যুদ্ধ শুরু হবার পর নতুন করে বিপদে পড়লাম। বিতর্ক শুরু হলো যুদ্ধের চরিত্র নিয়ে। এ যুদ্ধ কাদের যুদ্ধ? ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আদৌ হতে পারে কিনা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমরা শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি প্রচার করেছিলাম। বিবৃতিতে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী এবং বাংলাদেশের জনগণকে ভারতীয় বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর আরএসপির তরুণ কর্মীদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তাদের সুস্পষ্ট মন্তব্য হচ্ছে ভারতীয় বাহিনী কোনো দেশের মুক্তিদাতা হতে পারে না। যুদ্ধে আপনাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে কিন্তু সে মুক্তির আকাক্ষা ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বে অর্জিত হতে পারে না। মুক্তির দিক থেকে তাদের কথা ফেলে দেয়া যায় না। বক্তব্যের জবাবে আমার একটি ভিন্ন জবাব ছিল। আমরা বক্তব্য ছিল ৭১-এর যুদ্ধে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু এ যুদ্ধ আদৌ মুক্তিযুদ্ধ ছিল না। সঠিকভাবে বলতে গেলে এ যুদ্ধ ছিল পাকিস্তান থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যুদ্ধ। এ যুদ্ধের শ্লোগান ছিল আমরা বাঙালি। বাঙালির জন্যে স্বাধীন রাষ্ট্র চাই। অবাঙালি আমাদের শত্রু। তাই তাদের খতম করো। অবাঙালি হানাহানি করে অসংখ্য মানুষের জীবনহানি ঘটিয়েছে। এ যুদ্ধ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যুদ্ধ বলেই এ যুদ্ধের কর্মসূচির মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের কথা ছিল না। এ যুদ্ধের নেতৃত্বের কল্পনা ছিল দেশ। তাই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। অবাঙালির পরিবর্তে আমরা বাঙালিরা শোষণ ও শাসন করার জন্যে একটি রাষ্ট্র চাই। সেই রাষ্ট্রের নাম হবে বাংলাদেশ। আমার কাছে স্পষ্ট ছিল যে অবস্থা যেমন দাঁড়িয়েছে তাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ব্যতীত আপাতত এ সমস্যার কোনো সমাধান নেই। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় দেশ স্বাধীন করে দেশে ফিরতে হবে। এ মুহূর্তে বামপন্থীদের এককভাবে সংগ্রাম চালিয়ে নেয়ার শক্তি বা প্রস্তুতি নেই। এছাড়া বামপন্থীরা হাজার ভাগে বিভক্ত। তত্ত্ব দিয়ে যে যতই বোঝাক না কেন বামপন্থীরা কোনো অর্থেই তখন ঐক্যবদ্ধ ছিল না বা আদৌ কোনো নিয়ামক শক্তি ছিল না। অনেকেই বলে থাকেন এ যুদ্ধ দীর্ঘদিন চললে বামপন্থীদের হাতে এ যুদ্ধের নেতৃত্ব চলে যেত। অথচ তারা কেউই ভেবে দেখতে চান না যে পরিস্থিতি কখনো তেমন ছিল না। এ ধরনের একটা ধারণা সকল মহলেই ছিল। ভয়ও ছিল শাসক মহলে। কিন্তু কেউই বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তৎকালীন পরিস্থিতি ভেবে দেখতে চেষ্টা করেননি। অসংখ্য গ্রামের ছেলে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছিল। এলাকাভিত্তিক অনেক মুক্তিবাহিনী গড়ে উঠেছিল। বামপন্থীদের ঐক্য, শক্তিশালী সংগঠন ও প্রস্তুতি থাকলে বিকল্প কিছু ভাবা যেত। চারদিকে ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের একই সাথে ভারতীয় ও পাকিস্তান বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে যুদ্ধে জয়লাভ করার পরিস্থিতি তখন আদৌ ছিল না।
আমার এ বক্তব্যে অনেকে খুশি হননি। পরবর্তীকালে বামপন্থী মহলেও আমার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হয়নি। আমার বক্তব্য এখনো বিতর্কিত। কিন্তু আমি এখনো মনে করি যে ৭১-এর যুদ্ধ ছিল অবাঙালির বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রাম। শোষকদের বিরুদ্ধে শোষিতদের সংগ্রাম নয়। এ যুদ্ধে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল। নেতৃত্বের কাছে অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সে প্রত্যাশা ছিল একান্তই আবেগভিত্তিক। এ যুদ্ধ মুখ্যত আবেগ ও স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ায় কেউ ৭১-এর যুদ্ধকে স্বাধীনতা যুদ্ধ, আবার কেউ বলেছে মুক্তিযুদ্ধ। কেউ ৭১-কে বলেছে হিড়িকের বছর, আবার কেউ বলেছে গণ্ডগোলের বছর। এই বিভিন্ন ধরনের সংজ্ঞা নিয়েই ৯ মাস যুদ্ধ চলেছিল ১৯৭১ সালে। সেই যুদ্ধের শেষ অংশে এসে হাজারো প্রশ্ন উঠেছিল বিভিন্ন মহলে।
এ যুদ্ধের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন চাল চেলেছিল। হঠাৎ একদিন শোনা গেল মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করছে। ওয়াশিংটন থেকে সরকারিভাবে বলা হলো তকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আটকেপড়া মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধারের জন্যে সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় যাচ্ছে।
সপ্তম নৌবহরের খবরে সকল মহলই শঙ্কিত। এ যুদ্ধের সময়ই সপ্তম নৌবহর নিয়ে একটি বৈঠকের খবর শুনলাম ক্রান্তি প্রেসে। এ বৈঠক বসেছিল নয়াদিল্লিতে। বৈঠক ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। বৈঠকে ডেকেছিলেন লোকসভার প্রবীণ সদস্যদের। আরএসপির সর্বভারতীয় সম্পাদক কমরেড ত্রিদিব চৌধুরী এ বৈঠকে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। কমরেড ত্রিদিব চৌধুরী ১৯৫২ সাল থেকে ভারতীয় পার্লামেন্টের সদস্য। তিনি গোয়া মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে সালাজারের জেলে ১৯ মাস ছিলেন। তিনি বিরোধীদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করেছিলেন। ত্রিদিব চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী সেই বৈঠকে সেনাবাহিনীর প্রধান মানেকশকে ডাকা হয়েছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল মার্কিন সপ্তম নৌবহরের কথা। জেনারেল মানেকশ বলেছিলেন সপ্তম নৌবহরের আক্রমণের মুখে মিত্রবাহিনীর টিকে থাকবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তবে সপ্তম নৌবহর আক্রমণ চালালে রুশ নৌবহরও বসে থাকবে না এবং রুশ নৌবহর মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে অনুসরণ করছে। অর্থাৎ বিশ্ব তখন তৃতীয় মহাযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়াবে।
