স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় না আসায় সমালোচনার ঝড় উঠল। কড়া মন্তব্য করলো কোলকাতার ইংরেজি দৈনিক দি স্টেটসম্যান। যতদূর মনে আছে দেশ স্বাধীন হওয়ার ৯ দিন পর ২৫ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় ফিরে এল।
আমি তখনো কলকাতায়। আগরতলার বন্ধুরা বাংলাদেশে ফিরে গেছে। ফিরে গেছে উত্তরবঙ্গের কমরেডরা। কিন্তু সমস্যার দেখা দিয়েছে পরিচিত নেতাদের নিয়ে। কলকাতায় খবর হচ্ছে, একটি বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে মুজিব বাহিনী সৃষ্টি হয়েছে। এদের প্রথম কাজ হবে রাজাকার ও শান্তিবাহিনীর লোকদের নিঃশেষ করা। আর দ্বিতীয় কাজ হবে বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করা। তাই অনেকেরই ধারণা সড়ক পথে আমাদের বাংলাদেশ আসা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নেতাদের সতর্ক হতে হবে। সম্ভব হলে আসতে হবে বিমানে। কিন্তু ইচ্ছে হলেই বিমানের টিকেট পাওয়া সম্ভব নয়। স্বাভাবিক কারণেই তখন বিমানের টিকেট নিয়ে সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। সবশেষে সিদ্ধান্ত হলো আমি সড়ক পথেই যাব। আমার গায়ে হয়তো কেউ হাত দেবে না। অন্যসব নেতাদের ঢাকায় আসতে হবে বিমানে।
কিন্তু কী করবো ঢাকায় গিয়ে? আমরা মুসলিম লীগ নেতাদের চিনতাম। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও চিনি। এদের সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা আছে। নতুন কোনো কিছু করতে না পারলে ৯ মাসের সংগ্রামই অর্থহীন হয়ে যাবে। তাই সিদ্ধান্ত হলো–ঢাকায় ফিরে সংবাদ সম্মেলন করতে হবে। একাত্তরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলকে নিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠনের দাবি জানাতে হবে। সুস্পষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে সরকার গঠন করতে হবে। আর আমাদের এ প্রস্তাব গৃহীত না হলে, এ কর্মসূচিতে আন্দোলন করতে হবে।
কলকাতায় রাজনৈতিক বন্ধুদের বললাম–আপনাদেরও সতর্ক হতে হবে। আমরা দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিলাম। আমরা এখন ভারতীয় উপনিবেশ হতে চাই না। আপনাদের দাবি তুলতে হবে-বাংলাদেশ থেকে মাড়োয়ারি ও মহাজন হাত গোটাও। বাংলাদেশে মাড়োয়ারি ও মহাজনদের তাণ্ডব শুরু হলে আর এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। কারণ আমরা ৯ মাস কঠিন সংগ্রাম করেছি সত্য। কিন্তু সে সংগ্রামে সমাজ পাল্টায়নি। আমরা বামপন্থীরা সফল হইনি। আর আমাদের সফল হওয়ার কথা ছিল না। তাই সে পুরনো সমাজটাকে নিয়েই নতুন সংগ্রাম শুরু করতে হবে।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আমি সড়ক পথে কলকাতা ছেড়ে এলাম। আসার আগে আত্মীয়-স্বজন কারো সাথে তেমন দেখা হয়নি। মন আদৌ ভালো ছিল না। বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে কোনো কিছু ভাবতে পারছিলাম না। কলকাতার বন্ধুরা সকলেই খুশি। সবার ধারণা আমারও খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু আমি খুশি হতে পারিনি। অনেকেই আমার সাথে সীমান্ত পর্যন্ত এলো। আমি সীমান্তে পৌঁছে বাসে করে খুলনা পৌঁছলাম। তারপর স্টিমার। ওই স্টিমারেই দেড় দিন বসে ঢাকা। স্টিমারে অসংখ্য মানুষ। প্রায় সবাই ভারত থেকে ফিরছে। তাদের অনেকের মুখেই হাসি। কিন্তু কারো সাথে আমার কথা জমল না। এমনি করে ঢাকায় পৌঁছলাম।
কলকাতায় ২৩ বছর পর বড় বোনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল জুন মাসে। তিনি প্রথম আমাকে চিনতে পারেননি। মাত্র কিছুদিন আগে তাঁর মেঝ ছেলের বিয়ে হয়েছে বরিশালের গৌরনদী থানার মাহিলারা গ্রামে। বিয়ের পরপরই শুরু হয়েছে ৭১-এর সংগ্রাম। দিদির দাবি হচ্ছে তুমি যখন বাংলাদেশেই ফিরছ তখন এই পরিবারের খবর নিয়ে আসতে হবে। আমি মনে মনে হাসছিলাম। ১৯৭১ সালের জুন মাস। আমাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করতে হবে। অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আবার সকলের খবরও নিতে হবে।
নিজের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া। এপ্রিল মাসে বাড়ি ছেড়েছি। বাড়িতে যারা আছেন তারা প্রায় সবাই বৃদ্ধ। দুই ভাই, তাদের স্ত্রী, এককালের খুব বড় বাড়ি। কিন্তু একালের ছোট সংসার। এপ্রিলের বাড়ি ছাড়ার সময় বলে এসেছিলাম কেউ দেশ ছেড়ে যাবেন না। তারপর তিন মাস কেটে গেছে। সঠিক কোনো খবর জানি না। বিদেশি খবরে শুনেছি এলাকাটি তখনো মোটামুটি নিরাপদ। স্থানীয়ভাবে মুক্তিবাহিনী গড়ে উঠেছে।
তবু মনে হলো বাড়ির একটা খোঁজ নেয়া দরকার। শহিদুল্লাহকে বললাম, তুমি মাহিলারা হয়ে কোটালীপাড়া চলে যাবে। যে কোনো উপায় থোক বাড়ির খবর নিয়ে ঢাকায় পৌঁছবে। শহিদুল্লাহর কোনো ব্যাপারে আপত্তি ছিল না। শহিদুল্লাহ ঢাকা থেকে বরিশাল চলে গেল। শহিদুল্লাহর ফিরতে সপ্তাহখানেক হয়ে গেল। তার খবর হচ্ছে ঘাঘর বন্দর পুড়ে গেছে। আমাদের বাড়িতে তেমন ক্ষতি হয়নি। এক কাকা এবং এক ভাই ভারতে চলে গেছে এবং অন্য সকলে এখনো নিরাপদ আছে। কিন্তু শহিদুল্লাহ কিছুতেই মাহিলারা ঢুকতে পারেনি। বরিশাল থেকে বাটাজোড়, মাহিলারা, গৌরনদী হয়ে মাদারীপুর পর্যন্ত পাকা সড়ক। এ সড়কে সারাদিন সামরিক বাহিনীর গাড়ি চলাচল করছে। শহিদুল্লাহ মাহিলারা গিয়েছিল। কিন্তু কোনো হিন্দু বাড়ির খবর জিজ্ঞেস করার সাহস তার হয়নি। তার ধারণা সকলেই বাড়ি ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।
এবার শহিদুল্লাহর ঢাকা থেকে কুমিল্লা যাবার পালা। কুমিল্লা বাগিচা গাঁওয়ে অতীন রায়ের বাড়ি। আগেই লিখেছি অগ্নিযুগের বিপ্লবী অতীন রায় দু’বার কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। ২৬ মার্চ তাঁর একমাত্র পুত্র অসীমকে পাকিস্তান বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। অতীন দা আগরতলা চলে গেছেন। বাড়িতে একমাত্র পুত্রবধু অজন্তা। অজন্তাকে পাহারা দিচ্ছে পাকিস্তান বাহিনী। কখনো কখনো পাশের এক অ্যাডভোকেটের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে। ঢাকায় শুনেছি অজন্তা নাকি তার স্বামীর উদ্ধারের জন্যে কুমিল্লা আদালতে মামলা দায়ের করেছে। শুনে আমি অবাক হয়েছি। তবুও ভেবেছি যে কোনো উপায়ে হোক অজন্তাকে আগরতলা নিয়ে যেতে হবে এবং এ জন্যে শহিদুল্লাহকে কুমিল্লা পাঠালাম।
