ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এ সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে তাঁর দুটি বক্তব্য ছিল। তিনি বলেছিলেন এক কোটি শরণার্থী ভরণ-পোষণ করা ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। ভারতের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে হয়তো ভারতকে কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তাঁর দ্বিতীয় বক্তব্য ছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়া হোক। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশ সমস্যার সমাধান করা হোক। এটাই ভারত সরকারের একমাত্র আবেদন।
এ বক্তব্য নিয়ে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করেন। সাধারণ মানুষের সমর্থন পেলেও কোনো সরকারের কাছ থেকেই তিনি সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পারেননি। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরকালে প্রকাশিত যুক্ত ইশতেহারে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমবারের জন্যে পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যবহারে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট পদগর্নির আলজিরিয়া সফরকালে যে যুক্ত ইশতেহার প্রকাশিত হয়, সেই ইশতেহারে পূর্ব পাকিস্তান শব্দই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ একমাত্র রুশ-ভারত ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি ছাড়া বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো কিছুই ভারতের পক্ষে ছিল না। এই পটভূমিতে ভারতকে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
অক্টোবর পর্যন্ত আমি আগরতলায় ছিলাম। তখন আমাদের দলের আহ্বায়ক বাংলাদেশ হতে আগরতলা পৌঁছেছেন। আমার সঙ্গে আসা মোসাদ্দেক হোসেন স্বপন কমরেড মিসির আহমেদের সঙ্গে কলকাতায় চলে গেছেন। কোলকাতায় দলের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং বিভিন্ন এলাকা সফর করছেন। কুমিল্লার কমরেড আলী আক্কাস সোনামুড়াতে আছেন। তিনি কুমিল্লার বাগমারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষক সমিতির নেতা। তার এলাকা আলীশ্বরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁরা সবাই আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতের ত্রিপুরায়। ভারতের ত্রিপুরায় তখন কী এক ভিন্ন রূপ। সকলেই বাঙালি। একদল বাঙালি ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর ত্রিপুরায় আশ্রয় নেয়। তাদের অধিকাংশ আত্মীয়-স্বজনই থেকে গিয়েছিল বাংলাদেশে। সেই আত্মীয়-স্বজনই একাত্তর সালে আশ্রয় নিয়েছে ত্রিপুরায়। ত্রিপুরার ভাষা একান্তভাবে কুমিল্লা ও নোয়াখালীর ভাষা। সকলের কাছেই মুক্তিযোদ্ধার আদরের ধন। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষগুলোকে তারা সাগ্রহে জায়গা দিয়েছে। তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছে প্রতিদিনের দুঃখ ও কষ্ট। তাদের মনেও ক্ষীণ আশা জেগেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে হয়তো আবার দেশে ফিরতে পারব।
কিন্তু এ চিত্র যেন কিছুটা চির খেল অক্টোবরে। তখন আগরতলায় বোঝা যাচ্ছিলো যুদ্ধ এগিয়ে আসছে। দিনে দুপুরে ট্যাংক চলছে রাজপথে। অশ্বারোহী সৈন্য মার্চ করছে। সীমান্তে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ছে। মাঝে মাঝে পাকিস্তানি গোলা আগরতলা শহরে এসে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আগরতলা শহর। বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। আট মাস কেটে যাচ্ছে। আগরতলাবাসী অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। দীর্ঘদিন পরে তাদের হয়তো মনে হচ্ছে, এ যুদ্ধ তো তাদের নয়। অন্যের যুদ্ধের জন্যে তারা সবকিছু হারাচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। শহরে থাকার জায়গা নেই। পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৃত্যুর ভয়। লক্ষ করা গেলো আগরতলা শহরে পাকিস্তানি গোলা পড়ার পর সকলেই যেন ভীত।
এমন পরিস্থিতিতে এক সন্ধ্যায় আবার পাকিস্তানি গোলা এসে আগরতলা শহরে একটি এলাকা বিধ্বস্ত করল। শহরে তখন নিষ্প্রদীপ মহড়া। আমার মনে হলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় একবার যাওয়া উচিত। আমাদের জন্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীরা অতিষ্ঠ। তাদের সহানুভূতি দেখানো প্রয়োজন। রাজপথে নেমে দেখলাম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকেরা সকলেই একই ধরনের চিন্তা করছে। তারাই এই গোলাগুলির মধ্যে সাহস করে রাজপথে নেমেছে। রাজপথ তখন লোকে লোকারণ্য। দীর্ঘক্ষণ রাজপথে ঘোরাঘুরি করে আমরা আশ্রয়ে ফিরলাম।
নভেম্বরের প্রথমে স্পষ্ট হয়ে উঠল যে যুদ্ধ আসন্ন। এই যুদ্ধ নিয়ে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হবে কোলকাতায় অর্থাৎ স্বাধীন বাংলা সরকারের সদর দফতরে। সুতরাং আমাদের পক্ষে আগরতলায় থাকার কোনো অর্থ হয় না। আগরতলার সব দায়িত্ব কমরেড মিসির আহমেদকে বুঝিয়ে দিয়ে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা কলকাতা যাত্রা করলাম।
বিচিত্র এক দেশ ভারত। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়া সময় সাপেক্ষ এবং ব্যয় সাপেক্ষ। আগরতলা থেকে বিমানে এবং সড়কপথে কলকাতায় যাওয়া যায়। আবার আগরতলা থেকে একশ’ আটাশ মাইল সড়ক পথে গিয়ে ট্রেনে মেঘালয় এবং আসাম ঘুরে কলকাতায় যাওয়া যায়। আবার আগরতলা থেকে পণ্যবাহী ট্রাকের যাত্রী হয়ে গৌহাটি পৌঁছে ট্রেনে কলকাতায় যাওয়া যায়। বিমান যাত্রা ব্যয় সাপেক্ষ। আর একশ’ আটাশ মাইল দুরে ধর্মনগর গিয়ে ট্রেনে কলকাতায় যাওয়াও অনিশ্চিত। গৌহাটী যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম ট্রাকে। আমরা যাত্রী তিনজন– আমি, খান সাইফুর রহমান এবং ইঞ্জিনিয়ার চন্ডী চক্রবর্তী। এক সময় চন্ডী চক্রবর্তীর বাড়ি ছিল বাংলাদেশের কুমিল্লায়। তাদের পরিবারের সকলেই আরএসপির সদস্য বা সমর্থক। সেই সূত্রে চন্ডীর সঙ্গে আমাদের পরিচয়। চন্ডী আগরতলার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যাপক। চন্ডীর মা বাবা কোলকাতায় থাকেন। চাকরির জন্যে চন্ডী থাকে আগরতলায়। চণ্ডী আমাদের সঙ্গে থাকায় আমাদের অনেক সুবিধা হলো।
