একথা আমি আগেই লিখেছি এবং এ সত্যই প্রমাণিত হলো যে রুশ নৌবহরের জন্যে মার্কিন সপ্তম নৌবহর কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী মিত্রবাহিনীর কাছে। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার কাছে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করেন।
কলকাতায় তখন উৎসবের বন্যা। ক্রান্তি প্রেসেও উৎসব। কিন্তু আমার মন ভালো ছিল না। আমি বুঝতে পারছিলাম না–এরপর কী হবে। এ যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। রাজনৈতিক বা মানসিকভাবে সংগঠিত ছিল না। তবুও ৯ মাসের মধ্যে অসাধ্য সাধন করেছে আমাদের তরুণরা। কিন্তু আমাদের সামনে আছে পর্বতপ্রমাণ সমস্যা। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে শিল্পায়ন হয়নি। যে শিল্প কারখানা ছিল তাও যুদ্ধের কারণে বিধ্বস্ত। এই বিধ্বস্ত দেশটিকে উদ্ধার করতে হলে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দরকার। অথচ প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগই ঐক্যবদ্ধ নয়। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ক্ষত-বিক্ষত। সৎ ও সাহসী হিসেবে অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সুনাম থাকলেও সকলের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য নন। ডানপন্থীদের কাছে তিনি বাম ঘেঁষা এবং মার্কিন বিরোধী। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাকে নিয়ে সমস্যা দেখা দেবে। এ ধরনের নানা চিন্তায় আমি বিপর্যস্ত। বন্ধুরা বলছিল, আপনাদের দেশ স্বাধীন হলো। আপনি বাইরে ঘুরে আসুন। আমি সেদিন বাইরে যাইনি। ক্রান্তি প্রেসে শুয়ে দিন কাটিয়েছি। কোনো কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। বাড়ির অবস্থা কিছুই জানি না। ঢাকায় গিয়ে চাকরি করতে হবে। চাকরির ভবিষ্যতও জানি না। সবার আগে মায়ের সাথে দেখা করতে হবে। ২৩ বছর পর ভারতে এসেছি। এই ২৩ বছর মায়ের সাথে দেখা হয়নি। গত কয়েক মাস কলকাতায় আছি। কিন্তু বর্ধমানের আসানসোলে মাকে দেখতে যাইনি। বলেছি, দেশ স্বাধীন হলে মাকে দেখে দেশে ফিরব। স্থির করলাম নতুন ঝামেলা শুরু হওয়ার আগে আসানসোলে যাব। আসানসোলে দিন দুয়েক থেকে কলকাতা ফিরব। কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরব এক সপ্তাহের মধ্যে।
.
গোমতীর তীরে পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল হয়ে গেল। গোমতীর ওপারে কংসনগর। আবার সেই পুরান পথ। ফুলতলী ইমিসিং হয়ে দীঘিরপাড় যেতে হবে। পুরান পথে ফিরতে হবে ঢাকায়। গোমতীর কাছে এসে সিদ্দিক ফিরে যাবে। আমরা ফেরিতে পার হয়ে কংসনগর যাব। সিদ্দিক অনেক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। কিন্তু কোনোদিন আমার নাম জিজ্ঞেস করেনি। জিজ্ঞেস করেনি ঠিকানা। হয়তো শহিদুল্লাহর কাছে শুনেছে। আমি আজো জানি না শহিদুল্লাহ কী পরিচয় দিয়েছিল সিদ্দিকের কাছে। কিন্তু আমার জানার কৌতূহল হলো নাফিয়া সম্পর্কে। নাফিয়াকে না বলে চোরের মতো পালিয়ে এসেছি। তাই জানতে ইচ্ছে হলো ওদের কাহিনী। ওদের জমিজমা নেই জানি। কিন্তু কখনো বুঝতে পারিনি নাফিয়ার বিয়ে হয়েছিল কিনা। মোটামুটিভাবে আমাদের দেশের এ বয়সের মেয়েরা তখন এত প্রগলভ ছিল না। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে এমন অসন্তোষও কারো দেখিনি।
তাই সিদ্দিককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নাফিয়াকে বিয়ে দাওনি কেন? আমার কথায় সিদ্দিক মলিন হলো। বললো, ওকে আলীর চরে বিয়ে দিয়েছিলাম। ওর বর কাজ করত কক্সবাজারে। একাত্তরের অসহযোগের পর নাফিয়ার বর আলী আকবর আর ফিরে আসেনি। তাই মানুষের কাছে পরিচয় দিয়েছিলাম আপনারা আলীর চরের কুটুম্ব। নইলে আপনাদের বাঁচাতে পারতাম না। আলী আকবর ফিরে না আসায় নাফিয়া একটু পাগলাটে হয়ে গেছে। যে কোনো মুক্তিযোদ্ধা এলে আদর করে খাওয়ায়। রাত বাড়তে থাকলে তার পাগলাটে ভাব বাড়তে থাকে। চিৎকার করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ সালে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ সেই ভোরে গোমতী নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নাফিয়ার কাহিনী শুনছিলাম। তারপর আবার গোমতী পাড়ি দিয়েছিলাম ২৫ বছর পর। দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। কারো কথাই মনে থাকলো না। কারো জন্যেই কিছু করিনি। আমাদের এই আচরণের আরেক নাম অকৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসঘাতকতা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হাজারবার কুমিল্লা গিয়েছি। কখনো ভাবতে চেষ্টা করিনি গোমতী তীরের চন্ডীপুরের কথা।
তারপর ২৫ বছর। হঠাৎ বোধ হয় একদিন মনে হলো গোমতীর তীরে চন্ডীপুরে একটি দরিদ্র পরিবার ছিল। তারা আমাদের কোনোদিন চিনতে চেষ্টা করেনি। খোঁজ নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা বলে আশ্রয় দিয়েছিল। ২৫ বছর পরে মনে হলো আমাদের একটা দায়িত্ব ছিল। জানতে চেষ্টা করা উচিত ছিল নাফিয়ার স্বামী আলী আকবর বাড়ি ফিরেছিল কিনা। ইতিমধ্যে দৈনিক বাংলায় নাফিয়ার নাম করেই আমি নিবন্ধ লিখেছি। সে নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু কখনো জানতে চেষ্টা করিনি সিদ্দিক বা নাফিয়া কোথায় আছে। কেমন আছে। খেয়ে পরে আছে কিনা। আমি উচ্চমহলে একেবারে অপরিচিত ছিলাম না। আমার কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই এমনো নয়। তবুও কোনো কিছু করিনি ওই সব পরিবারের জন্যে।
তারপর ১৯৯৬ সাল। ঠিক ২৫ বছর পর। এক দুপুরে গোমতী নদী পাড়ি দিলাম। সঙ্গে দেবিদ্বারের দুটি ছেলে। গোমতী পাড়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমার সঙ্গে আমার দলের ছেলে মনির এবং তার এক আত্মীয়। ব্রাহ্মণপাড়া থানার চন্ডীপুর গ্রাম অতবড়ো তা আমার জানা ছিল না। ১৯৭১ সালে প্রাণের ভয়ে ছুটেছি। তখন মনে হয়েছে সিদ্দিকদের বাড়ি ১০ থেকে ১৫ মিনিটের পথ। আর তখন কেউ চেনাও ছিল না। এবার ভিন্ন পরিস্থিতি। কথায় কথায় জানাজানি হয়ে গেল আমি চণ্ডীপুর যাচ্ছি। আমার নাম মোটামুটিভাবে পরিচিত।
