ভোরে মাজার থেকে বেলতলী বাজারে এলাম। সেখান থেকে লঞ্চে মুন্সীগঞ্জ হয়ে ঢাকা। আবার রায়েরবাজারের মোহাম্মদ হোসেনের বাড়ি থেকে বেরিয়েছি এপ্রিল মাসে। আগস্ট মাস পর্যন্ত কোনো খবর পাইনি। এদিকে অতীন দার পুত্রবধু অজন্তা একা আছে কুমিল্লায়। কেমন আছে কে জানে।
.
শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম মায়ের সাথে দেখা করে ঢাকায় ফিরব। যতদূর মনে আছে তারিখটি ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর। সন্ধ্যার দিকে আসানসোল পৌঁছুলাম। কার সাথে গিয়েছিলাম মনে নেই। আমার অদ্ভুত লাগছিল। ১৯৪৮ সালে মার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল। তারপর ২৩ বছর আমার ভারত যাওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে অনেক জল গড়িয়েছে পদ্মা-গঙ্গা-ভাগিরথীতে। আমাদের পরিবার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বাংলাদেশে আমাদের যৌথ পরিবার ছিল। দেশ বিভাগের পর সে পরিবার শতভাগে বিভক্ত। ভারতের পূর্বে আজকের বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় সব এলাকায় আমার স্বজনদের খুঁজে পাওয়া যাবে। আমি কোথায় যাব তা জানি না। এদেশে থাকতে সবাই মিলেমিশে ছিলাম। আমাদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ভারতে চলে গেছে। শুধু ভাগ হইনি আমি। ১৯৭১ সালে কলকাতায় গিয়ে আমি এই সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলাম। কলকাতায় আমার অসংখ্য আত্মীয়। কিন্তু আমি কার ভাগে পড়েছি জানি না। তাই অনেক ভেবে চিন্তে আমি কোনো আত্মীয়ের বাসায় উঠিনি। উঠেছি রাজনৈতিক মিত্রের আশ্রয়ে। কলকাতায় আরএসপির কমিউনে।
যারা দেশ ভাগের শিকার হয়নি তারা এই মর্মান্তিক জ্বালা বুঝতে পারবেন বা। রাজনৈতিক বিভাজন যে কত দুঃখ-বেদনার সৃষ্টি করতে পারে তা তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। দেশে আমি সকলের সাথে একা ছিলাম। বিদেশে সকলে বিচ্ছিন্ন। আমি কোন ভাগে জানা নেই। কোলকাতা শহরে আমার অসংখ্য আত্মীয় আছে। কিন্তু কাকে বাদ দিয়ে কার বাড়ি উঠব সে প্রশ্নের তখনো মীমাংসা হয়নি। আমার তখন অন্নদাশঙ্করের সেই বিখ্যাত কবিতাটি মনে পড়ত। যে কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, অবিভক্ত বাংলার সব ভাগ হয়ে গেছে, শুধু ভাগ হয়নি নজরুল। আমারও মনে হতো আমার সেই ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। শুধু আমি ভাগ হইনি।
২৩ বছর পর প্রথম কোলকাতায় পৌঁছেছিলাম। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। তখনো আমি মার সাথে দেখা করিনি। কারণ আমাকে বাংলাদেশে ফিরতে হবে। তখন বাংলাদেশ যুদ্ধ আর যুদ্ধ। ভেবেছি মায়ের সাথে দেখা হলে মা আমাকে বাংলাদেশে ফিরতে দেবে না। তাই বলেছিলাম দেশ স্বাধীন হলে মার সাথে দেখা হবে।
মা থাকেন বর্ধমানের আসানসোলে। কলকাতা থেকে দুশো কিলোমিটার। যতদূর মনে আছে ট্রেনের নাম কোলফিল্ড। অর্থাৎ কয়লার খনি। এ ট্রেন হাওড়া থেকে বিহারের ধানবাদ যায়। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এ ট্রেনে যাতায়াত করে। ভোররাতে ধানবাদ থেকে রওনা হয়ে ২৫০ কিলোমিটার দূরে কলকাতায় এসে অফিস করে। আবার সন্ধ্যায় একই ট্রেনে ফিরে যায়। তাই এ ট্রেনে ডেইলি পেসেঞ্জারের ভিড়।
ভিড়ের মধেই আমি ভাবছিলাম আমার কথা। ২৩ বছর পর মার সাথে দেখা হবে। দেখা হবে দুই ভাইয়ের সাথে। বড় ভাই থাকেন মধ্যপ্রদেশের কয়লাখনি এলাকায়। জায়গার নাম মনীন্দ্রগড়। আরেক ভাই থাকে বিহারের বোকারো। ইস্পাত কারখানার ইঞ্জিনিয়ার। তাদের সাথে এবার দেখা হবে না। কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার পক্ষে বেশিদিন ভারতে থাকা সম্ভব নয়।
সন্ধ্যার পর ট্রেন আসানসোল পৌঁছলো। ভাইয়ের বাসায় পৌঁছে মনে হলো আমি একটি দর্শনীয় বস্তু। চারদিকে মানুষের ভিড়। এ ভিড় আমাকে দেখতে নয়। বাংলাদেশের কথা জানতে। বাংলাদেশে কী হয়েছে সকলে জানতে চায়। তাদের প্রথম প্রশ্ন, শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়? আদৌ তিনি জীবিত কি না? তিনি কেমন দেখতে? আমি তাকে চিনি কি না? আমার ভাই শেখ সাহেবকে ভালোভাবে চেনেন। আমার ভাইও এক সময় টুঙ্গীপাড়া স্কুলে পড়তেন। কিন্তু তাঁর কথা কেউ বিশ্বাস করে না। তাঁর কথা বাসি হয়ে গেছে। সবাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চায় বাংলাদেশে কী হয়েছে। যারা এ কথা জানতে চায় তাদের নাড়ির টান আছে। মাত্র কয়েক বছর আগে তারা বাংলাদেশ ছেড়েছে। পিতার ভিটি তারা ভুলতে চেয়েছিল। কিন্তু সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে ৭১-এর যুদ্ধ। তারা ভাবতেই পারেনি যে এমন একটি ঘটনা ঘটবে। তাদের স্বপ্ন কোনোদিন বাংলাদেশ ছিল না। ৭১-এর সংগ্রাম তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে একান্তভাবেই তারা পূর্ব বাংলার লোক। তারা পশ্চিমবাংলার লোক নয়।
তাদের এই জানার ইচ্ছায় ঐকান্তিকতা ছিল। দীর্ঘদিন পরে তারা ভাবতে চেয়েছিল তারা উদ্বাস্তু নয়। তাদেরও একটি দেশ আছে। সে দেশের নাম বাংলাদেশ। কিন্তু আমার তাদের কথা ভালো লাগছিল না। হয়তো আমি তাদের অনুভূতি অনুধাবন করতে পারিনি। তাই আমার শুধু মনে হতো–এতটাই যদি ভালোবাসা ছিল তাহলে দেশ ছেড়ে চলে এলেন কেন? আপনারা সকলে মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে হয়তো এ ঘটনা ঘটত না। আমি লক্ষ করেছি ভারতে গিয়ে আমার এ মানসিকতা নিদারুণভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছে। এমনো হতে পারে যে আমি তাদের দুঃখ বেদনা অনুভব করতে পারিনি। পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছর পর আমি জেলে গেছি। তারপর একটানা প্রায় ৫ বছর জেলে থেকেছি। এ সময় উভয় বঙ্গে ভয়াবহ দাঙ্গা বেধেছে। মানুষ ভিটা ছেড়েছে। প্রাণে বাঁচার জন্যে কোনোদিক তাকায়নি। ইচ্ছা থাকলেও নিজের জন্মভূমিতে থাকতে পারেনি। এ সময়টা আমি জেলে ছিলাম। তাই তাদের এ সময়ের দুঃখ কষ্টের কাহিনী আমি অনুধাবন করিনি। কোটি কোটি মানুষ এপার থেকে ওপারে গিয়েছে। শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করেছে। জলাভূমি আবাদ করে বসতি স্থাপন করেছে। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে সকল বাঁধন। প্রেম, ভালোবাসা, মায়া, মমতা সবকিছু বিক্রি হয়েছে টাকার বিনিময়ে। দীর্ঘদিন পর এসে আমি বুঝতে পেরেছি এই উদ্বাস্তুদের সংসারে একান্তভাবেই আমি বেমানান। আমার আত্মীয়-স্বজনের সাথে আমার কথাবার্তা ধ্যান-ধারণার কোনো মিল নেই। সর্বত্রই যেন আমি এক আগন্তুক।
