যদিও এ যুদ্ধ সম্পর্কে ভারত সরকার কোনো উচ্চবাচ্য করছিল না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দান ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দাবি জানানো হচ্ছিল। কিন্তু ভারত সরকার রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু কেন?
সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ৭১-এর যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস। এই তিন মাসে যুদ্ধ তীব্র হয়েছে। আবার তীব্র হয়েছে ষড়যন্ত্র। এ মাসগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। ইতোমধ্যে অসংখ্য তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। এক সময় ছিল যখন ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিতে হতো। অনেক বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের শিকার হতে হতো।
সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন বাহিনী গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশেই তারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। দেশে থেকেই তারা অস্ত্র সংগ্রহ করছে। গেরিলা বাহিনী গড়ে উঠেছে শহরে গ্রামে গঞ্জে। এদের অনেকের সঙ্গে বাইরের কারো কোনো সম্পর্ক নেই। এদের সঙ্গে সম্পর্ক নেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার বা সরকারিভাবে স্বীকৃতি মুক্তিবাহিনীর। অর্থাৎ ৭১-এর যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধে পরিণত হতে যাচ্ছিল। এর প্রতিক্রিয়াও হচ্ছিল বিভিন্ন মহলে।
৬. নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রচণ্ড প্রভাব। সশস্ত্র সংগ্রামের স্লোগান তখন তরুণদের মুখে মুখে। বিভিন্ন মহলের আশঙ্কা ছিল যে এই সংগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের সংগ্রামের যোগাযোগ হলে এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। ৭১ এর সংগ্রাম পরিণত হবে সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধে।
৭১-এর সংগ্রামে এই মোড় পরিবর্তনের ফলে শঙ্কিত হয় দু’টি মহল। একটি হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা পকিস্তানি এজেন্ট। অপরটি হচ্ছে নয়াদিল্লির ভারত সরকার।
পাকিস্তানি মহলটির ধারণা ছিল আন্তর্জাতিক চাপের ফলে ভারত বাংলাদেশের এই যুদ্ধকে সার্বিক সহযোগিতা দেবে না। এক সময় আপোষের প্রশ্ন উঠবেই। তখন খুব সুচতুরভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন বা বাংলাদেশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করা হবে। যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার ফলে এই মহলটি প্রমাদ গুণতে থাকে। তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে এবার তাদের সাধের পাকিস্তান থাকছে না। এ পরিস্থিতি ঠেকাবার জন্যে তারা বিভ্রান্তিমূলক প্রচার শুরু করে। তারা বলতে শুরু করে যে, এভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে শেখ সাহেবকে জীবিত পাওয়া যাবে না। পাকিস্তান সরকার তাকে ফাঁসিতে লটকাবে। তাই শেখ সাহেবকে বাঁচাতে হলে ৬ দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। তাদের প্রশ্ন হচ্ছে আপনারা কি চান? জীবিত শেখ মুজিবুর রহমান না বাংলাদেশ। জীবিত শেখ সাহেব এবং স্বাধীন বাংলাদেশ এক সঙ্গে পাওয়া যাবে না। তারা ভেবেছিল এ ধরনের প্রচার করতে পারলে মুক্তিযোদ্ধারা বিভ্রান্ত হবে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে একটা আপোষ মীমাংসায় পৌঁছানো যাবে। এই প্রচারের মূল নেতা ছিলেন মোশতাক আহমদ। তার এক সহযোগী আগরতলায় এ ধরনের কথা আমাকে বলেছিলেন। সেই ভভদ্রলোক এক সময় আমার সঙ্গে ছাত্রলীগ করতেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন নির্মল, তুমি একসময় ছাত্রলীগ করতে। সেই সুবাদে তোমার সঙ্গে আসম আবদুর রব ও শেখ ফজলুল হক মনির সুসম্পর্ক আছে। তুমি তাদের বুঝাতে পার যে এক সঙ্গে স্বাধীনতা ও জীবিত শেখ মুজিবকে পাওয়া যাবে না। সুতরাং যেভাবেই হোক পাকিস্তানের সঙ্গে আপোষ মীমাংসায় পৌঁছতে হবে। আমি অবাক হয়ে তাঁর কথা শুনছিলাম। আমি ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পেরেছিলাম। তবুও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম রব ও মনির সাথে এ নিয়ে আলোচনা করবার। ক’দিন পর সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্যের বাসায় মনির সঙ্গে আমার দেখা হয়। মুক্তিযোদ্ধা মহলে অনিল ভট্টাচার্য অনিল দা হিসেবে বিশেষ পরিচিতি। তার মেলার মাঠের বাসা প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের বাসায় পরিণত হয়েছিল। সেই বাসায় আমি মনির কাছে প্রশ্নটি তুললাম। মনির জবাব হচ্ছে, মামা-বাবার জীবনের জন্যে যুদ্ধ করছি না। যুদ্ধ করছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বাবাও বেঁচে থাকবেন। কিছুদিন পরে শ্রীধর ভিলায় রবের সঙ্গে দেখা হলো। তাকে একথা বলায় সে প্রায় চিৎকার করে উঠল। বলল, পাকিস্তানি এজেন্টরা এখন নতুন পথ ধরেছে। মোশতাক সাহেবের সেই সহযোগীকে আমি এই কথা জানালাম না। শুধু বললাম, তুমি আমার কাছে একথা বলছ কেন? যদি তোমার সাহস থাকে এ প্রস্তাব নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী শিবিরে যাও। ওরা তোমাকে ছিঁড়ে খাবে। এরপর আমি এ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখি। নিবন্ধটি কোলকাতায় আরএসপির মুখপত্র সাপ্তাহিক গণবার্তায় প্রথম সংবাদ হয়ে ছাপা হয়েছিল। লেখার শিরোনাম ছিল ‘সাহস থাকে তো এ প্রস্তাব নিয়ে মুক্তিবাহিনী ও শরণার্থী শিবিরে যান। কোলকাতা থেকে একই ধরনের খবর পাওয়া গেল। মোশতাক সাহেবের এক সাগরেদ এক মার্কিন কূটনীতিকের সঙ্গে দেখা করেছে। এ নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে স্বাধীন বাংলা সরকারের মহলে। খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
