এ ব্যাপারে আমি একেবারেই অনেক দূরের লোক। স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে ভারতে গিয়েছি। বাংলাদেশে ফিরেছি বারবার। ঢাকায় যাতায়াত করেছি। আগরতলা এবং কোলকাতায় গিয়েছি। তবে স্বাধীন বাংলা সরকারের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
একদিন বালিগঞ্জে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। পরে শুনেছি এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও নাকি বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘট হয়। নেতাদের মধ্যে কলকাতায় ফনী মজুমদার এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আগরতলায় দেখা হয়েছে খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে। কারো কথায় কোনো মিল খুঁজে পাইনি। কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ সাংবাদিক শিক্ষক এবং সংস্কৃতি কর্মীদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কখনো কখনো মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে আবার কখনো শরণার্থী শিবিরে গিয়েছি। আমার কাছে সবকিছুই অগোছালো মনে হয়েছে। মনে হয়েছে এ যুদ্ধের যেন কোনো পূর্ব প্রস্তুতিই ছিল না। কে যেন আমাদের ওপর এ যুদ্ধটা চাপিয়ে দিয়েছে।
তবে মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের সঙ্গে দেখা হলে খুব ভালো লাগত। কলকাতায় গিয়ে শুনেছি আমাদের ছেলেরাই ভারতের মাটিতে প্রথম মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প গঠন করেছে। এ ক্যাম্প ছিল নদীয়া জেলার গেদে সীমান্তে। যুদ্ধের প্রথম দিকে এ যুদ্ধ সম্পর্কে আমার সংশয় থাকলেও সেপ্টেম্বর অক্টোবরের দিকে পরিষ্কার হয়ে আসছিল যে বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। আমি আগেই বলেছি যে এই সেপ্টেম্বর অক্টোবরের দিকে যুদ্ধ তীব্র হতে শুরু করে। দিশেহারা হয়ে যায় পাকিস্তানের দালালেরা।
শঙ্কিত হয়ে ভারতের নয়াদিল্লি সরকার। প্রায় এক কোটি শরণার্থী। হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সশস্ত্র নকশালদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যোগাযোগ। বামপন্থীদের একটি প্রচণ্ড প্রভাব দিল্লি সরকারকেও শঙ্কিত করে তুলছিল। এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পশ্চিমবাংলা থেকে নাগাল্যান্ড পর্যন্ত এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে। সৃষ্টি হতে পারে এক বৃহত্তর মুক্তিযুদ্ধের পরিবেশ। ভারত সরকারের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয় এবং এই পরিস্থিতিতে ‘৭১ এর যুদ্ধ যতো শিগগিরই সম্ভব শেষ করে দেয়াই ছিল ভারত সরকারের লক্ষ্য এবং এ বিবেচনা থেকেই আমি বাড়িতে জানিয়েছিলাম, বছর শেষে আমি বাড়ি ফিরবই।
কিন্তু ইচ্ছে হলেই ভারত সরকারের পক্ষে যুদ্ধ শেষ করা সম্ভব ছিল না। তাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে। ভারত সরকার আদৌ নিশ্চিত হতে পারছিল না যে পাকিস্তান সরকার শেখ সাহেবকে নিয়ে কী করবে বা শেখ সাহেব মুক্তি পেলেও কি ভূমিকা গ্রহণ করবেন সে সম্পর্কেও সন্দেহ ছিল। এ সন্দেহ ছিল শেখ সাহেব সম্পর্কে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের চরম অজ্ঞতার জন্যে। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই শেখ সাহেবের চিন্তা-ভাবনা এবং সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আদৌ কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এমনকি তাজউদ্দিনের সঙ্গে ভারত সরকারের প্রতিনিধির প্রথম সাক্ষাতকারের সময় তাজউদ্দিন সাহেব শেখ সাহেব সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। তখন শেখ সাহেব পাকিস্তান সরকারের হেফাজতে। এ খবর ভারত সরকার জানলেও তাজউদ্দিন সাহেবদের জানা ছিল না। ফলে প্রথম থেকেই ভারত সরকার বাংলাদেশের নেতৃত্ব সম্পর্কে খুব একটা আশ্বস্ত ছিল না। এরপর ছিল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। তাজউদ্দিন সাহেবের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অনেক নেতাই ভালোভাবে নেননি। ছাত্রলীগ নেতারা প্রকাশ্যেই তাজউদ্দিন সাহেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। এ পরিস্থিতি আমাদের ভালো লাগেনি। কোলকাতায় পত্র-পত্রিকায় সমালোচনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। ভারতের নেতাদের মনেও সংশয় দেখা দিয়েছে। এই দ্বিধা বিভক্ত আওয়ামী লীগের কোনো উপদলটি শেখ মুজিবের কাছের এবং অনুরক্ত। আমার মনে হয়েছে শেখ সাহেবের ভূমিকা ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কোন্দলকে কেন্দ্র করে দিল্লি সরকারের যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সে সংশয় দূর হয়নি।
শুনেছিলাম জুলাই মাসে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের সাংসদদের সঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর অনেক কথা হয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বাধীন বাংলা সরকারকে স্বীকৃতি দানের দাবি উঠেছিল। ভারত সরকার তখন সে ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি। কারণ তখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে হয় এবং ভারত সরকারের এই পদক্ষেপ জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হতো না। এমনিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীন বা মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক দেশগুলো পাকিস্তানের পক্ষে ছিল।
এ পরিস্থিতিতে শুনেছি শ্রীমতি গান্ধী পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, বাংলাদেশের সাংসদদের। তার প্রশ্ন ছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়া হলে তিনি কী ভূমিকা নেবেন সে সম্পর্কে কেউ কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে? অথচ তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত নেতা। কোনো পদক্ষেপ নিতে হলে ভারত সরকারকে শেখ সাহেবের ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, ওই বৈঠকে শেখ সাহেবের ভূমিকা সম্পর্কে কেউই নাকি ভারত সরকারকে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকারকে নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। তবে এ সবই আমার শোনা কথা।
