বারাসাতে আমার কাকাদের অনেক ছেলে-মেয়ে বসবাস করে। সেখানে গিয়ে বিপদ হয়ে গেল। সকলের কাছেই আমি গল্প। এদের সকলের জন্ম ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার পর। ওরা পূর্ব-পুরুষের ভিটির গল্প শুনেছে। আমার কাছে তারা অনেক কিছু জানতে চায়। সকলেই থাকতে চায় কাছাকাছি। কিন্তু আমার সময় কোথায়।
একদিন এক কাণ্ড ঘটল কোলকাতার কাছে যাদবদুরে। এক আত্মীয়ার সাথে বাসে যাচ্ছিলাম। মাঝখানে এক তরুণী ওই বাসে উঠল এবং কিছুক্ষণ পর নেমে গেল। আমার আত্মীয় বললেন, এই মেয়েটিকে আপনি চেনেন? ওই মেয়েটি আপনার এক কাকার কন্যা। অর্থাৎ আপনার বোন। আপনাদের কারো কাউকে চিনবার কথা নয়। আগে খেয়াল করলে আপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতাম।
মাঝখানে একদিন শিয়ালদহ থেকে বাসে কাকুরগাছি যাচ্ছিলাম। বাসে একটি কণ্ঠ শুনে আমি চমকে উঠেছিলাম। কণ্ঠ আমার এক সতীর্থের। ওর নাম দেবু। দেব্রত মুখার্জি। বরিশাল জেলার কলসকাঠিতে আমার সাথে সপ্তম শ্রেণিতে পড়তো। সপ্তম শ্রেণির পর দেবু আর ক্লাসে আসেনি। ১৯৪২ সালে আমি নবম শ্রেণির ছাত্র। তখন কংগ্রেসের আহ্বানে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়। কলসকাঠির ডাকঘরের সামনে জনসভা হয়। জনতা ডাকঘর পুড়িয়ে দেয়। তাকিয়ে দেখলাম প্রথম সারিতে দেবু। আমাদের দায়িত্ব ছিল তখন স্কুলে ধর্মঘট করা এবং পুলিশে খবর নেয়া। দেবু গ্রেফতার হয়ে গেল। কাগজে পড়েছি দেবুকে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ১৯৪৪ সালে আমি বরিশাল কলেজে পড়তে গেলাম। দেবু তখন জেলে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ চলে যাবার আগে দেবুরা জেলখানা থেকে মুক্তি পায়। দেবু আর দেশে থাকেনি। দেবু দেশান্তরী। যে দেশ স্বাধীন করার জন্যে দেবুর দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল সেই দেবু নিজের দেশে থাকেনি। দেবু ভিন্ন দেশে দেশান্তরী। সেই দেশে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম ১৯৭১ সালে। দীর্ঘদিন পরে হলেও দেবুর কণ্ঠ আমার কানে বাজছিল। বাসে দেবু বাংলাদেশের পক্ষে তর্ক করছিল। দেবুর সে কণ্ঠ আমার বড় চেনা। কিন্তু দেবুর সাথে আমার কথা বলা হয়নি। হঠাৎ একটি স্ট্যান্ডে দেবু নেমে গেল। বলি বলি করেও দেবুর সাথে আমার কথা বলা হয়নি।
ভারত বিভক্তির ৫০ বছর। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ২৬ বছর পর এ কাহিনী। সেকালের মন না হলে একালের মানুষ আমার লেখায় আদৌ আকৃষ্ট হবে না। আজকের প্রজন্ম সেকালের কাহিনী জানে না। ১৯৪০ সালে যে শিশু জন্মেছে তারও স্মরণে নেই ৪৭-এর দাঙ্গা আর দেশান্তরী হওয়ার কথা। আজ পাকিস্তানের করাচিতে লাখ লাখ বাংলাদেশের বাঙালি। বনগাঁও সীমান্ত থেকে শিয়ালদহ স্টেশন পর্যন্ত দেশান্তরী বাঙালি হিন্দুদের একের পর এক কলোনি। পশ্চিম আর পুর্ব পাঞ্জাবে এপার আর ওপারের লোক। লাখ লাখ পরিবার বিভক্ত এবং ধর্মান্তরিত।
সেদিনের কথা। পাকিস্তানের পাঞ্জাব থেকে একটি পরিবার ১৯৪৭ সালে শরণার্থী হয়ে ভারতের পাঞ্জাবে এসেছিল। ফেলে এসেছিল বাচ্চা শিশুকে। ৫০ বছর পর সে বাচ্চাও প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেছে। দেশ ভাগের ৫০ বছর পর মাতা ও পুত্রের মিলন হয়েছিল। পাড়া প্রতিবেশি বলেছিল তোমার ছেলে তো মুসলমান হয়ে গেছে। মায়ের জবাব হচ্ছে–ওর ধমনীতে প্রবাহিত রক্ত তো আমার।
এত কথা আজকে ভাবলেও ১৯৭১ সালে ভাবিনি। ভাবিনি বলেই মাকে বলেছিলাম দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই তোমার সাথে দেখা হবে।
অনেক আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা না করেই ১৯ জুলাইতে যুদ্ধের মধ্যে ফিরেছিলাম বাংলাদেশে। তারপর নভেম্বরে আবার কলকাতায়। কলকাতায় গিয়ে এবারেও সকলের সাথে দেখা করা যাচ্ছে না। মন খুবই বিব্রত। আরএসপির আস্তানায় থাকি। রাজনীতিকরা জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে তো। নাকি আপনাদের পাকিস্তানে ফিরে যেতে হবে। সব কথার জবাব দিতে পারিনি। আত্মীয়-স্বজনদের কাছে গেলেও একই কথা জিজ্ঞেস করে। তাদের আশা যুদ্ধ বেশি দিন চললে হয়তো আমার আর যাওয়া হবে না। আমি হয়তো চিরদিনের জন্যে ওদের কাছে থেকে যাব।
আমার দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব অন্যত্র। আমার মনে প্রশ্ন এই যুদ্ধ শেষ হবে কী করে? ভারত সরকারের শ্রেণি চরিত্র আমি জানি। ভারত একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা করবে কোন স্বার্থে আমরা এ যুদ্ধকে বলছি মুক্তিযুদ্ধ। আমরা বলেছি শোষণমুক্ত বাংলাদেশের কথা। আমার দ্বন্দ্ব হচ্ছে–ভারত শোষণমুক্ত বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্যে সাহায্য করবে কেন? এ যুদ্ধ ক্রমাগত ভিন্ন রূপ নিচ্ছে। এলাকায় এলাকায় নিজস্ব বাহিনী গড়ে উঠেছে। এ বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই কঠিন হবে। এ সকল বাহিনী হয়তো একদিন মুক্ত অঞ্চল সৃষ্টি করবে। সত্যিই সেদিন হয়তো শুরু হবে শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের সংগ্রাম।
কিন্তু ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কী করে দূরে বসে এ ছবি দেখবে। এ পরিস্থিতি নিশ্চয়ই তাদের কাছে কাম্য নয়। তাই এদের পাকিস্তানের সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। হয়তো সমঝোতার ভিত্তিতে আমাদের দেশে ফিরতে হবে যুদ্ধ অসমাপ্ত রেখে। কলকাতায় গিয়ে মোশতাক সাহেবদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনে এ কথাই আমার বারবার মনে হয়েছে। সকলকে মুখে বলেছি দেশ স্বাধীন করেই বাড়ি ফিরব। কিন্তু নিজে কষ্ট করে বুঝতে বা বোঝাতে পারিনি সেটা কিভাবে সম্ভব হবে। আমাদের বই পুস্তকে বুর্জোয়াদের এ ধরনের ভূমিকা তেমন উল্লেখ নেই। এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি কোনো দেশে। তাই বারবার মনে হয়েছে এবার আমরা স্বাধীন হলেও কোথায় যেন একটা কিন্তু থেকে যাবে।
