যতদূর মনে আছে সেদিন ছিল শনিবার। বেলা দু’টোর দিকে আমরা ট্রাকে উঠলাম। ড্রাইভারের পাশে আমাদের বসার জায়গা। বসতে কোনো অসুবিধা নেই। দূর পাল্লার ট্রাকের ড্রাইভারের পাশে বসে যাতায়াত ভারতে স্বাভাবিক ঘটনা। বিশেষ করে আগরতরা গৌহাটী রুটে এটা প্রতিদিনের দৃশ্য। তাই ট্রাকে দীর্ঘপথ যাওয়া আমাদের কাছে তেমন অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। এ পথে জুন মাসে আমি একবার চড়ইবাড়ি এবং করিমগঞ্জ হয়ে কলকাতায় গিয়েছিলাম।
এ তো যাত্রা নয়, যেন এক অভিযান। যাত্রা পথ অসমতল। ট্রাক পাহাড়ে উঠছে আর নামছে। ওঠা নামার যেন শেষ নেই। গভীর রাতে আমরা একটি বাজারে পৌঁছলাম। সেখানেই খাওয়া-দাওয়া সেরে রাতে ঘুমাতে হলো। ভোররাতে যাত্রা শুরু হলো নতুন পথে। এবার বদরপুরের পাহাড়। পাহাড়ের পাশে একটি মাত্র সড়ক। মুষলধারে বৃষ্টি হলে মাটির পাহাড় ভেঙে পড়ে সড়কে। সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। এ সড়কে দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলতে পারে না। এ সড়কে ঢুকতে গেলে প্রবেশ পথে একদিকে বিরাট উঁচু পাহাড়। আর একদিকে হাজার হাজার ফুট নিচে খাদ। এই খাদের দিকে তাকানো যায় না। দূরে বাংলাদেশ সীমান্তের তামাবিল। খাদের দিকে তাকালে মনে হয় যে কোনো সময় গাড়ি হয়তো খাদে পড়ে যাবে।
তবে সে সময় গাড়িতে এত কথা ভাবার অবকাশ ছিল না। সহযাত্রী হিসেবে অপূর্ব ব্যক্তিত্ব কমরেড খান সাইফুর রহমান। তার জানার এবং কৌতূহলের কোনো সীমা নেই। সবকিছু যেন তার নখদর্পণে। মাঝপথে আমাদের ট্রাকে একজন যাত্রী উঠেছিল। খান সাহেবের ধারণা ওই যাত্রী মিজোরামের বিদ্রোহীদের কোনো লোক হবে। তখন মিজোরামেও বাংলাদেশের মতো অগ্নিগর্ভ। মিজোরামও স্বাধীনতা চাচ্ছে। এ ব্যাপারে খান সাহেব খুব কৌতূহলী। তার ইচ্ছে ওই যাত্রীর নিকট হতে অনেক কিছু জানা যাবে। কিন্তু ওই যাত্রী নিরব। সে কোনো কৌতূহলই দেখাল না। এক সময় গন্তব্যস্থলে নেমে গেল।
তবে এরা যে কী চায় সন্ধ্যার দিকে আমরা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলাম। আর মেঘালয়ের জেলা শহর জুয়াইতে একটি ঘটনা আমাদের বিস্মিত করেছিল। জুয়াই-এর পথে সামরিক বাহিনীর এক জোয়ান আমাদের ট্রাকে উঠেছিল। বসেছিল আমাদেরই পেছনে রাখা পণ্যের ওপর। কারণ ড্রাইভারের পাশে তার আসন হয়নি। তার সঙ্গে কোনো কথা হওয়ার সুযোগ ছিল না। জুয়াই শহরে ঢুকতে দূরে ট্রাফিক পুলিশ দেখে সেই জোয়ান তড়িঘড়ি করে ট্রাক থেকে নেমে গেল। সে বললো এভাবে ট্রাক যাওয়া ট্রাফিক আইন বিরোধী। এ অপরাধে ট্রাফিক পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারে। তাই সে নেমে দাঁড়িয়েছে।
আমরা অবাক বিস্ময়ে তার কথা শুনছিলাম। আমরা ভাবতেই পারছিলাম যে একজন সামরিক বাহিনীর জোয়ান ট্রাফিক পুলিশকে ভয় পেতে পারে। পাকিস্তানে বছরের পর বছর আমরা সামরিক আইন দেখেছি। আমরা দেখেছি ভয়ের শাসন। কাউকে তোয়াক্কা না করবার আস্ফালন। সেই সামরিক বাহিনীর জোয়ান একজন ট্রাফিক পুলিশকে দেখে ভয় পাচ্ছে। এ ধরনের আইনের শাসনের কথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম।
জুয়াই শহরে ঢুকতে শোনা গেল, ওই শহরে সান্ধ্য আইন জারি হয়েছে। সব দোকানপাট বন্ধ। খাসিয়াদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে বাঙালি অসমিয়াদের। এ ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। আমাদের ড্রাইভার বাঙালি। ড্রাইভার একটি বাঙালি হোটেল খুঁজবার চেষ্টা করে। ভুলে আমরা একটি খাসিয়া হোটেলে ঢুকেছিলাম। তারা আমাদের পত্রপাঠ বিদায় দিল। বলল, পাশে বাঙালি হোটেল আছে।
আমরা বাঙালি হোটেলের সন্ধান পেলাম। বাঙালি হোটেলগুলো কিছুতেই দুয়ার খুলছে না। অনেক ডাকাডাকির পর ওরা দুয়ার খুলেই বলল, তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকুন। দুয়ার খোলা রাখলেই বিপদ। খাসিয়ারা সুযোগ পেলেই হোটেলে ঢুকবে। সারারাত মদ খাবে, মাতলামি করবে, পয়সা দেবে না। ওদের কিছু বলতে গেলে দাঙ্গা বেঁধে যাবে। সুতরাং হোটেলে ঢুকলেই দরজা বন্ধ করা হবে।
রাতে ওই হোটেলই কাটিয়েছি। ভেবেছি এ কোন জীবন! এই বাঙালিদের অধিকাংশই এককালের বাংলাদেশের লোক। দীর্ঘদিন পূর্বে এরা বৃহত্তর আসামে এসেছিল। বন কেটে বসতি গড়েছিল। স্কুল কলেজ করেছে। স্থানীয় অধিবাসীরা একদিন শিক্ষিত হয়ে দেখেছে সবকিছুর দখলদার বিদেশি বাঙালি। তাই স্লোগান উঠেছে ‘বাঙালি হটাও’। আমরা বাংলাদেশে স্লোগান দিয়েছি ‘অবাঙালি হটাও’। এই দুই শ্লোগানের সুর অভিন্ন হওয়ায় আমাদের সংগ্রামের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেক সময় সংকটে পড়তে হয়েছে।
কারণ আগের আসাম নেই। আসাম এখন ছয় ভাগে বিভক্ত–অসম, মিজোরাম, অরুণাচল, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়। এই ছয় ভাগের মানুষই তখন স্বাধীনতার দাবি করছে। তাদের সংগ্রাম বাঙালিদের বিরুদ্ধে।
সুতরাং তারা আমাদের সুনজরে দেখবে না তা বলাই বাহুল্য। তার প্রমাণ গৌহাটিতেও মিলেছিল।
গৌহাটি গিয়ে আর এক বিপদে পড়ে গেলাম। উঠেছিলাম এক রাজনৈতিক বন্ধুর বাসায়। বিপদ হলো দোকানে খেতে গিয়ে। অসমিয়ারা অদ্ভুত প্রকৃতির। ওরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলে। কিন্তু বাঙালিরা এলেই কথার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নিখাদ অসমিয়ায় কথা বলতে শুরু করে। অসম্ভব হিংসে করে বাঙালিদের। নিজেদের ভাষায় যা খুশি তা বলতে শুরু করে। আমাদের সঙ্গে ইন্ডিয়ার চন্ডী। চন্ডী এক সময় আমাদের কাছে ওদের সম্পর্কে কটুক্তি করে। অসমিয়ারা মারমুখী হয়ে আসে। কোনোমতে, খাওয়া শেষ করে হোটেল থেকে আমাদের পালাতে হলো।
