তাদের এই বক্তব্যে আদৌ ভুল ছিল না। ত্রিপুরা বা পশ্চিমবাংলায় বাঙালিরা না থাকলে আমাদের বুঝতে হতো কত ধানে কত চাল হয়। আমাদের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তে ত্রিপুরা ও পশ্চিবাংলায় কোটি কোটি বাঙালির জন্মভূমি। পূর্ব পাকিস্তান নামক বাংলাদেশ। অনেক চোখের জলে তারা পিতার ভিটি ছেড়ে গিয়েছে। তারা অনেক কিছু হারিয়েছে। তাদের নতুন নাম শরণার্থী বা উদ্বাস্তু। অর্থাৎ তারা অন্যের আশ্রয় চায় এবং যাদের নিজের কোনো বাসভূমি নেই। অধিকাংশ শরণার্থী উদ্বাস্তু পরিবার বিভক্ত হয়েছে দেশ বিভাগের ফলে। তাই তাদের কাছে পুঞ্জিভূত আবেগ। নিজের জন্মভূমির প্রতি টান। সেই জন্মভূমি আক্রান্ত হলে তারা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। কোনো যুক্তি তাদের মাথায় আসেনি। ওপারের লাখ লাখ বাঙালিকে তারা বুকে জড়িয়ে ধরেছে। নিজের বাড়িতে স্থান দিয়েছে। ভাগ করে খাবার খেয়েছে। নতুন প্রজন্মের শিশু স্কুল কলেজ ছেড়ে বের হয়েছে সাহায্যের সন্ধানে। নতুন স্বজনদের জন্যে। পৃথিবীতে এ ঘটনা কোনোদিন ঘটেনি। একটি আবেগের পরিবেশে এবং তুখোড় বামপন্থী ও সকল যুক্তি ভুলে বাঙালি হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতির সৃষ্টি না হলে এ যুদ্ধের রূপ ভিন্নতর হতো।
আমাদের অনেক লেখক, অনেক গবেষক এবং অনেক নেতারা সেদিনের এ আবেগের দিকটি ভুলে গিয়ে যুদ্ধ মূল্যায়ন করতে চান এবং মূল্যায়ন করে থাকেন। তাঁদের কথায় মনে হয় ভারতবর্ষে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল স্বাভাবিক। ভারত সরকার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের সাহায্যে এসেছেন। তাঁরা উল্লেখ করতে চান না ত্রিপুরা ও পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের আবেগ এবং ভারত সরকারের ওপর সেই আবেগ ও সমবেদনার ভিত্তিতে সৃষ্ট চাপের কথা। এ আবেগের জন্যেই আমরা দিনের পর দিন বিতর্ক করতে পেরেছি। যে বাঙালি তরুণ আমাদের সংগ্রাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিয়েছে, আমাদের ভুল ধরিয়ে দিয়েছে সেই তরুণই পারিবারিক পরিবেশে ফিরে ভিন্ন। মানুষ হয়ে গেছে। সে তখন মার্কসবাদী, লেনিনবাদী বিপ্লবী নয়, একান্তই ভাত এবং মাছের বাঙালি।
এ দৃশ্য আমি ক্রান্তি প্রেসে দেখেছি। ক্রান্তি প্রেসের আরএসপির নেতারা থাকেন। এক সময় অনুশীলন সমিতি করতেন। বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচার সহ্য করেছেন। ঘর করেননি। স্ত্রী পুত্ৰ-পরিবার নেই। আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ক্ষীণ। তাঁরা আমাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতেন এ যুদ্ধে জয়লাভ করলেও আপনাদের ভালো হবে না। কংগ্রেস নেত্রী শ্রীমতি গান্ধীর নেতৃত্বে শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলা গঠিত হতে পারে না। আপনাদের নেতৃত্ব একান্তই সুবিধাবাদী। দেশে ফিরে গিয়ে আপনাদের শোষণমুক্ত সমাজের জন্যে যুদ্ধ করতে হবে। আজকের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হবে। ক্রান্তি প্রেসে সামনের কক্ষে এই বিতর্কের মাঝখানে হঠাৎ পেছন থেকে মনি দা চিৎকার করে উঠলেন। মনি দা হচ্ছে মনিন্দ্র চক্রবর্তী। বাড়ি কুমিল্লায়। আরএসপির নেতা। আরএসপির কমিউন পরিচালনা করেন। মনিদা সারাদিন রেডিও শোনেন। মুক্তিবাহিনীর খবর রাখেন। মুক্তিবাহিনীর জয়লাভের খবর শুনলে চিৎকার করে উঠেন। উল্লাসে সবাইকে চা খাওয়ান। হয়তো মনে ভাবেন বাংলাদেশ স্বাধীন হলে জন্মভূমি কুমিল্লায় আবার ফিরে যেতে পারবেন। ওই কুমিল্লায় তার রাজনৈতিক হাতেখড়ি। ওই কুমিল্লা তাকে শিখিয়েছিল ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম। ব্রিটিশ চলে গিয়েছে। কিন্তু সে দেশ স্বাধীন করার জন্যে যিনি জীবনে সবকিছু হারিয়েছেন সেদেশে তার থাকা হয়নি। মনিদা দেশান্তরী। মনিদা আমাদের বিতর্ক শোনেন আর সারাদিন শোনেন রেডিওর খবর। আর মাঝে মাঝে চিৎকার করে ওঠেন।
১৯৭১ সালের সংগ্রামে এই ছিল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। আমি বাঙালি। আমি বাংলাদেশ চাই। আমি চাই বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধে জয়লাভ করুক। কিন্তু আমি জানি এ যুদ্ধে বাঙালির মুক্তি আসবে না। এ যুদ্ধে শোষণমুক্ত বাংলাদেশ হবে না। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে এ যুদ্ধ সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু আমি এপারের বাঙালি। ওপারের স্বজনেরা বহু প্রত্যাশা নিয়ে এপারের আশ্রয় প্রার্থী। ওরা যেন এপারে এসে আমার মতো শরণার্থী আর উদ্বাস্তু না হয়। ওরা যেন সম্মান নিয়ে দেশে ফিরে যেতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের যুদ্ধের ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিত্ব দ্বিধা বিভক্ত। আমার জন্মভূমির টান আমাকে আবেগমথিত করে। আমার যুক্তি ও প্রজ্ঞা আমাকে বিপরীত কথা বলে।
১৯৭১ সালের সংগ্রাম তত্ত্ব ও ব্যবহারিক জীবনের মাঝখানে ছিল এক পর্বতপ্রমাণ দেয়াল। আমি তত্ত্ব দিয়ে বুঝেছি এ সংগ্রাম সঠিক নয় বলে ব্যাখ্যা দিয়েছি। কিন্তু নিত্যদিনের জীবনে এ সংগ্রাম সফল করার জন্যে সর্বস্ব দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি। তবুও বিতর্কের শেষ হয়নি। এ বিতর্ক তুঙ্গে উঠল ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হবার পর।
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বোঝা গেল যুদ্ধ এগিয়ে আসছে। সংবাদপত্রের খবরে বলা হলো ৪ ডিসেম্বর শ্রীমতি গান্ধী কলকাতায় আসছেন। তিনি ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ভাষণ দেবেন। অনেকে বলতে থাকলেন ওই জনসভা থেকে তিনি যুদ্ধের ঘোষণা দেবেন।
কদিন পরের খবর হলো শ্রীমতি গান্ধীর ৪ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় জনসভায় ভাষণ দেবেন। এছাড়া অদ্ভুতভাবে আরেকটা কথা ছড়িয়ে গেল সারা কলকাতায়। বলা হতে থাকল পাকিস্তান ৩ তারিখ ভারত আক্রমণ করবে। এ কথা জেনে শুনেই শ্রীমতি গান্ধী কলকাতায় আসছেন। আগে নাকি জানা ছিল পাকিস্তান ৪ তারিখ আক্রমণ করবে। পরবর্তীকালে জানা গেল পাকিস্তানের ধারণা ভারত সরকার এ খবর পেয়ে গেছে। সুতরাং আক্রমণের তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। আরো জানা গেল, পাকিস্তান ভারতের পশ্চিম সীমান্তের সাতটি বিমানবন্দরে হামলা চালাবে। এ খবর জানতে পেরে ভারত সরকার নাকি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এ সকল বিমানবন্দর থেকে বিমান সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাখা হয়েছে নকল বিমান।
