দেশ বিভাগের ফলে ভারত ও পাকিস্তানের অসংখ্য পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমিও তার শিকার ছিলাম। এখন কোটালীপাড়ায় আছি আমরা একটি ভগ্নাংশ মাত্র। আমাদের বিভাগপূর্ব কালের যৌথ পরিবার এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা ভারতে। দেশ বিভাগের এক বছরের মধ্যে আমি গ্রেফতার হয়ে যাই। জেলখানা থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় ৫ বছর। বাড়ি ফিরে দেখলাম আমার এক কাকা ছাড়া আর সবাই দেশান্তরে। বাড়িতে ফিরলাম কিন্তু মায়ের সাথে দেখা হলো না। মা দেশান্তরী। মায়ের সাথে দেখা হলো ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর। দেশভাগ হওয়ার ২৩ বছর পর বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর।
বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয়নি। তিনি থাকেন মধ্য প্রদেশে। বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হলো ১৯৭৮ সালে। ত্রিশ বছর পর। এ ঘটনার উল্লেখ করে আমি বলেছিলাম যারা দেশ বিভাগের শিকার হননি, তাঁরা এ মর্মান্তিক জ্বালা বুঝতে পারবেন না। তাঁরা বুঝতে পারবেন না ছিঁড়ে যাওয়া নাড়ির বন্ধন। বছর তিনেক আগে বড় ভাইকে দেখে এসেছিলাম। ভারতের মধ্যপ্রদেশের বিলাসপুরে। একটি দেশের রাজনৈতিক বিভাজন একজন মানুষকে কিভাবে শেষ করে দিতে পারে আমার বড় ভাই তার প্রতিকৃতি।
আমার বড় ভাই কল্লোল যুগের শিল্পী। সেকালের প্রখ্যাত হাতে লেখা পত্রিকা ঝরণার সম্পাদক। এ ঝরণা ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রিয় পত্রিকা। বড় ভাইয়ের সমসাময়িক হচ্ছেন-বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রণব রায়, কমল দাশগুপ্ত, গিরীন চক্রবর্তী, অখিল নিয়োগী, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, আমাদের পল্লীকবি জসিমউদদীন, রাধারাণী, নরেন্দ্র দেব প্রমুখ। তিনি ঘনিষ্ঠ ছিলেন দেশ সম্পাদক সাগরময় ঘোষের সঙ্গে।
কিন্তু সব কিছু শেষ হয়ে যায় দেশ ভাগের সঙ্গে সঙ্গে। জীবিকার সন্ধানে যেতে হয় মধ্যপ্রদেশের কয়লাখনিতে। আত্মীয়-স্বজনহীন পরিবেশে এক মর্মান্তিক জ্বালা অবসর জীবনের। তার সব আছে, কিন্তু কিছু নেই। কথায় কথায় স্মৃতিচারণ। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর কাহিনী, নরেন্দ্র দেব ও রাধারানীর বিয়ের কাহিনী, নবনীতার কাছে চিঠি লেখার কাহিনী। তিনি অবসর জীবনটা যেন কাটাতে চাচ্ছেন স্মৃতির অন্তরালে। কোথায় বাংলাদেশে বাড়ি ছিল। কোথায় কোনো গাছ ছিল। কোন সড়কের পাশে বাড়ি ছিল। এটাই যেন জীবনের একমাত্র চর্চা। তার এই স্মৃতির মধ্যে ভারত নেই। আমার বড় ভাই শিশির সেনগুপ্ত বাঁচতে চেয়েছেন বাংলাদেশের স্মৃতি নিয়ে। কিন্তু ১৯৪৮ সালের পর ফিরতে পারেননি উপমহাদেশের এ অংশে।
এবার নিজের কাহিনী নিয়ে লিখছি। এ লেখার একটা পটভূমি আছে। বড় ভাইয়ের কথা উল্লেখ করেছি। জানতাম না, তার সাথে আমার আর দেখা হবে না। দীর্ঘদিন পাকিস্তান সরকার পাসপোর্ট দেয়নি আমাকে। দেশ স্বাধীন হবার পর ভারত সরকার ভিসা দেয়নি সাত বছর। সে পর্যায় কাটিয়ে উঠে সাম্প্রতিককালে মাঝে মাঝে ভারত যেতে পারতাম। তবে সব সময়ই ভয় ছিল কখন সে সুযোগ হারাই। আমার কাছে সর্বশেষ খবর হচ্ছে বড় ভাই মারা গেছেন ২১ সেপ্টেম্বর। খবরটা আমার কাছে বিলম্বে পৌঁছেছে। তখন আমার কিছু করার ছিল না।
এ কথাগুলো একটা বিশেষ কারণে আমি লিখছি। আমাদের দেশে অনেক বিহারী আছে। ওরা এক সময় ভারত থেকে এসেছিল। জীবন জীবিকার সন্ধানে এসেছিল পাকিস্তানে। সে পাকিস্তান নেই। কিন্তু বিহারীরা আছে। ওরা বাংলাদেশে আছে। জেনেভা ক্যাম্পে। ওরা পাকিস্তানে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তান তাদের নিচ্ছে না। ওরা বাংলাদেশে থাকছে কিন্তু ওরা বাংলাদেশের নাগরিক নয়। বাংলাদেশ ওদের রাখতে চাচ্ছে না। পাকিস্তান ওদের নিচ্ছে না। ওরা না ঘাটকা, না ঘরকা। ভারতবর্ষ ভাগের ৬০ বছর চলে গেল। ওদের ঠিকানা ঠিক হলো না। পাকিস্তানের করাচিতেও এমন এক শ্রেণির মোহাজের আছে। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকার জন্যে তাদের সংগ্রাম করতে হয়। পৃথিবীতে ওদের কোনো নিজস্ব দেশ নেই। আমার ধারণা আমার ভাইয়েরও নিজস্ব কোনো দেশ ছিল না। ভারত নামক একটি দেশে থাকতেন। পশ্চিমবাংলা থেকে অনেক দূরে। নিজের ভাষায় কথা বলা যেত না। তাই বেঁচে থাকতে চাইতেন স্মৃতিতে। কিন্তু স্মৃতি কখনো ঠিকানা হয় না। স্মৃতি রোমন্থন করা যায়। কিন্তু স্মৃতি ভিত্তি করে বেঁচে থাকা যায় না। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায়। আমার ভাইও তেমন করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন। বেঁচে ছিলেন না দীর্ঘদিন ধরে। সে প্রেক্ষিতে আমার একটা অনুরোধ আছে। অনুরোধ হচ্ছে, যদি কোনো সময় কেউ ঢাকার মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পের কাছে যান, যদি কেউ সৈয়দপুর বা পার্বতীপুর যান। তখন এ মানুষগুলোর জন্যে একটু ভাববেন। যারা আমাদের ভাষায় কথা বলে না কিন্তু ওদের নিজেদের ভাষায় কথা বলার দেশ ছিল, বসতবাটি ছিল। ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকার ছিল। ওরা সব কিছু হারিয়েছে। একটি দেশ রাজনৈতিকভাবে বিভাজনের জন্যে।
মায়ের সাথে দেখা করে কোলকাতায় ফিরে দেখলাম নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তখনো ভারতের মাটিতে। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ঢাকায় পৌঁছেনি। চারদিকে এক অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তা। বোঝা যাচ্ছে সবকিছু ঠিক নেই। যুদ্ধের প্রেক্ষিতে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেও যুদ্ধ শেষেই সে ঐক্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভারতের মাটিতে তাজউদ্দিন প্রধানমন্ত্রী থাকলেও বাংলাদেশের মাটিতে তাকে অনেক সঙ্কট মোকাবেলা করতে হবে।
