আমিও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। কিন্তু তরুণের এই পথ নিয়ে আমার সঙ্গে মতান্তর আছে। আমি মনে করি কৃষি বিপ্লব ক্ষমতাসীন সরকার উচ্ছেদের আন্দোলন থেকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কৃষি বিপ্লব করতে গেলে জোতদারের পক্ষে ক্ষমতাসীন সরকারের পুলিশ আসবে লাঠি, বেয়োনেট এবং গুলি নিয়ে। তাই ওই সরকারকে উচ্ছেদ করতে না পারলে জোতদারদের উচ্ছেদ করা যাবে না। সমগ্র সমাজ ব্যবস্থাটাকে হত্যা করতে না পারলে একজন জোতদারকে হত্যা করে সমাজ ব্যবস্থাকে পাল্টানো যাবে না।
এ হচ্ছে আমার বিশ্বাস। এ বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও আমি ওই তরুণের দিকে তাকিয়েছি। বারবার তাকিয়েছি। ভাবতে চেষ্টা করেছি। কী তাড়নায় ঘর ছেড়েছে। বাড়ি ছেড়েছে। সংসার ছেড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নেমেছে।
এই কথাগুলো চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর আমি বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গের কমরেডদের লিখে পাঠিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, দীর্ঘদিন আপনারা আন্দোলন করছেন। কিন্তু চারু মজুমদারের মতো এমন করে তরুণদের নাড়া দিতে পারেননি। উদ্বুদ্ধ করতে পারেননি এমন করে জীবন যুদ্ধে নামার জন্যে। চারু মজুমদারের পথ ভুল হতে পারে। ভ্রান্ত পথে গিয়ে অসংখ্য তরুণ প্রাণ দিতে পারে। কিন্তু একথা সত্য, চারু মজুমদার তরুণ সমাজের দুঃখ, বেদনা, ক্ষোভ এবং বিক্ষোভের কারণ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি স্বল্পকালে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন। আমাদের অন্যান্য বামপন্থী বন্ধুরা তত্ত্বের ব্যাখ্যায় সঠিক হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে সেই তত্ত্বের প্রয়োগ করতে পারেননি। জীবন দেয়া নেয়ার নেশা সৃষ্টি করতে পারেননি তরুণদের মনে। তাই সকল সমালোচনা সত্তেও চারু মজুমদারকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান এবং মর্যাদা দিতে হবে। সেকালে আমার বক্তব্য বিভিন্ন মহলে আলোচিত এবং সমালোচিত হয়েছে।
সে অনেক দিন আগের কথা। স্বাধীন হওয়ার অনেক পরেই একথা লিখেছিলাম, চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর। একাত্তরের নকশালপন্থী ছেলেদের সঙ্গে আলোচনা করার পর এ ধরনের একটি ধারণা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। তবে সে ধারণার সঙ্গে আমার সেদিনের ট্রেনযাত্রা কিংবা রামপুরার ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। রামপুরার ঘটনার দীর্ঘক্ষণ পর কলকাতায় পৌঁছেছিলাম।
কলকাতায় আমার অনেক রকমের বিপদ। ২৩ বছর পর কলকাতায় গিয়েছি। মা, ভাই, বোনদের ধারণা ছিল আম সঙ্গে তাদের কোনোদিন দেখা হবে না। পাকিস্তান সরকার আমাকে পাসপোর্ট দেবে না। জীবনটা জেলখানায়ই কাটবে। আমি ভারতে গিয়েছি এ খবর কারও বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাদের কাছে আমি খরচের খাতায়। একদিন মধ্যম গ্রামে গিয়েছিলাম। পথের মাঝখানে এক খুড়তুতো বোনের সাথে দেখা। ২৫ মার্চের পর তিনি আমাদের খবর পাচ্ছিলেন না। ২৭ মার্চ থেকে তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বড় সড়কের পাশে বসে থাকেন। বাংলাদেশের কোনো লোক পেলে আমাদের কথা জিজ্ঞেস করেন। এমনি করে বসে থাকতে হয়েছে পরপর তিন মাস। মে মাসে আমি পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছলে খবর পেয়েছিলেন যে আমি এবং আমরা ভালো আছি। ঢাকুরিয়ায় আমার বড় বোনের বাসায় গিয়েছিলাম। প্রথমে তিনি আমাকে চিনতেই পারেননি। প্রায় বিদায় নিচ্ছিলেন দোরগোড়া থেকে। শেষ পর্যন্ত আমাকে চিনেছিল আমার এক ভাগ্নে। দিদির কথা হলো তিনি নাকি শুনেছেন আমি রাশিয়া চলে গেছি।
আমার এক বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম। আমার বন্ধু বড় প্রকৌশলী। বরিশালে আমার সাথে এক কলেজে পড়ত। রাজনীতি করত বলে তার মায়ের আক্ষেপ ছিল। তার মায়ের ধারণা আমার জন্যে তার ছেলে রাজনীতি করে। তার ছেলে বোমার মামলায় পড়েছিল বরিশালে। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর তারা সপরিবারে ভারত চলে যায়। এবার দেখলাম আমার বন্ধুর মা ভিন্ন মানুষ। আমার জন্যে নিদারুন সহানুভূতি। ছেলেকে ডেকে বললেন নির্মলকে বল, এবার কোলকাতায় থেকে যেতে। যে দেশে গেলে জেলে থাকতে হয়, সে দেশে গিয়ে ওর লাভ নেই। আমি বললাম, আমি তো থেকে যেতে আসিনি। আমার শিকড় তো আমার জন্মভূমিতে। আমাকে সেখানে ফিরে যেতে হবে।
কাকুড়গাছিতে কাকার বাসায় গিয়েছিলাম। কাকীমা কেঁদে আকুল। তাঁর ধারণা ছিল আমার সঙ্গে কোনোদিন দেখা হবে না। বাগুইআটিতে ছোট কাকা থাকেন। দেখা হতেই বললেন, মুজিবর কোথায়? আমার কাকারা শেখ সাহেবকে মুজিবর বলে ডাকতেন। শেখ সাহেবের কথা বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন। টুঙ্গীপাড়ায় শেখ বাড়ির সাথে আমার এই দুই কাকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এরা ডাক্তারি করতেন টুঙ্গীপাড়া থানার পাটগাতীতে।
তাদের প্রথম প্রশ্ন, শেখ সাহেব কোথায় আছেন, কেমন আছেন? তার বাড়ির অবস্থা কি? শেখ সাহেবের বাবা-মা কোথায়? তাদের খোঁজ-খবর নিয়েছি কি না? এই পরিবারের খোঁজ নিতেই আমি ২৫ মার্চের পর পাটগাতী গিয়েছিলাম। বন্ধুরা জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। তাই তাদের সব প্রশ্নের জবাব আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব ছিল না।
আমার বড় ভাই থাকেন কোলকাতা থেকে ৯০০ কিলোমিটার দূরে মধ্য প্রদেশে। ওই সময় তার কাছে যাবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। মা থাকেন দুই ভাইয়ের সাথে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে। আমার খবর পেয়ে মা দুই ভাইকে কোলকাতা পাঠিয়েছিলেন আমাকে নেয়ার জন্যে। ভাইদের সাথে দেখা হবে না। আমাকে যুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরতে হবে। তোমার সাথে দেখা হলে তুমি আমাকে বাংলাদেশে ফিরতে দেবে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ সাহেব আমার বাগুইআটির কাকাকে আনবার জন্যে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কাকা ছিলেন টুঙ্গীপাড়ার শেখ বাড়ির পারিবারিক ডাক্তার। আমি একমত হইনি। আমি বলেছিলাম কাকা ভারতীয় নাগরিক। বাংলাদেশে এলে অসুবিধায় পড়বেন। আর দেশের যে অবস্থা তাতে আমার মনে হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করা খুব কঠিন হবে। শেখ সাহেব কলকাতায় লোক পাঠিয়েছিলেন ছোট কাকার কাছে। ছোট কাকা আসেননি।
