লাহ মুক্তিবাহিনীর লোক নয়। নামাজ পড়ার পরপরই অন্য সবাইকে রেখে সেনাবাহিনী শহিদুল্লাহকে ছেড়ে দেয়। তাকে একটি টুপি উপহার দেয়। শহিদুল্লাহ ঢাকায় ফিরে এসে বলে এখন আর ঢাকায় এভাবে থাকা নিরাপদ নয়। যে কোনো উপায়ে হোক আমাদের সীমান্ত পাড়ি দিতে হবে।
কিন্তু কোন পথে যাবো। ঠিক করলাম ১৪ আগস্ট ঢাকা ছেড়ে যাবো।১৪ আগস্ট পাকিস্তান দিবস। সকলে নানা অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকবে। ওই দিন তেমন কেউ খেয়াল করবে না। ১৪ আগস্ট আমি আর শফি নোয়াখালীর রায়পুরের লঞ্চে উঠলাম। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে ঢাকা থেকে রায়পুর, রায়পুর থেকে লক্ষ্মীপুর, লক্ষ্মীপুর থেকে চৌমুহনী হয়ে আমাদের অন্যতম নেতা রুহুল আমিন কায়সারের বাড়ি যাব। তার বাড়ি বেগমগঞ্জ থানার হোসেনপুর। ওখানে আমাদের ছাত্র সংগঠন সমাজবাদী ছাত্র জোটের কিছু সদস্য আছে। তাদের নিয়ে আমি আগরতলা চলে যাব। শফি আমাকে হোসেনপুরে পৌঁছে দিয়ে ঢাকা চলে গেল। শফি হোটেল পূর্বাণীতে কাজ করে আমাদের দলের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু আমাদের হোসেনপুর পৌঁছা খুব সহজ হলো না। ঢাকা থেকে লঞ্চে অসম্ভব ভিড়। রায়পুরের নদীতে দেখলাম অসংখ্য লাশ ভাসছে। রায়পুর নেমে দেখলাম সকলই যেন পাকিস্তানি। প্রায় সকলের বুকে লাগানো পাকিস্তানি পতাকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাহারা দিচ্ছে। মনে হলো সবাই মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্র। তারা সকলের পরিচয় জিজ্ঞেস করছে। আমি সামনে হাঁটছি। আমার পেছনে শহিদুল্লাহ। তার হাতে একটি কালো ব্যাগ। পথে একটি মাদ্রাসার ছাত্র আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করল। আমার দাড়ি এবং লুঙ্গি আমাকে বাঁচিয়ে দিল। প্রায় চারদিক থেকে প্রশ্ন উঠল এই হুজুরকে নিয়ে হইচই কেন হচ্ছে।
আমরা রায়পুর থেকে লক্ষ্মীপুর এলাম। লক্ষ্মীপুর থেকে বাসে চৌমুহনী যেতে হবে। আমাদের বাসের যাত্রী প্রায় সকলেই রাজাকার। শফি বলল, দাদা, আপনি আদৌ কথা বলবেন না। আপনার কথায় পশ্চিমবঙ্গের টান আছে। আপনি কথা বললে বিপদে পড়ে যাবেন। আমি চুপচাপ থাকলাম। চৌমুহনী পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল।
এবার আমরা কোথায় যাব। আমরা হোসেনপুর চিনি না। সন্ধ্যা থেকে নাকি চৌমুহনীতে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়।
একজন যাত্রী বলল, আপনারা মসজিদে গিয়ে রাতটা কাটান। ভোরবেলা চলে যাবেন। আমি বললাম, প্রস্তাবটি ভালো। কিন্তু ভোরে ফজরের নামাজের সময় যখন আমি নামাজ পড়ব না তখন সবকিছু ফাঁস হয়ে যাবে। তাই চলো আমরা ভিন্ন পথ ধরি।
কিছু দূর যেতেই আর এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা। তার চোখেমুখে সন্দেহ। বললো, নিশ্চয়ই আপনারা ভিনদেশী। বলল, আপনাদের কোনো অসুবিধা নেই। সোজা এগিয়ে গেলে মাঝে একটু পানি বাধবে। ওই পানি পার হলেই একটা বাড়ি আছে। ওই বাড়িতে আপনারা আশ্রয় পাবেন। আমরা সরল বিশ্বাসে ওই ভদ্রলোকের কথা শুনে সামনে এগোলাম। কিছুদূর যেতেই পেছন থেকে এক ভভদ্রলোক চিৎকার করতে করতে এলেন। তিনি বললেন, কোথায় যাচ্ছেন? ওটা তো রাজাকারের বাড়ি। ওখানে আপনাদের নিয়ে শেষ করে ফেলবে। আমি নাটেশ্বর যাচ্ছি। পানি ঝাঁপিয়ে আমার সঙ্গে যেতে হবে। নাটেশ্বর গিয়ে নৌকা পেলে আপনাদের হোসেনপুর পাঠিয়ে দেব।
সেদিন সন্ধ্যায় কেন যে ওই ভভদ্রলোককে বিশ্বাস করেছিলাম তা আজ আর মনে নেই। আমি আর শফি তার সঙ্গে পানি ঝাঁপিয়ে নাটেশ্বর পৌঁছলাম। নাটেশ্বরে নৌকা পেলাম। হোসেনপুরে পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে গেল।
কিন্তু এবার কী করে সীমান্ত পাড়ি দেব। এবার নতুন সঙ্গী নিতে হবে। হোসেনপুর থেকে যেতে হবে গুণবতীর কাছে সাতবাড়িয়া আটগাঁও। ওখানে থাকতে হবে। খোঁজ নিতে হবে গুণবতী রেলস্টেশনের কাছাকাছি পাকিস্তান বাহিনী আছে কিনা।
দীর্ঘদিন পরের কথা। আজ অনেক কিছু মনে নেই। এক তরুণের কথা মনে আছে। নাম রুহুল আমিন। ডাক নাম পচা। পচা নোয়াখালীর ভাষায় বড্ড তাড়াতাড়ি কথা বলে। বারবার বলে, দিন রাত তার পার্টি আসছে। সকল পার্টিকে পার করতে হবে। সকল পার্টিই ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসছে। যতদূর মনে আছে সীমান্তে যাবার কালে উঠেছিলাম বনি আমিনদের বাড়ি। পরে আর কোনোদিন তার খোঁজ নিইনি। শুনেছি পচা যুদ্ধে মারা গেছে।
তবে আমার যাওয়া তেমন সহজ ছিল না। আমার সঙ্গে যাবে রুহুল আমিন কায়সারের বড় ভাইয়ের ছেলে স্বপন। বর্তমানে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোসাদ্দেক হোসেন স্বপন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কিন্তু সমগ্র বাড়ি অপ্রসন্ন। কেউ চাচ্ছে না স্বপন আমার সঙ্গে যাক। আর কেউই জানত না যে আমি ওই বাড়িতে গিয়ে আগস্ট মাসে হাজির হতে পারি। কিন্তু সে আমার সঙ্গেই যাবে। আমরা প্রথমবার সীমান্তে গিয়ে ফিরে এলাম। সীমান্তে পাকবাহিনী মোতায়েন। স্বপনদের বাড়ির লোক খুশি। তাদের ধারণা আমাদের বুঝি যাওয়া হচ্ছে না। আমাদের যেতেই হবে। তবে দ্বিতীয় দিন গিয়েও আটকে গেলাম। সাতবাড়িয়ায় একটি ঘরে অপেক্ষা করলাম। কারণ পথ পরিষ্কার নয়। সিদ্ধান্ত হলো দূর গ্রামের নিরাপদ এলাকায় ঘুরতে যাব। গ্রামের নাম ডুমুরিয়া। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ডৌবা। বিকেলের দিকে সে গ্রামে দেখি অবাক কাণ্ড। একদল তরুণকে বিদায় সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে। ওরা মুক্তিবাহিনীতে যাবে। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্যে দলের পর দল তরুণ আসছে। সকলে নির্বাচিত হচ্ছে না। যারা নির্বাচিত হচ্ছে তাদের মুখে হাসি। যারা সুযোগ পাচ্ছে না তারা কাঁদছে। জানি
