নতুন সড়কে হাঁটছি আর হাঁটছি। চৈত্রের রোদ্দুর তখন মাথার উপরে। আমার মনের কোণে এই বাড়ির একটি ছবি ছিল। পাটক্ষেত পার হয়ে একটি পুকুর। পুকুরের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে একটি মসজিদ। তারপর সিদ্দিকের বাড়ি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক লোক জমে গেল। কিছুক্ষণ পরে ঠিকই আমি বাড়িটি চিনতে পারলাম। আমি সিদ্দিকের ঘরে ঢুকতেই সিদ্দিক চিৎকার করে উঠল। বলল, আপনি সেই লোক। আপনি ৭১ সালে আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। আমি অবাক হয়ে সিদ্দিকের দিকে তাকাচ্ছিলাম। ২৫ বছর আগে লুঙ্গি, হাওয়াই শার্ট আর একমুখ দাড়ি নিয়ে আমি সিদ্দিকের বাড়ি গিয়েছিলাম। তখন একটি চুলও আমার পাকেনি। ৯৪ পাউন্ডের ছিপছিপে এক তরুণ। আমি ভাবছিলাম সিদ্দিক আমাকে চিনল কী করে? সিদ্দিকের বাড়িতে তখন এক বিদেশি মেহমান। তিনি বললেন, তারা নাকি আমার কথাই আলোচনা করছিলেন। তাদের ধারণা, আমি কোনো একজন বড় লোক হবই। আমাকে তারা বছরের পর বছর খুঁজছে। কিন্তু আমার নাম ধাম জানে না। কী করে খোঁজ করবে?
সারা বাড়িতে তখন আমার কথা রটে গেছে। ছেলে-মেয়ে, বুড়ো সবাই ভিড় জমিয়েছে। সকলের বাড়িতেই যেতে হবে। সকলের ঘরেই খেতে হবে। চারদিকে ভিড় আর ভিড়। বুঝলাম আমি দীর্ঘদিনের এক গল্প হয়ে আছি ওই এলাকায়।
কিন্তু আমার তখন সেদিকে তেমন মন ছিল না। আমি ২৫ বছর পূর্বের এক তরুণীকে খুঁজছিলাম। ভাবছিলাম ওরা আমাকে খোঁজ করেছিল কেন। তাহলে নাফিয়ার স্বামী আলী আকবর কি ফিরে আসেনি? আমি বারবার নাফিয়ার কথা জিজ্ঞেস করলাম। কেউ কোনো জবাব দিল না। আমি বললাম, সিদ্দিক, আমি নাফিয়ার বাড়ি যেতে চাই। সিদ্দিক কোনো জবাব দিল না। তার চোখে তখন জল নেমেছে।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু নাফিয়ার স্বামী আলী আকবর আর ফিরে আসেনি। ১৯৭২ সালে নাফিয়া টিবিতে আক্রান্ত হয়। গরিব সিদ্দিকের পয়সা ছিল না বোনের চিকিৎসার। তাই সে হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজছিল। বাধ্য হয়ে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল শ্বশুরবাড়ি আলীর চরে। ১৯৭৩ সালে প্রায় বিনা চিকিৎসায় নাফিয়া আলীর চরে মারা গেছে।
১৯৭১ থেকে ১৯৯৬। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী। আমি একজন সিদ্দিক ও নাফিয়ার খোঁজে গিয়েছিলাম। দেশে তখন অসংখ্য অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। কিন্তু সিদ্দিককে খুঁজে পেলেও নাফিয়াকে পাইনি। এ নিয়ে সিদ্দিকের খুব অভিযোগ ছিল না। দুঃখ ছিল। তারা ভেবেছিল আমাকে পেলে হয়তো নাফিয়ার মৃত্যু হতো না। এর চেয়ে বড় সত্য কথা হতে পারে না। স্বাধীন বাংলাদেশে নাফিয়ার চিকিৎসার অসুবিধা হতো না। টাকার কোনো অভাব হতো না। অভাব ছিল আমাদের মতো রাজনীতিকদের কৃতজ্ঞতার এবং মানবিক আচরণের। আমরা সব কিছু পেতে চাই। সবকিছু দখল করতে চাই। আর যাদের কাঁধের ওপর ভর দিয়ে সবকিছু দখল করি তাদের একদিন লাথি মেরে পিছু হটিয়ে দিই। শুধু নাফিয়া কেন? একই আচরণ করেছি ইয়াকুবের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের আগস্টে নাফিয়ার কাহিনী শুনতে শুনতে গোমতী পাড়ি দিয়েছিলাম। দুপুরে দীঘিরপাড় বাজারে এসে পৌঁছলাম। দুপুরে দীঘিরপাড় বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের তেমন ভিড় থাকে না। বাজার মোটামুটি ফাঁকা। ওখান থেকে আমাদের নৌকায় যেতে হবে। নৌকায় যেতে হবে গৌরীপুর।
খাবার জন্যে হোটেলে ঢুকলাম। হোটেল মালিক আগেরই চেনা। জিজ্ঞেস করল, ফিরে এলেন কেন? আমি বললাম কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ওপারে যাওয়া যাবে না। সব সীমান্ত পাকিস্তান বাহিনীর দখলে। আবার ঢাকা ফিরছি। ঢাকা থেকে রায়পুর লক্ষ্মীপুর হয়ে ওপার যাবার চেষ্টা করব। হঠাৎ হোটেল মালিক বলল–স্যার, আপনাকে ঘোষগাতি যেতে হবে। সেদিন আপনার সঙ্গে গাইড হিসেবে ইয়াকুব গিয়েছিল। ইয়াকুব কিন্তু আর ফিরে আসেনি। ওর বাড়িতে লোকজন কান্নাকাটি করছে।
আমি চমকে গেলাম। আমি বলদা বাজারে ইয়াকুবকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। তাকে ২০ টাকা দিয়ে বলেছিলাম বাড়ি চলে যাও। সকলের ধারণা ইয়াকুব টাকা নিয়ে তাড়াল্লার হাটে গিয়েছিল। সেদিন ভাড়াল্লার হাটে বিকেলের দিকে পাকিস্তান বাহিনী হামলা চালিয়েছিল। হয়তো ইয়াকুব প্রাণ হারিয়েছে।
আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। কী করে গোষগাতি যাবো। কী তাদের গিয়ে বলব। আর ঘোষগাতির কাছাকাছি কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট। শহিদুল্লাহও রাজি হলো না। তার ভয় ঘোষগাতি গেলে আমরা দুজনেই মারা পড়ব। ২৬ বছর আগের কথা লিখছি। এই ২৬ বছরে অনেকবার ইয়াকুবের কথা মনে হয়েছে।
মুখটা যেন আবছা আবছা মনে পড়ছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ঘোষগাতি যাওয়া হয়নি। হোটেল মালিককে কথা দিলাম ঢাকা গিয়ে ব্যবস্থা করব।
তারপর দীঘিরপাড় থেকে গৌরীপুর। গৌরীপুর থেকে নৌকা বদল করে আবার বেলতলী। কিন্তু বেলতলীতে আবুল হোসেনের বাড়িতে জায়গা হলো না। সে বাড়িতে অনেক লোক। সে রাতে খাওয়া জুটল না। আমাদের যেতে বলা হলো ল্যাংটা ফকিরের মাজারে। সেখানেই ঘুমাবার ব্যবস্থা। একেবারে মাজারের পাশেই ঘুমাতে হবে। মাজারে একজন মাত্র খাদেম। দুপুর রাতে সে আমাকে ডেকে তুলল। বললো হুজুর আমিও মুক্তিযোদ্ধা। আমার বাড়ি হাজীগঞ্জ। আমি কলিমুল্লাহর লোক। সাম্যবাদী দলের নেতা কলিমুল্লাহ হাজীগঞ্জে বিশেষভাবে পরিচিত।
