তখনো ভাবতেও চেষ্টা করিনি যে এত কথা আমরা কী করে জানতে পারলাম। আমরা সব কিছু জানতে পারছি আর পাকিস্তান কিছুই জানে না সে কেমন কথা। এ পরিবেশেই শ্রীমতি গান্ধী ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় এলেন। শ্রীমতি গান্ধীর জনসভায় ভাষণ শুনতে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে গেলাম। জনসভার অধিকাংশ লোকই বাংলাদেশের। আমি ভেবেছিলাম আরো লোক হবে। জনসভায় গিয়ে মনে হলো বাংলাদেশের যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শ্রীমতি। গান্ধী তখন তত জনপ্রিয় নন।
বিকেলের দিকে জনসভা শুরু হলো। খুব ধীরে শ্রীমতি গান্ধী বক্তৃতা শুরু করলেন। কিছুক্ষণ বক্তৃতার পর একজন বার্তাবহ শ্রীমতি গান্ধীকে কী যেন একটা খবর জানালেন। শ্রীমতি গান্ধী বক্তৃতা সংক্ষেপ করলেন। জনসভা শেষ হলো।
পরের দিন খবরে কাগজে দেখলাম যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। শ্রীমতি গান্ধী কলকাতার জনসভায় বক্তৃতা দেয়ার সময়ই তাঁর কাছে খবর আসে যে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতীয় বিমান বন্দরে হামলা চালিয়েছে। জনসভা সংক্ষিপ্ত করে শ্রীমতি গান্ধী সামরিক বাহিনীর একটি বিমানে নয়াদিল্লি ফিরে যান। গভীর রাতে ভারতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক বসে। বৈঠকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনে ভারত সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সংবাদপত্রের পাতায় কলকাতা তখন খুব গরম। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে তার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী। কিন্তু ওই শহরে বাঙালিরা সংখ্যালঘু। তাই ব্যবসা বাণিজ্যে কলকাতায় বাংলাদেশের যুদ্ধের তেমন খবর নেই। খবর হচ্ছে পত্রিকার পাতায় এবং সন্ধ্যা বেলা সেনাবাহিনীর দফতরে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনীর সদর দফতর কলকাতায়। যুদ্ধের নেতৃত্বে আছেন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সমবায়ে গঠিত মিত্র বাহিনী যুদ্ধ করছে। এই মিত্র বাহিনীর নেতৃত্বে আছেন আরোরা। তাঁর নির্দেশে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীও যুদ্ধ করছে। এই আরোরার দফতরে সন্ধ্যার দিকে সাংবাদিকরা জড়ো হচ্ছে। এই দফতর থেকেই সকল খবর জানানো হচ্ছে।
ক্রান্তি প্রেসে সকলে তখন উদ্বিগ্ন। মনিদা রেডিও নিয়ে বসে আছেন। প্রতি মুহূর্তে তিনি খবর নিচ্ছেন। রেডিওর খবর নিতে দেরি করলে মনিদার মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে। শ্রীমতি গান্ধী পার্লামেন্টে এই ঘোষণা দেন। ভারত বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান ভারতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।
অপরদিকে নতুন খেলা শুরু হয় জাতিসংঘের সদর দফতরে। আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এই প্রস্তাবে ভারত ও পাকিস্তানকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে নিজ নিজ দেশে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নিয়ে যাবার কথা বলা হয়। এরপর আরো আটটি প্রস্তাব করে বলেন যে ভারত থেকে অবিলম্বে শরণার্থীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হোক। মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ এ প্রস্তাব সমর্থন করেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়। বলা হয় যে, পাকিস্তানিরা যখন নির্বিচারে বাংলাদেশীদের হত্যা করছিল তখন জাতিসংঘ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এখন পাকিস্তান বিপদে পড়ায় জাতিসংঘে এ প্রস্তাব উঠেছে। এ প্রস্তাব গৃহীত হলে পাকিস্তান লাভবান হবে। বাংলাদেশ এ প্রস্তাব মানবে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় প্রস্তাবের বিরুদ্ধেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগ করে। ফলে প্রস্তাব দুটি বাতিল হয়ে যায়।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশের বিজয়ের খবর আসতে থাকে। আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানান পাকিস্তান বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্যে। এই আহ্বানে বলা হয়—’তোমাদের বাঁচার কোনো পথ নেই। বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্যে তোমাদেরকে ঘিরে রেখেছি। তেমরা যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে তারা তার প্রতিশোধ নেবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। অনেক দেরি হওয়ার আগেই তোমরা আত্মসমর্পণ করো। তোমাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা ও যুদ্ধাস্ত্রের শক্তি অকেজো হয়ে গেছে। এমনকি বাইরে থেকে বিমানের সাহায্য আসার সম্ভাবনা নেই। অতএব তোমরা অস্ত্র ত্যাগ করো। তোমাদের বাঁচার কোনো পথ নেই। একমাত্র পথ হচ্ছে সম্মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করা।’
ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ-এর আহ্বান বারবার বেতারে প্রচারিত হতে থাকে। তাঁর এই আহ্বানে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। পাকিস্তান বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়তে থাকে। ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর প্রধানরা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার। কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন চরম ভারত বিদ্বেষী। তারা ন’মাসের যুদ্ধের সময় প্রতি পদে পদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ করে গেছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে বাংলাদেশের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর বৃহৎ দুই শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছিল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ে উঠেছিল অবশ্যম্ভাবী। ঢাকার পাকিস্তান বাহিনীর পক্ষ থেকে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দেয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে। কখনো ইয়াহিয়া খানকে হুমকি দিয়েছে। পাকিস্তান বাহিনীকে বাধ্য করেছে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে মার্কিন ভূমিকা ছিল বাংলাদশের স্বাধীনতা যুদ্ধ যে কোনো মুল্যে প্রতিহত করার।
