কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। ওরা আমাদের বাসা পর্যন্ত ধাওয়া করল। প্রতিবেশিদের ডাকতে হলো মীমাংসার জন্যে। আমরা পরিস্থিতি এড়াবার জন্যে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম। চলে গেলাম গৌহাটি স্টেশনে। কোনোমতে ট্রেনে চেপে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
ট্রেন ছাড়বার পর মনে হলো, এ কোন পরিবেশে এসে পৌঁছলাম। আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে ভারতে এসেছি। আমরা তাদের আতিথ্য গ্রহণ করেছি। সর্বত্রই স্নেহ এবং ভালোবাসা পেয়েছি। কিন্তু এমন পরিবেশের মুখোমুখি হইনি। আগের রাতে জুয়াইতে খাসিয়াদের আক্রমণ এবং পরের দিন গৌহাটিতে অসমিয়াদের আক্রমণ আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমরা এসেছি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে। আর ওরা যুদ্ধে নেমেছে বাঙালিদের বিরুদ্ধে। ওদের আন্দোলন, বাঙাল খেদাও আন্দোলন। আমাদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন উঠবে–ওরা তাহলে বাঙালিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে কেন? তাহলে ওদের কাছে কি বাঙালিরা আমাদের কাছে পাকিস্তানীদের মতো। বাঙালিরা কি এখানে শোষক? নাকি বহিরাগত এবং ভিন্ন ভাষাভাষি বলে ওই এলাকায় বাঙালিরা অবাঞ্ছিত?
ভারতের পূর্বাঞ্চলে এ পরিস্থিতির একটি তাৎপর্য আছে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতি স্বাধীনতা আন্দোলন করছে। এই আন্দোলনের সঙ্গে কখনো বামপন্থী ছাপ আবার কখনো ডানপন্থী নেতৃত্ব আছে। আমার মনে হয়েছে এই আন্দোলনে ডানপন্থী প্রভাব থাকার ফলে শোষণবিরোধী আন্দোলন জাত-পাত সম্প্রদায় এবং কখনো বহিরাগত বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আমার সেদিন মনে হয়েছে এ আন্দোলন সঠিক নেতৃত্ব না পেলে ভারতের সমগ্র পূর্বাঞ্চলে নেতৃত্বে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে চলে যাবে এবং বিদেশীরা সে সুযোগ নেবে।
সারারাত আমাকে ট্রেনে এ ধরনের একটি চিন্তা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। কখন ঘুমিয়েছি কখন আবার জেগেছি। এক সময় চোখ খুলে দেখলাম, আমার সামনে অনেক তরুণ বসে আছে। পরনে লুঙ্গি এবং জামা। বড্ড ক্লান্ত, শ্রান্ত এবং বিপর্যস্ত। দেখেই মনে হলো ওরা মুক্তিবাহিনীর সদস্য। বলল, তারা তরঙ্গপুরে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ওদের দলটি যাবে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর অকেজো করে দেয়ার জন্যে। কিন্তু ওদের তেমন অস্ত্র দেয়া হয়নি। বলা হয়েছে স্থানীয়ভাবে ওরা সাহায্য এবং সহযোগিতা পাবে। ওদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এক সময় বুঝতে পারলাম, ওরা ফ্রিডম ফাইটার্স অর্থাৎ এফএফ গ্রুপের লোক। ওরা বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বিএএএফ অর্থাৎ মুজিববাহিনীর লোক নয়। মুজিববাহিনীর লোক হলে এমন বিপর্যস্ত হতে হতো না। ওরা অস্ত্র পেত। ওদের কোনোই অসুবিধা হতো না।
আগরতলা থাকতেই শুনেছি মুজিববাহিনীর কথা। শুনেছি এফএফের কথা। এফএফ-এ অনেক আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের কর্মী থাকলেও অন্যান্য দল এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারাই ছিল এফএফের সদস্য। মুজিববাহিনী ছিল একান্তভাবে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সদস্য দ্বারা গঠিত। এই দুই বাহিনীর তফাৎ ছিল আসমান জমিন। আগরতলায় থাকতে এই অভিযোগ শুনেছি। এবার নিজের চোখে দেখলাম।
সামনে তরঙ্গপুর থেকে আসা এই মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার এবং চলবার মতো পয়সা পর্যন্ত নেই। এদের মধ্যে অনেকেরই বয়স ১৫ থেকে ২০। এরা কোনোদিন দেশের বাইরে যায়নি। আবেগের তাড়নায় মুক্তিযুদ্ধে এসেছে। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে নেমেছে। আমি ওদের প্রায় সকলের সঙ্গে কথা বললাম। ট্রেনে খাওয়ালাম। ওরা গভীর রাতে ফারাক্কা স্টেশনে নেমে গেল। আর ওই স্টেশনের নামটি আমাকে চমকে দিল। এখান থেকেই গঙ্গা কিছু দূরে গিয়ে পদ্মা নাম ধারণ করে বাংলাদেশে ঢুকেছে। এখানেই সেই ফারাক্কা ব্যারেজ। আমাদের জীবন-মরণ সমস্যার অঙ্গ।
ফারাক্কায় মুক্তিযোদ্ধারা নেমে গেলে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম এই বাচ্চারা কী করবে। কিন্তু দু’দিন পরে কোলকাতা পৌঁছে ঈশ্বরদি বিমানবন্দরে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের খবর পেয়েছিলাম। তারপর আর ওদের খোঁজ নিইনি। আজ ২৬ বছর পর বলতে লজ্জা নেই যে, যাদের খোঁজ নেয়ার একান্তই প্রয়োজন ছিল, তাদের খোঁজ কোনোদিনই নিলাম না। তবে সেদিন কোলকাতায় পৌঁছানো তেমন সহজ হয়নি। পশ্চিম বাংলায় তখন। নকশাল আন্দোলন তুঙ্গে। গ্রামে গ্রামে পুলিশ। বীরভূমে নকশালদের প্রচণ্ড প্রভাব। এক সময় ট্রেন রামপুরা স্টেশনে থামল। একদল পুলিশ এসে আমাকে ঘেরাও করল। বলল তাদের সঙ্গে আমাকে যেতে হবে। আমার পরনে পাজামা পাঞ্জাবি এবং মুখ ভর্তি দাড়ি। পুলিশের কথায় আমি নাকি একজন নকশালদের নেতা। আমাকেই তারা খুঁজছে। তারা একান্তভাবেই নিশ্চিত, এই কক্ষে আমি উঠেছি এবং আমিই সেই লোক। পুলিশের কথা শুনে প্রথম খানিকটা চমকে গেলাম। বন্ধুরা অনেক যুক্তি দিল। আমিও অনেক কথা বললাম। কিন্তু পুলিশ নাছোড়বান্দা। ট্রেন তখন ছেড়ে দিয়েছে। পুলিশ বলল সামনের স্টেশনের তাদের সঙ্গে আমাকে নেমে যেতে হবে। আমি সামনের স্টেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। এবার ট্রেন থামলে একজন অফিসারসহ আরেক দল পুলিশ উঠল। তারাও আমার কাছেই এল। তবে আমরা সবাই মিলে পুলিশকে বোঝাতে পারলাম, আমি সেই ব্যক্তি নই। আমি বাংলাদেশের লোক। নেমে যাবার আগে পুলিশ অফিসার বলল এই চেহারা এবং পোশাকে পশ্চিমবঙ্গে ঘোরাফেরা করা একান্তই ঝুঁকিপূর্ণ। পরবর্তী স্টেশনে পুলিশ নেমে যেতেই দেখলাম টয়লেট থেকে ঠিক আমার চেহারার এক যুবক বেরিয়ে এল। সবাই তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল। দেখলাম সে যুবক সব খবরই জানে। সে আমার কাছে এসে বলল, আমার জন্যেই আপনার অসুবিধা হয়েছে। আপনাকে আমার বলার কিছুই নেই। আমি অবাক বিস্ময়ে তরুণের দিকে তাকালাম। তার খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করিনি। সে তরুণ চারু মজুমদারের দলের সদস্য। সে কৃষি বিপ্লব করতে চায়। শ্রেণিশত্রু খতম করতে চায়। শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে চায়।
