বাসার সামনের ভিড় ঠেলে আমি এক সময় ঘরে ঢুকে গেলাম। আস্তে আস্তে মা আমার দিকে এগিয়ে এলেন। মা‘র চেহারা তেমন বদলায়নি। সবাই চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। কেউ ভাবেনি তাদের সাথে আমার আর কোনোদিন দেখা হবে। কেউ জানত না বাংলাদেশের সৃষ্টি হবে। সবারই ধারণা পাকিস্তান সরকার কোনোদিন আমাকে পাসপোর্ট দেবে না। সুতরাং এ জীবনে কারো সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই–এ বিষয়ে সবাই নিশ্চিত ছিল।
মা বললেন, তোর চেহারাটা খারাপ হয়ে গেছে। আমি বললাম, তুমি বুঝলে কী করে। ১৯৪৮ সালে তুমি আমাকে শেষ দেখেছ। তখন আমার দাড়ি গোফ গজায়নি। এখন আমার মুখভর্তি দাড়ি। পরনে পাজামা পাঞ্জাবি। আমার সব কিছু পাল্টে গেছে। মা হঠাৎ আমার পকেটে হাত দিলেন। আমি বললাম, পকেটে হাত দিচ্ছ কেন? মা বললেন, এক সময় তোর রুমালটা খুব অপরিষ্কার থাকত। তাই দেখলাম তোর রুমালের অবস্থা কী। আমি বললাম–সে যুগ কেটে গেছে। তখন তোমাদের সাথে থাকতাম। স্কুল কলেজে পড়তাম। তারপর ২৩ বছর কেটে গেছে। এই দীর্ঘদিন একান্তই একা জীবন কাটিয়েছি। কখনো জেলে, কখনো আত্মগোপন করে, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে। এখন আমি স্বাবলম্বী। নিজের কাজ নিজে করতে হয়।
তারপর রাত বাড়তে থাকল। আমাদের কথা তেমন জমল না। ফেলে আসা ২৩ বছরের কথা যেন হারিয়ে গেল। সেদিন অনেক কথা বলার ছিল। মনে হচ্ছিল যেন কেউ কোনো কথা স্মরণ করতে পারছি না। সব কথা ছিল আবেগের, দুঃখ এবং বেদনার। কোনো কথাই সেদিন সুস্পষ্ট রূপে বলা হলো না। শুধু এক সময় মা জিজ্ঞেস করলেন-কবে যাবি? কিছুদিন থাকবি তো? ২৩ বছর পর কোলকাতায় এলি। কিন্তু আমাদের সাথে দেখা করলি না। এখন কিছুদিন থেকে যা। শরীরটা ভালো হোক। তারপর বাংলাদেশে যাবি। আমরা তোকে বাংলাদেশে যেতে বাধা দেব না।
আমি বললাম, আমি পরশু চলে যাব। কোলকাতায় কয়েকদিন থাকব। রাজনৈতিক বন্ধুদের সাথে আলাপ করব। তারপর দেশে ফিরে যাবো। আমার কথা শুনে সবাই যেন অবাক বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ কোনো কথা বলল না। অনুরোধ জানাল না একটি দিনও বেশি থাকার জন্যে। মা জানতেন, তার এ ছেলেটি শৈশব থেকেই কারো কথা শুনতে অভ্যস্ত নয়। কোনো অনুরোধই তাকে ঠেকাতে পারবে না। সেদিন আমার যে আদৌ খারাপ লাগেনি তা নয়। কিছুটা দুঃখও পেয়েছিলাম। ভাবছিলাম নিজেকে এমন করে তৈরি করেছি যে আমাকে দ্বিতীয়বার কেউ কোনো অনুরোধও করবে না। কখনো কখনো ইচ্ছে থাকলেও আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার সাধ্য থাকে না।
দু’দিন পরে দুপুরের দিকে আবার আসানসোল স্টেশনে এলাম। বাসায় সকলেই চুপচাপ। মা বললেন, বাড়ি পৌঁছে চিঠি দিস। স্টেশনে আমাকে তুলে দিতে এল আমার ছোট ভাই। সে বলল, ঢাকায় ফিরে চিঠি লিখবেন। তার এই ঢাকা শব্দটি ট্রেনের কক্ষে একটি অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করল। সকল যাত্রী তখন আমার দিকে তাকাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন, ঢাকা যাচ্ছে এ লোকটি কে? সকলেরই তখন কথা বলার পালা। পাশে এক ভভদ্রলোক বসেছিলেন। তার পাশে ২২/২৩ বছরের এক তরুণী। তাদের কৌতূহলের শেষ নেই। তরুণীর পিতার বাড়ি বরিশাল জেলায়। বরিশালে স্টিমারে কাজ করতেন তার বাবা। ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় তার বাবা নিহত হন। তরুণীর বয়স তখন দেড় বছর। সেই দেড় বছর বয়স থেকেই সে দেশ ছাড়া। বাংলাদেশের সাথে তার পরিচয় ভুগোলের মানচিত্রে। আর ৭১-এর যুদ্ধে। তাই তার চরম কৌতূহল বাংলাদেশ ও বরিশাল সম্পর্কে। ট্রেনের সমগ্র কক্ষের সকলের কৌতূহল হলো আমাকে নিয়ে। আমার মা আসানসোলে থাকে। কিন্তু আমি ঢাকায় থাকি কেন। কিভাবে আছি ঢাকায়। ঢাকায় ফিরে নতুন বিপদ আসবে না তো?
সেদিন ট্রেনের কক্ষে এ কথার জবাব দিতে পারিনি। তবে কলকাতায় পৌঁছে মনে হলো যুদ্ধে আমরা জিতেছি সত্য কিন্তু পরিবেশ আমাদের অনুকূলে নয়। পরদিন ভোরে আনন্দবাজার পড়ে মনে হলো কোথায় যেন একটা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আনন্দবাজারে বলা হয়েছে, ভারত থেকে আইএএস অফিসার বিআর গুপ্তের নেতৃত্বে ১৩ জন আমলা বাংলাদেশে যাবে। তারা বাংলাদেশের ভেঙে পড়া প্রশাসন গড়ে তুলবে। এ খবর আমি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারলাম না। আমার দুঃখ হলো আমাদের বন্ধুরা বুঝতে পারছেন
যে এ খবরে বাংলাদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। কেউ বুঝতে পারছে না যে আমরা একটি ভিন্ন জাতি। কারো খবরদারি আমাদের পছন্দ নয়। এ জন্যেই আমরা পাঞ্জাবি অর্থাৎ অবাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। আমরা বলেছি আমাদের দেশ আমরাই গড়ব। আমরা অন্যের সাহায্য সহযোগিতা চাই কিন্তু খবরদারি চাই না। খবরদারি চাইলে পাঞ্জাবিদের সাথেই থাকতাম। মনে রাখতে হবে ধর্মের দিক থেকে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই মুসলমান। স্বাভাবিক কারণেই পাকিস্তানের মুসলমানদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক থাকারই কথা। কিন্তু শাসন-শোষণ ও খবরদারির প্রশ্নে বাঙালি মুসলমান অবাঙালি মুসলমানদের মানতে চায়নি। এটাই ছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধের মূল কারণ। এই যুদ্ধে জয়লাভের পর যদি লক্ষ করা যায় যে আরেকটি দেশ সাহায্যের নামে আমাদের ওপর খবরদারি করছে তাহলে একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
এছাড়া পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভারতের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক ছিল না। এ সময় ভারতের সাথে পাকিস্তানের কাশ্মীর নিয়ে দু’বার যুদ্ধ হয়েছে। ২৩ বছরের এই বৈরী সম্পর্কের ইতিহাস নিশ্চয়ই ন’মাসেই মুছে যায়নি। যারা দেশ চালান এবং দেশ চালাতে সহযোগিতা করেন তাদের এ অপ্রিয় সত্যটি প্রথম থেকেই অনুধাবন করা উচিত ছিল। কিন্তু আনন্দবাজারের খবরে মনে হলো কেউ যেন এই অপ্রিয় সত্যটি মেনে নিতে চাইছে না। বাংলাদেশে ভারতীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতি আদৌ গ্রহণযোগ্য হবে না তারা যেন তাও মেনে নিতে পারছে না।
