একাত্তরের যুদ্ধ নিয়ে কোলকাতায় তখন তুমুল বিতর্ক। পশ্চিমবাংলায় তখন ভিন্ন রাজনীতি। নকশালবাড়িকে কেন্দ্র করে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে গেছে। সিপিআই (এম) থেকে বের হয়ে গিয়ে চারু মজুমদার ও কঙ্গল সাঁওতালের নেতৃত্বে সিপিআই (এমএল) গঠিত হয়েছে। এদের শ্লোগান কৃষি বিপ্লব। এদের কর্মসূচি শ্রেণিশত্রু খতম। এদের খতম অভিযানে ইতোমধ্যে অসংখ্য জোতদার নিহত হয়েছে। এদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। আহ্বান জানান হয়েছে সারা ভারতবর্ষে নকশালবাড়ির লাল আগুন ছড়িয়ে দেয়ার।
নকশাল আন্দোলনের প্রভাব তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও পড়েছে। এই আন্দোলন নিয়ে পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি শতধা বিভক্ত। এদের মধ্যে একটি উপদল নকশালবাড়ির অনুকরণে আন্দোলন গড়ে তুলবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শ্লোগান লেখা হচ্ছে দেয়ালে দেয়ালে।
পশ্চিমবঙ্গে এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হয়েছে বিভিন্নভাবে। কংগ্রেস এই আন্দোলনকে দমনের জন্যে বদ্ধপরিকর। সিপিআই এ ব্যাপারে কংগ্রেসের সাথে একমত। আরএসপির বক্তব্য হচ্ছে নকশালবাড়ির পন্থা সঠিক নয়। বিচ্ছিন্নভাবে কৃষি বিপ্লব করা যাবে না। কৃষি বিপ্লব মূল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে জড়িত। তবে নকশালবাড়ি আন্দোলনে যোগ নিয়ে যারা প্রাণ দিচ্ছে সেই তরুণদের লাল সংগ্রাম জানাতেই হবে। কারণ ভুল পথে হলেও ওরা সমাজতন্ত্রের আন্দোলনেই প্রাণ দিতে নেমেছে।
তবে এই আন্দোলনের সময় সবচেয়ে বিপদে পড়েছে সিপিআই (এম)। পশ্চিমবাংলায় তখন যুক্তফ্রন্ট সরকার। কংগ্রেস বিরোধী এই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি। এই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যোতি বসু। অর্থাৎ নকশাল আন্দোলন দমনের দায়িত্ব জ্যোতি বসুর। অথচ রাজনৈতিক কারণে জ্যোতি বসুর পক্ষে নকশালদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া সম্ভব ছিল না। এ পরিস্থিতিতে পশ্চিমবাংলার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। কংগ্রেস নতুন সরকার গঠন করে। কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী তখন সিদ্ধার্থশংকর রায়। সিদ্ধার্থশংকর রায়ের নেতৃত্বে নির্মমভাবে নকশাল বিরোধী অভিযান শুরু হয়। তবে শুধু নকশাল নয়, সারা পশ্চিমবঙ্গে তখন ত্রাসের রাজত্ব। তখন কোনো বামপন্থী কর্মী ঘরে থাকতে পারছে না। গভীর রাতে এলাকার পর এলাকা ঘেরাও করা হচ্ছে। তরুণদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। সেই তরুণরা আর বাড়ি ফিরছে না। সারা পশ্চিমবঙ্গে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ (সিআরপি) নামানো হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে সিআরপির নাম শুনলে শিশুরাও নাকি ভয়ে ঘুমিয়ে যায়। পশ্চিমবাংলার হাজার হাজার বামপন্থী তরুণ পুলিশের ভয়ে পশ্চিম বাংলা ছেড়ে গেছে। বামপন্থীদের বিরুদ্ধে এ অত্যাচার চালাচ্ছেন কংগ্রেস সরকার। আর এ কংগ্রেস সরকারের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আছেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। লাখ লাখ মানুষ পশ্চিম বাংলায় ও ত্রিপুরায় আশ্রয় নেয়। অসংখ্য তরুণ পাকিস্তান সরকারকে হটানোর জন্যে ভারতে যায়। তাদের লক্ষ্য তারা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেবে। মুক্তিবাহিনী গঠন করবে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন করবে। তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করবে ভারত সরকার।
ভারতের বামপন্থীদের কাছে এ বক্তব্য ছিল একান্তই অবিশ্বাস্য। পশ্চিমবাংলায় কংগ্রেস সরকার নির্বিচারে বামপন্থীদের হত্যা করছে। সমাজতন্ত্রীদের নিশ্চিহ্ন করছে। সেই কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দেবে এবং বাংলাদেশের একটি শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে, এ ধরনের বক্তব্য পশ্চিমবাংলার বামপন্থীদের কাছে ছিল একান্তই অবাস্তব।
তাই প্রথমদিকে বামপন্থীরা দূর থেকে এই আন্দোলন দেখার চেষ্টা করেছে। নিজেদের তেমন সংশ্লিষ্ট করেনি। শরণার্থীদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিশেষ করে তাদের বিস্মিত করেছে অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আচার-আচরণ এবং নিত্যদিনের জীবন যাপন। বলা হচ্ছে এদের নেতৃত্বেই নাকি বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। এদের মধ্যে অধিকাংশ সদস্যই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো কথা বলতে পারে না। তারা জানে না তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কোথায় আছেন, কিভাবে আছেন, কেন গ্রেফতার হয়েছে এবং আদৌও তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চান কি না। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সাথে ছাত্রলীগ নেতত্বের কোন্দলের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভারতের মাটিতে। কোনো কোনো ছাত্রনেতা বেসামাল অবস্থায় সাধারণ নাগরিকদের হাতে প্রহৃত হয়েছে। একসময় পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের মধ্যে বলাবলি হয়েছে, এই নেতাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে। তরুণদের প্রশিক্ষণ দেয়া হোক। তাহলে হয়তো বা কোনো দিন বাংলাদেশের নতুন কিছু ঘটতে পারে। মোট কথা ভারত সরকারের সহযোগিতায় আর বাংলাদেশের এই নেতাদের নেতৃত্বে শোষণমুক্ত বাংলাদেশ হবে, এই ধরনের কথাবার্তা বামপন্থীদের কাছে ছিল একান্তই হাস্যকর। তাই প্রতি পদে পদে ওদেশের বামপন্থীরা আমাদের সমালোচনা করেছে। বলেছে, আপনারা দেশ ছেড়ে কেন এসেছেন? কেন নিজের দেশ থেকে মুক্তির সংগ্রাম গড়ে তোলেননি? ভারত একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। ভারতের নেতৃত্ব পুঁজিবাদী। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আপনাদের শোষণমুক্ত রাষ্ট্র করে দেবে, এই তত্ত্ব আপনারা কোথায় পেলেন? মার্কস, লেনিন, মাও সেতুং বা চে-গুয়েভারার কোন বইতে এ ধরনের কথা আছে। আপনারা এখানে বসে ভারত সরকারের লেজুড়বৃত্তি করছেন। আবেগতাড়িত বাঙালি আপনাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে আর এই সুযোগে কংগ্রেস নিজের আসন পাকাঁপোক্ত করার চেষ্টা করছে।
