এই সময়ে দ্বিতীয় ঘটনা হচ্ছে স্বাধীন বাংলা সরকারের উপদেষ্টা কমিটি গঠন। এই উপদেষ্টা কমিটিতে আওয়ামী লীগ ব্যতিত আরো ৪টি দলের সদস্য ছিলেন। তাঁরা হলেন–ভাসানী ন্যাপের মওলানা ভাসানী, ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মনি সিং এবং জাতীয় কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর। এই কমিটি গঠনেই প্রতিভাত হয়, সব মহল মিলে একটি আপোষ করার চেষ্টা হয়েছে। সেকালে পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি বৈধ ছিল না। মোজাফফর ন্যাপও সোভিয়েতপন্থী বলে পরিচিত ছিল। সকলেরই ধারণা ‘৭১-এর যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের অন্যতম বড় সহায়ক শক্তি ছিল বলে তাদের প্রভাবেই কমিউনিস্ট পার্টি এবং ন্যাপকে উপদেষ্টা কমিটিতে নেয়া হয়েছিল। আমি শুনেছি ভারত সরকারের কাছেও প্রথমে এ প্রস্তাবনা গ্রহণযোগ্য হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদে শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থীদের প্রভাব তাদের চোখেও ভালো লাগেনি। তাই উপদেষ্টা কমিটিতে ভারসাম্য বিধানের জন্যেই নাকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী উপদেষ্টা কমিটিতে মওলানা ভাসানী ও মনোরঞ্জন ধরের নাম প্রস্তাব করেন। অথচ ভারতে আমরা যারা ছিলাম আমাদের জানানো হয়েছিল, মওলানা ভাসানী নজরবন্দি আছেন। তাঁর স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অনুমতি নেই। এ ব্যাপারে অনেক লেখালেখি হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এবং পরে।
একটি মহলের মতে, মওলানা ভাসানীকে নজরবন্দি রাখা হয়েছিল তাঁর নিরাপত্তার জন্যে। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি মহলের কাছে তিনি আদৌ গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। মওলানা ভাসানী সম্পর্কে অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতা বিরূপ মনোভাব পোষণ করতেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে অনেক ঘটনাই ঘটেছে যা আদৌ বাঞ্ছিত ছিল না। আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচকদের এ জন্যে অনেক মাশুল দিতে হয়েছে। তুখোড় মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচক বলে কলকাতায় অনেকের জীবন বিপন্ন হয়েছে। এই মহলের মতে, এই বিবেচনায় মওলানা ভাসানীকে নিরাপত্তা দেয়া ছিল ভারত সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। মওলানা ভাসানীকে কেন্দ্র করে কোনোকিছু ঘটলে তার সব দায়িত্বই ভারত সরকারকে বহন করতে হতো। তাই তাঁর ব্যাপারে উদাসীন থাকা ভারত সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মওলানা ভাসানী যে কত গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ হয়েছে তাঁকে উপদেষ্টা কমিটিতে নেয়ার পর।
আগরতলায় পৌঁছে এই কমিটি গঠনের সংবাদ পেয়ে আমার মনে হলো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোন্দল কিছুটা থামবে। ভারতের মাটিতে এটা স্পষ্ট ছিল, আমরা সকলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক হলেও আমরা এক রাজনীতির লোক নই। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক তফাৎ আছে। ভারতের মাটিতে দেখেছি, মস্কোপন্থীদের যুফ্রন্ট গঠনের দাবিতে সভা সমাবেশ করতে। পিকিংপন্থীদের দেখেছি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ভিন্ন কমিটি গঠন করতে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদেরও নিজস্ব দলীয় ভূমিকা ব্যাখ্যা করার জন্যে কলকাতায় গিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করতে হয়েছে। তবে উপদেষ্টা পরিষদ যে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল থামাতে পারেনি তার প্রমাণ হচ্ছে মুজিববাহিনী গঠন।
এ সময়ের তিন নম্বর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নের ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি। এ নিয়ে অনেক কথা আছে। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জারের চীন সফরের পর। ৭১-এর সংগ্রামের সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও কিসিঞ্জার ছিলেন চরম ভারত বিরোধী। এই দুই ব্যক্তি সংগ্রামের সময় পাকিস্তানকে সকল প্রকার সাহায্য করেছিলেন। তার মাশুলও তারা আদায় করেছে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে।
তখন বিশ্ব রাজীতিতে মস্কো এবং পিকিং মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মস্কোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো ছিল। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো পাকিস্তানের। আর চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তখন সবচেয়ে খারাপ। যোগাযোগই নেই। তাই নিক্সন ও কিসিঞ্জারের সিদ্ধান্ত ছিল ৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থনের সুযোগ নিয়ে পাকিস্তানের মারফত চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি করা। এবং এ কাজটি ভালোভাবেই করেছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। তিনি পাকিস্তান সফরে এসে গোপনে চীনে চলে যান। চীনা নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে ফিরে আসেন। জানানো হয়, এ সফর ছিল সন্তোষজনক এবং এ আলোচনার ভিত্তিতেই চীন-মার্কিন সম্পর্ক উন্নত হচ্ছে।
তবে এ সম্পর্কোন্নয়নের একটি ভিন্ন প্রেক্ষিত ছিল। সে কথাও সকলের কাছেই খুব স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় চীন-মার্কিন সম্পর্ক উন্নয়ন ভারত সরকারকে বিব্রত করে। আমাদেরকেও শঙ্কিত করে তোলে। কারণ তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এ যুদ্ধে চীন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ করলে ভারত এবং বাংলাদেশের পক্ষে বিপদ। সুতরাং চীনকে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এ পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো দিল্লি সফরে আসেন। ভারত সোভিয়েত ইউনিয়ন ২৫ বছরের শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে বলা হয়, কোনো তৃতীয় পক্ষ এই চুক্তিবদ্ধ দু’টি দেশের কোনো একটিতে আক্রমণ করলে এ দু’টি দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সে আক্রমণ মোকাবেলা করবে। অর্থাৎ ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে চীন অংশগ্রহণ করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বসে থাকবে না। এই চুক্তির পর স্পষ্ট হয়ে উঠল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। এ যুদ্ধ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
